রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০১:২৯ এএম
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:১৫ এএম
বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক লুটপাট, অব্যবস্থাপনা আর স্বেচ্ছাচারিতায় বেশ কিছু ব্যাংকের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকটসহ বহুবিধ সংকটে জর্জরিত এসব ব্যাংক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে তাই বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাংক খাতকে সুস্থ ও স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যে চলছে সংস্কার। তবে ব্যাংক খাতের ‘ক্যানসার’ হিসেবে গণ্য করা হয় যে খেলাপি ঋণকে, তা আদায়ের প্রক্রিয়া চলছে খুবই ধীর লয়ে। ফলে বিদ্যমান তারল্য সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই জটিল চক্রে ঘুরপাক খেতে খেতে এত দিন অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকা আমানতকারীরা এখন তাদের সঞ্চয় নিয়ে আতঙ্কবোধ করছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ডলার বিক্রি বন্ধ, রেমিট্যান্স থেকে আয় বাড়ানো এবং সরকারের ঋণ কমিয়ে তারল্য বৃদ্ধির কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকে এগুলোকে সময়োচিত পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও কেউ কেউ উল্টো চিত্র তুলে ধরতে উদাহরণ হিসেবে বিষয়টিকে ‘প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দিয়ে ক্যানসারের’ চিকিৎসা করার মতো অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশের ডজনখানেক ব্যাংক আমানতকারীর চেক নগদায়ন করতে পারছে না। তাদের অ্যাপেও লেনদেন করা যাচ্ছে না। যা দেশের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। এর প্রভাবে আস্থাহীনতা বিরাজ করছে পুরো ব্যাংক খাতে। দায়িত্ব পাওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্কারও শুরু করেছেন নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। কিন্তু এই সংস্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার কারণে তাৎক্ষণিক সুফল পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। আবার তাদের মনে স্বস্তি ফেরাতে পারে এমন কোনো বার্তা বা লক্ষণও স্পষ্ট নয়।
এদিকে মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে মুদ্রা সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে চেক ফেরতের ঘটনাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যে কারণে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজন ছাড়াই আমানত তুলে নিচ্ছেন অনেক গ্রাহক। এ পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে না পারায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে গ্রাহকের অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের বেতন-ভাতা আটকে পড়েছে। এ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন লাখো চাকরিজীবী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব সমস্যা সমাধানে আপাতত চারটি পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ডলার কিনে যে টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করত ব্যাংকগুলো, এখন তা ব্যাংকিং সিস্টেমেই থাকছে। দ্বিতীয়ত বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রেখে রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের কাছে তরল মুদ্রা বাড়ছে। তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে সরকারের ঋণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এতে রাজি হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন গভর্নর। আর সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর তারল্য বাড়াতে নেওয়া চতুর্থ পদক্ষেপটি হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই গ্যারান্টার হয়ে সবল ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তবে টাকা ছাপিয়ে কোনো ব্যাংককে সহায়তা দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সব সমস্যা এক মাসের মধ্যে সমাধান করা যাবে না। আমরা ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছি, এক্সচেঞ্জ রেটি স্থিতিশীল থাকায় রেমিট্যান্স বাড়ছে। আর সরকারি খাতে ঋণ কমানোর চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ব্যাংক খাতের ঋণের লক্ষ্য ৫০ হাজার কোটি টাকা কমাবে। আর গ্যারান্টার হয়ে সবল ব্যাংক থেকে দুর্বল ব্যাংকের টাকা সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
তবে এসব পদক্ষেপকে যথার্থ মনে করছেন না ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তারা বলছেন, আগে টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হতো, আবার ডলার বিক্রি করে উঠিয়ে নেওয়া হতো। এখন ডলার বিক্রি এবং টাকা ছাপানো দুটোই বন্ধ করা হয়েছে। এটা মূল্যস্ফীতি এবং রিজার্ভ সমস্যার সমাধানে কার্যকরী হলেও তারল্য বাড়ছে না। আবার রেমিট্যান্স আগের চেয়ে খুব একটা বাড়েনি। আর সরকারের ঋণ কমলে বেসরকারি ঋণ বাড়বে, এটা তারল্য সমস্যা দূর করবে না। সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ লুট হওয়া অর্থ ফেরত আনা। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি ধীরগতিতে করছে। ফলে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ ক্ষুদ্র আমানতকারীরা বড়ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করছে।
