অন্তর্বর্তী সরকার
দীপক দেব
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:২৬ এএম
আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১১:৩৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অপচয় রোধ করে ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ শুরু করেছে। এরই মধ্যে এই খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বার্থবিরোধী আইন ও ধারা বাতিল করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির বিশেষ বিধান স্থগিতের পাশাপাশি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ৩৪Ñক ধারা বাতিল এবং ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোতে সরকার তথা জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ হয়েছে কি নাÑ তা নিরীক্ষণ করতে অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটিও কাজ শুরু করেছে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির পক্ষ থেকেও এই খাত নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম এবং ভর্তুকি কমিয়ে আনার পন্থা নির্ধারণের লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১০ সালের বিশেষ আইন স্থগিত ও বিইআরসি আইনের ৩৪–ক ধারা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে তেলের দামও কমানো হয়েছে। প্রায় অর্ধশত কোম্পানিতে চেয়ারম্যান পদ থেকে সচিবদের অপসারণ করে অভিজ্ঞদের পদায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের লুটপাটের কাঠামো ভেঙে দেওয়ার স্বার্থে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় চাইছে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ দিতে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অতীতের চুক্তিগুলোতে সরকারের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি নিরীক্ষণ করতে গঠিত জাতীয় কমিটি ও শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির পক্ষ থেকে যেসব বিষয় উঠে আসবে, তা মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পন্থা নির্ধারণে গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বড় বোঝা কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় বোঝা হচ্ছে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ৪০৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বাবদ (ক্যাপাসিটি চার্জ) ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকার বেশি। তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ খাতের জন্য দেওয়া ভর্তুকির ৮১ শতাংশই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে।
এ ছাড়া এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরেও বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয় ৩৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকার বেশি। ওই সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বাবদ বা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয় ২৬ হাজার কোটি টাকার মতো। যা ওই অর্থবছরে দেওয়া মোট ভর্তুকির ৬৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ হাজার মেগাওয়াটের একটু বেশি। স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। তবে গরমের সময় চাহিদা বাড়লে উৎপাদন ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। তাই সর্বোচ্চ সক্ষমতার বিদ্যুৎ ব্যবহার ধরলেও প্রায় ১০ হাজারের বেশি মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্র বসে থাকছে। অন্যদিকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এই কেন্দ্রগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়।
২০০৯ সালের পর থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা দেশের বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে বলে গত বছর সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে জানিয়েছিলেন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। কুইক রেন্টালের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এজন্য বিভিন্ন সময় প্রশ্নও উঠেছে।
এখন আর এ ধরনের প্ল্যান্টের প্রয়োজনীয়তা নেই
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ২০১০ সালে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে ভাবতে হয়েছিল। কিন্তু আমাদের অন্যান্য পাওয়ার প্ল্যান্ট চলে আসার পর এখন আর সেগুলোর প্রয়োজনীতা নেই। তারপরও গত প্রায় ১৪ বছর ধরে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন।
গত ১৮ আগস্ট সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির বিশেষ বিধান স্থগিত করে। এ ছাড়া এই আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তিগুলোতে সরকারের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষা করতে হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক বানিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কমিটি যেকোনো সূত্র থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় যেকোনো নথি নিরীক্ষা করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে আহ্বান করতে পারবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২১)-এর আওতায় ইতোমধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোতে সরকারের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষা করবে।
নিরীক্ষার ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কমিটিকে সাচিবিক ও আনুষঙ্গিক সহায়তা প্রদান করবে। এরই মধ্যে কমিটি চুক্তিবদ্ধ ৯০টির বেশি কোম্পানির বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও পিডিবির কাছে থাকা তথ্য সংগ্রহ করেছে। এরই মধ্যে দুটি বৈঠকও করেছে এই কমিটি।
জানতে চাইলে এই কমিটির সদস্য ও বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী গতকাল সোমবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কমিটির প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলবেন। তবে এটুকু বলতে পারি, আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। অনেক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সময়মতো সবকিছু জানানো হবে।’
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
এদিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরতে গত ২১ আগস্ট দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে প্রধান করে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটির সদস্য সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ম. তামিম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করছেন। এরই মধ্যে তিনি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। সেখান থেকেও নানা সুপারিশ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব জাকির হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এরই মধ্যে আমাদের কাছে (ম. তামিম) যেসব তথ্য চেয়েছেন, আমরা তা দিয়েছি। স্যার (ম. তামিম) এ বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি। আশা করা হচ্ছে, তিনি বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার পাশাপাশি বেশ কিছু সুপারিশও করবেন, যা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে খুব সহায়ক হবে।’
সব বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩,৬৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে একই সময়ে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট। প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা গেছে। এই অবস্থায় অনেকেই প্রশ্ন রেখেছেন, দেশে এতগুলো ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকার পরেও কেন ঘটতি থাকছে। অন্যদিকে চাহিদা পূরণ না হলেও তাদের কেন ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়মিত দিতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, বিদ্যুৎ খাতে লোকসান কমাতে কীভাবে এ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার পরিষ্কার একটা পথ থাকা দরকার। প্রতিবছর বিদ্যুৎ খাতে যে পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জে। বসিয়ে রেখে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। আবার অনেক সময় অর্থের অভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনা যাচ্ছে না। ব্যয়বহুল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা বলছেন, এগুলো ঠিক করলে দেখা যাবে সরকারের এ খাতে ব্যয় অনেকটাই কমে গেছে।