আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৩৭ পিএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:১৬ পিএম
প্রতীকী ছবি
শেয়ার কারসাজির অভিযোগে ৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা, ৭ কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত চেয়ে এনবিআরের চিঠি ও ক্রেতা সংকট- এসব কিছুর অভিঘাতে গতকাল বুধবার অস্থির অবস্থা দেখা দেয় দেশের পুঁজিবাজারে। বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দামে যেমন ঢালাও পতন হয়েছে, তেমনি বড় পতন হয়েছে মূল্যসূচকেও। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এদিন দাম বাড়ার তালিকায় স্থান করে নিতে পেরেছে মাত্র ২৯টি প্রতিষ্ঠান। দাম কমেছে ৩৪৭টি প্রতিষ্ঠানের। ফলে ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে একশ পয়েন্টের ওপরে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে।
এদিকে দরপতনের প্রতিবাদে গতকাল মতিঝিলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন বিনিয়োগকারীরা। এ সময় তারা ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ গঠনের দাবি জানান।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত মঙ্গলবার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির দায়ে চার ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে রেকর্ড ৪২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা জরিমানা করে; যা বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে কারসাজির দায়ে সর্বোচ্চ জরিমানা। এর প্রভাবেই বুধবার বাজারে বড় পতন হয়েছে। তাদের মতে, পুঁজিবাজারে কারসাজি ও অনিয়মে জড়িতদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু এখনও সালমান এফ রহমান ও শিবলী রুবাইয়াতের অপচ্ছায়া কলকাঠি নাড়ছে। এর ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর সাপোর্ট তৈরি হতে পারেনি। যে কারণে বাজার অব্যাহতভাবে নিচের দিকেই নামছে। প্রয়োজনীয় সাপোর্ট না থাকায় এই পতন ঠেকানো যাচ্ছে না।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বিএসইসি অন্ধ মানুষের মতো কেবল শাস্তিই আরোপ করে যাচ্ছে। কোন কোন হাউস থেকে অস্বাভাবিক সেল প্রেশার দিয়ে বাজারকে অব্যাহতভাবে নিচে নামাচ্ছে, সেই বিষয়ে কার্যকরভাবে মনিটর করা হচ্ছে না। যার ফলে অস্বাভাবিক সেল প্রেশারও থামছে না।
জাহিদ হাসান নামে এক বিনিয়োগকারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ৫ আগস্টের পর আশা দেখছিলাম। কিন্তু এখন আর কোনো আশা নেই। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে শেয়ার পতন হয়েছে, এখনও তেমন হচ্ছে। বিএসইসি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখে না। অথচও আমাদের স্বার্থই তাদের দেখার কথা ছিল।
এদিকে পুঁজিবাজারে দরপতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ জানানোর সময় বিনিয়োগকারীরা বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করেন। দুপুর ১২টার দিকে একদল বিনিয়োগকারী মতিঝিলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তারা পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক দরপতনের জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির ভুল নীতিকে দায়ী করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে এই বিক্ষোভ করা হয়।
সংগঠনের অর্থ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজারে সদস্যভুক্ত মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে বাদ দিয়ে একটি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ গঠন করতে হবে।
জানা গেছে, বেক্সিমকোর শেয়ার নিয়ে কারসাজির দায়ে গত মঙ্গলবার ৯ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে রেকর্ড ৪২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি। ওইসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মারজানা রহমানকে ৩০ কোটি, ট্রেড নেক্সট ইন্টারন্যাশনালকে ৪ কোটি ১ লাখ, মুশফিকুর রহমানকে ১২৫ কোটি, মমতাজুর রহমানকে ৫৮ কোটি, জুপিটার বিজনেসকে ২২ কোটি ৫০ লাখ, এপোলে ট্রেডিংকে ১৫ কোটি ১ লাখ, এ আর টি ইন্টারন্যাশনালকে ৭০ কোটি, আব্দুর রউফকে ৩১ কোটি, ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে ৭৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৭ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন স্থগিত রাখতে এরই মধ্যে জয়েন্ট স্টকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
একদিকে রেকর্ড জরিমানা, অন্যদিকে শেয়ার স্থগিতের তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এ পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে দিনের লেনদেন শুরু হয় প্রায় সবকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার মাধ্যমে। ফলে শুরুতেই সূচকের বড় পতন হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দরপতনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। ধস নিয়েই শেষ হয় দিনের লেনদেন।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে মাত্র ২৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের স্থান হয়েছে দাম বাড়ার তালিকায়। বিপরীতে দাম কমেছে ৩৪৭টি প্রতিষ্ঠানের। আর ২২টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১৩২ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৫৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৩২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ২১৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৫১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯৮৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। অবশ্য এই ঢালাও দরপতনের মধ্যেও ডিএসইতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। সারা দিনে লেনদেন হয়েছে ৪৪০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৩৮৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে গতকাল ৫১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা লেনদেন বেড়েছে। এই লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে গ্রামীণফোনের শেয়ার। কোম্পানিটির ২০ কোটি ৭৬ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা লিন্ডে বাংলাদেশের ১৭ কোটি ৯৩ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক।
এ ছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছেÑ সোনালি আঁশ, ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এমজেএল বাংলাদেশ, এডিএন টেলিকম ও ইবনে সিনা।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ৩০৬ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৪টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৭৭টির। ১৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
আলোচনায় এনবিআরের চিঠি
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৭ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন স্থগিতে জয়েন্ট স্টকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের মহাপরিচালক আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে মালিকানা হস্তান্তর স্থগিত করার অনুরোধ জানানো হয়। চলমান তদন্ত অনুযায়ী বসুন্ধরা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠান ও থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের (নগদ লিমিটেড) কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগসহ আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত রবিবার ওই চিঠি পাঠানো হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গতকাল। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ২২৩ ধারার আওতায় এনবিআর কর ফাঁকি রোধে সম্পত্তির অন্তর্বর্তীকালীন অবরুদ্ধকরণ বা ক্রোকের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। চলমান তদন্ত অনুযায়ী, এই কোম্পানিসমূহের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগসহ আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ কারণ দেখিয়ে জনস্বার্থে এসব কোম্পানির শেয়ার স্থানান্তর (কেনাবেচা ও দান) স্থগিত করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া বাজারে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা খুবই কম। যেসব কোম্পানি রয়েছে, সেগুলোতে বিনিয়োগের পরদিনই দাম কমে যাচ্ছে। বিনিয়োগের মতো ভালো কোম্পানির অভাব রয়েছে। এ জন্য নতুন কোম্পানি আনার বিকল্প নেই।