নাম প্রকাশ না করে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখন যেটি করা দরকার তা হলো ইচ্ছাকৃত খেলাপি তালিকাভুক্ত করার যে পলিসি আমাদের হাতে আছে, তা ব্যবহার করে কিছু বড় ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা। এতে বিদ্যমান সংকট অনেকখানি কেটে যাবে। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বড় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। কিন্তু বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা বলে যে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে, তার চাপ সহ্য করতে পারছে না ব্যাংক খাত।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে যদি কিছু ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে তারা বউয়ের গয়না বিক্রি করে হলেও জনগণের লুটে নেওয়া অর্থ ফেরত দেবে।
অপর একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, প্রতিদিন মানুষ আমাদের কাছে এসে নিজেদেরই টাকা পাওয়ার জন্য যেভাবে আহাজারি করেন, তা সহ্য করা কঠিন। কত মানুষের চিকিৎসা হচ্ছে না। হাজার হাজার মানুষের বেতনের টাকা আটকে গেছে। অনেকে বিদেশে যাবেন কিন্তু টাকা দিতে পারছি না। এটা তো তাদেরই টাকা। এখন আমরা যদি অন্য ব্যাংক থেকে ধার করে টাকা ফেরত দিই, তাহলে কি তারা আর আমাদের কাছে আসবে নাকি টাকা নিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। বরং আমরা যদি বিশেষ ব্যবস্থায় কিছু খেলাপি ঋণের অর্থ ফেরত পেতাম তাহলে গ্রাহক আশ্বস্ত হতেন যে ব্যাংক নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। তখন তারা আবার আমানত জমা করতেন। তা ছাড়া ধার করা টাকাইবা কয়েক দিন পর ফেরত দেব কীভাবে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা মঙ্গলবার (২৪ সেপ্টেম্বর) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আমরা এখনই কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছি না। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা নির্ধারণে আমরা আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করেছি। এতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক আরও বাড়বে। তবে এটি আদায়ের কৌশল ঠিক করবে টাস্কফোর্স। তারল্য সংকট মোকাবিলায় আপাতত সবল ব্যাংক থেকে দুর্বল ব্যাংকে টাকা ধার দেওয়ার পদক্ষেপকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’
খেলাপি ঋণ আদায়ে টাস্কফোর্সের কর্মপরিকল্পনার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন গভর্নর। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘প্রথম ধাপে ইসলামী ব্যাংকসহ তিনটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষণ শুরু করতে যাচ্ছে টাস্কফোর্স। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে আরও তিনটি করে ৯টি ব্যাংকে এ কার্যক্রম চালানো হবে। এতে নেতৃত্ব দেবে ছয় সদস্যের টাস্কফোর্স। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪ জন কর্মকর্তাকে সহায়তার জন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি কয়েকজন পরিদর্শকও নিয়োগ দেওয়া হবে। নিরীক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।’
গভর্নর বলেন, টাস্কফোর্স মূলত ৩টি বিষয়ে কাজ করবে। প্রথমত ব্যাংকগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ নির্ণয় করবে। এরপর ব্যাংকগুলোর সম্পদ কোথায় আছে তা চিহ্নিত করবে। এরপর ওই সম্পদ পুনরুদ্ধারে কাজ করবে।
তিনি বলেন, আমরা প্রথমে দেখব ব্যাংক থেকে নামে বা বেনামে কী পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এরপর ওই অর্থ যদি দেশের বাইরে চলে যায় তাহলে সেগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে আনা যায়, সে বিষয়ে কাজ করব। এক্ষেত্রে আমরা বড় কেসগুলোকে নিয়ে কাজ করব। আমাদের যদি ৪ লাখ কোটি টাকার মতো খেলাপি ঋণ থেকে থাকে তার অর্ধেক হয়তো অল্প কয়েকজন ব্যক্তির কাছে গেছে। এজন্য তাদের ওপর বেশি ফোকাস থাকবে। আর ছোটগুলো সিস্টেমেটিক ওয়েতে তুলে আনা হবে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা এরই মধ্যে ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়েছি। এসব ব্যাংকের ওপর গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসছে। আমানত ফেরত আসতে শুরু করেছে। গত এক সপ্তাহে সংকটে থাকা ব্যাংকে ৮০০ কোটি টাকার বেশি ফেরত এসেছে। আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। যদি এসব ব্যাংক রেমিট্যান্স ভালো পায় তাহলে তাদের তারল্য প্রবাহ বাড়বে। রেমিট্যান্স যখন তারা বিক্রি করবে তখন তাদের হাতে টাকা চলে আসবে। এভাবেই তাদের তারল্য সমস্যা দূর হবে।
এদিকে চলতি বছরে ১২ মার্চ জারি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে প্রমাণিত হলে বিদেশ ভ্রমণে, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুতে এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে (আরকেএসসি) কোম্পানি নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকা পাঠাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকা গাড়ি, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদির নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে সংস্থাটি। এসব সংস্থা তাদের আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কোনো ইচ্ছাকৃত খেলাপি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মাননা পাওয়ারও যোগ্য হবেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে।
ওই প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকায় কারও নাম এলে তিনি ঋণ পরিশোধ করে তালিকা থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ৫ বছরের মধ্যে কোনো ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না। আর যদি কোনো পরিচালক ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে পড়েন তবে তার পরিচালক পদ বাতিল হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের পাশাপাশি এই নীতিমালা কার্যকর করলে সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে। কী কারণে নীতিমালাটি অকার্যকর হয়ে আছে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।