প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৪ ২১:২৯ পিএম
চার বছর আগে অনুমোদন হলেও এখনও কাজ শুরু হয়নি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের। কাজ করতে না পারলেও প্রকল্পটির ব্যয় দ্বিতীয় দফায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে। প্রথম দফায় প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছিল ৩০ কোটি টাকার বেশি।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয় অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এতে ঋণ দেবে জাইকা। এতে অর্থায়নে আগ্রহ ছিল চীন ও ভারতের।
প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটি আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা; যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। চার বছর পরও প্রকল্পের কোনো ভৌত অগ্রগতি নেই। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মূল পূর্তকাজ এখনও শুরু করা হয়নি।
প্রকল্পটির বিষয়ে একনেক পরবর্তী ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের অর্থায়নকে সরকার প্রাধান্য দেবে। কারণ কোন দেশ এটি নির্মাণ করবে, তা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। সব যাচাই-বাছাই শেষে জাপানকে নিরাপদ মনে করছে বর্তমান সরকার। তাদের ঋণের শর্ত ভালো। প্রকল্পে অনিয়ম হলে তা বিচারের জন্য দেশটিতে আইনি কাঠামোও বেশ শক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের মধ্যে এটাই সব থেকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প হবে। এ প্রকল্পের অনেক ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও আছে। কারা এটা করছে সেটাও একটা বড় বিষয়। আমরা সবাই জানি একটি বড় গভীর সমুদ্রবন্দর আমাদের অবশ্যই লাগবে। বাংলাদেশের ব্যবসাবাণিজ্য বাড়বে, তখন এটা লাগবে। গভীর সমুদ্রবন্দর না হলে পরিবহন খরচ ও সময় অনেক বেশি হয়।’
পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, আমরা সাহস করে প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছি এ কারণেই যে, অনেক দিন ধরে চীন করবে না ভারত করবেÑ এ নিয়ে বহু টানাপড়েন চলছিল। কোনো কিছুই হচ্ছিল না। আমরা ভাবলাম জাপান খুব সহজ শর্তে ঋণ দেয়। জাপানি প্রকল্পগুলো ঠিক খরচ ও সময়ের মধ্যে শেষ হয়। জাপানি প্রকল্পে দেশীয় কোনো ঠিকাদার দুর্নীতি করেছেÑ এমন কোনো প্রমাণ আমি নিজেও কখনও শুনিনি।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। পরবর্তীকালে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় ৩০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৮০৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা করা হয়। নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়াতে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজর ৩৮১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ৩ হাজার ৫৪৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বাকি ১৭ হাজার ৯৬৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা দেবে জাইকা এবং নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ৮৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকা দেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।
প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত মেয়াদকাল ছিল ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় সংশোধনীতে তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
প্রকল্পের উদ্দেশ্যের বিষয়ে ডিপিপিতে বলা হয়েছে, কক্সবাজার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বৃদ্ধি করে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানোসহ ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা মেটানো।
প্রকল্পের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছেÑ সওজ অংশে ২৬০ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অংশে ১ হাজার ৩১ দশমিক ৭৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ। ৭৬০ মিটার বেরিথ নির্মাণ। ৩৯৭ মিটার ব্রেকওয়াটার নির্মাণ। সড়ক প্রতিরক্ষাসহ ১৬ দশমিক ৫২৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ। সংযোগ সড়কসহ ব্রিজ নির্মাণ, পরামর্শক সেবা ইত্যাদি।
তবে বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার বাড়ায় এ ব্যয় বেড়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ৪৬১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, স্কোপ অব ওয়ার্ক পরিবর্তনের জন্য ৬৭৪ কোটি ৬৪ লাখ, হালনাগাদ রেট শিডিউলের জন্য ১ হাজার ৯১৪ কোটি ১৬ লাখ এবং অ্যাকসেসিবিলিটি উইথ হাই ডিফিকাল্টি জোনের জন্য ৯০৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় বেড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, জাইকার অনুমোদন বা অনাপত্তি দিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় এক বছর অতিরিক্ত সময় নেওয়া হয়। বিডারদের প্রস্তাবিত মূল্য প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি হওয়ায় জাইকার পরামর্শে প্রাইস নেগোসিয়েশনের অতিরিক্ত সাড়ে চার মাস প্রয়োজন হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে ভৌত ও বাস্তব কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে প্রকল্পের বন্দর অংশের প্যাকেজ-১ এর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে চুক্তির মেয়াদ ৪২ মাস নির্ধারিত। চলতি বছরের আগামী জুন-জুলাই মাসে সম্ভাব্য চুক্তি সম্পাদন করা যাবে। ফলে ৪২ মাসের কার্যাদেশ অনুযায়ী ডিসেম্বর ২০২৭ সালে কাজ সমাপ্ত হবে এবং পরবর্তী সময়ে আরও এক ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড নির্ধারিত আছে। সে লক্ষ্যে প্যাকেজ-১ এর কার্যক্রম সমাপ্ত করতে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত সময় প্রয়োজন, জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে সওজ অধিদপ্তর জানায়, সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী সড়ক ও সেতু নির্মাণের একটি প্যাকেজের রিটেন্ডারের প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে নতুনভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজটি বাস্তবায়ন করতে হলে প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৮ এর পরিবর্তে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পুরো প্রকল্পটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে বাস্তবায়ন মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রকল্পটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দসহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।