রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৬:৪৬ পিএম
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৭:৫৬ পিএম
টেকসই অর্থায়ন খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ খাতে নতুন পণ্যের সংযোজনের ফলে ঋণ বিতরণে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বরাবরের মতোই টেকসই রেটিংয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি বিনিয়োগ করেছে এ খাতে। তবে রেটিংয়ে থাকার পরও তিনটি প্রতিষ্ঠান বেশ পিছিয়ে পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম ঋণ বিতরণ করেছে উত্তরা ব্যাংক। আর ৫২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংকের। এছাড়া মাত্র ৫১ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স। যদিও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে রেটিংয়ে থাকা অন্য দুই প্রতিষ্ঠান তাদের লক্ষ্যমাত্রার বেশিরভাগই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) টেকসই অর্থায়নে (সাসটেইনেবল ফিন্যান্স) নতুন পণ্যের সংযোজনের ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ ৩২ শতাংশ বা ২৮ হাজার ১০৩ কোটি টাকা বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) টেকসই অর্থায়নে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের মার্চ প্রান্তিকে ছিল ৮৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। অপরদিকে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নে (গ্রিন ফিন্যান্স) ঋণ বিতরণ ৭৩২ কোটি টাকা বেড়ে ৭ হাজার ৭৭১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মূলত. পাঁচটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই রেটিং বা মান যাচাই করা হয়েছে। সূচকগুলো হলো- টেকসই অর্থায়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন, টেকসই কোর ব্যাংকিং সূচক ও ব্যাংকিং সেবার পরিধি। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ প্রদান বা অর্থায়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পরিপালনসহ নানা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
সম্প্রতি বেসরকারি খাতের ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে সাসটেইনেবল টেকসই রেটিং প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ১০টি ব্যাংক ও ৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক বছর ধরে এ তালিকা প্রকাশ করে আসছে। এবারের তালিকাটি করা হয়েছে ২০২৩ সালের তথ্যের ভিত্তিতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগ সম্প্রতি টেকসই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে এ তালিকা প্রকাশ করে।
এপ্রিল-জুন সময়ে টার্গেট পূরণের দিক থেকে টেকসই রেটিংয়ে শীর্ষে থাকা ১০টি ব্যাংকের অর্থায়ন যথাক্রমে- ব্র্যাক ব্যাংক ৯৬ শতাংশ, যমুনা ব্যাংক ৯১ শতাংশ, ইস্টার্ণ ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) ৯০ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক ৮৮ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংক ৮৮ শতাংশ, দি সিটি ব্যাংক ৮৭ শতাংশ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৭৯ শতাংশ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৭৫ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংক ৫২ শতাংশ, ও উত্তরা ব্যাংক মাত্র ৪৩ শতাংশ। আর তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান টার্গেট পূরণ করেছে যথাক্রমে আইপিডিসি ফাইন্যান্স ৮২ শতাংশ, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স ৭০ শতাংশ এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্স মাত্র ৫১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টেকসই অর্থায়ন বলতে এমন ধরনের ব্যবসা পরিচালনা বোঝায়, যা বাহ্যিক কার্বন নিঃসরণ এবং অভ্যন্তরীণ কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাসে সহায়তা করে। ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে প্রধান খাতগুলোতে অর্থায়ন করে, তার মধ্যে রয়েছে ইস্পাত, কাগজ, সিমেন্ট, রাসায়নিক, সার, বিদ্যুৎ এবং বস্ত্র শিল্প– যা উল্লেখযোগ্যভাবে কার্বন নিঃসরণে অবদান রাখে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের পরিচালক চৌধুরী লিয়াকত আলী বলেন, ‘আমরা টেকসই ও সবুজ অর্থায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন পণ্য যুক্ত হওয়ায় এ খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। এর আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সবুজ ও টেকসই খাতের ১১টি সেক্টরে ৬৮টি পণ্যে ঋণ বিতরণ করত। এখন আরও তিনটি খাত– ব্লু ইকোনমি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং বিবিধ খাত যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে পণ্যের সংখ্যা বেড়ে ৯৪টি হয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই খাতে ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা ঐ সময়ে এ খাতে বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৩৭ শতাংশ; যদিও এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ শতাংশ। ২০২৩ সালে টেকসই অর্থায়ন ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণের ১৭ দশমিক ২৩ শতাংশ ছিল, যা তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
এদিকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলো সবুজ অর্থায়নে ১৫ হাজার ২১১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ; যদিও লক্ষ্য ছিল ৫ শতাংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, টেকসই খাতে বিনিয়োগ প্রধানত শিল্পখাতে করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বছর নতুন খাতগুলো যুক্ত করায় এসব খাতে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ব্যাংকগুলো এসব ঋণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলেও এখন ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার বেশি ঋণ দিচ্ছে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক। যেসব খাতে ঋণ দিলে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেসব খাতেই ঋণ দিচ্ছে।’
তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে ২৮টি ব্যাংক এবং ১৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ঋণ বিতরণের সঙ্গে সম্পর্কিত টেকসই অর্থায়নের জন্য ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। আগের মার্চ প্রান্তিকে এই সংখ্যা ছিল ২৬টি ব্যাংক এবং ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করে পুরো পরিস্থিতির উন্নতি করতে কাজ করছে। সবুজ ব্যাংকিং কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া পুনঃঅর্থায়ন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই উদ্যোগগুলোর ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টেকসই অর্থায়নের প্রবণতায় ইতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগ এ খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শক্তিশালী, কার্যকর এবং সংগতিপূর্ণ প্রচেষ্টার প্রত্যাশা রাখে।