ইএফডি প্রকল্প
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৮ এএম
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:২০ এএম
ভ্যাট ফাঁকিতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিসকে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপনের কাজ দিয়ে শুরু থেকেই সমালোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মেশিন স্থাপনের ভুয়া তথ্য এবং এনবিআর কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করা প্রতিষ্ঠানটিই এবার এনবিআরকে দোষারোপ করছে। পাশাপাশি ভ্যাট সংগ্রহের কাজে একক ক্ষমতা পেতে সরকারি দুই টিমকে বাদ দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদকে পাঠানো চিঠি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেশিন বসাতে ব্যর্থতা, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মেশিন আমদানির নীতিমালা লঙ্ঘন ও প্রতারণার অভিযোগে চুক্তি বাতিলের পথে হাঁটছে এনবিআর।
চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প গ্রহণের সময় থেকে বর্তমানে মুদ্রার মানে যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার সময় ডলারের দর ছিল ৮৫ দশমিক ৮৬ টাকা। বর্তমানে এ দর গিয়ে ঠেকেছে ১২০ টাকায়। এ ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যাংকগুলো থেকে এলসি খোলায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। এতে ডিভাইস আমদানির লক্ষ্যমাত্রাকে জটিল করে তুলেছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, ২০২২ সালের নভেম্বরে দরপত্রের মাধ্যমে ইএফডি প্রকল্পের জন্য মনোনীত হয় জেনেক্স। খুচরা পর্যায়ের ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৩ লাখ ইএফডি ও এসডিসি (সেলস ডাটা কন্ট্রোলার) ডিভাইস স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় জেনেক্স।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রথম বছরে ৩০ হাজার ডিভাইস বসানোর কথা ছিল। অথচ এই সময়ের মধ্যে জেনেক্স ডিভাইস বসিয়েছে ১৫ হাজার ৯৯৫টি। এর মধ্যে ৮ হাজার ডিভাইসের ক্ষেত্রে এনবিআরের স্পেসিফিকেশন না মেনে আমদানির নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া সরেজমিনে জেনেক্সের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী মেশিন পাওয়া যায়নি বলে এনবিআরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় জেনেক্স দুষছে মাঠ পর্যায়ের এনবিআর কর্মকর্তাদের।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের ডিভাইস ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া ও বিনামূল্যে ডিভাইস সরবরাহের কাজ করা হচ্ছে। তবে এই উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগের আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না খুচরা ব্যবসায়ী ও এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও আন্তরিকতার অভাবে। প্রতিষ্ঠানের দাবি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটের কর্মকর্তাদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছে জেনেক্স। এসব কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা। তবে এই বিলের টাকা এখনও বুঝে পায়নি তারা।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তি মোতাবেক ডিভাইস বসাতে ব্যর্থ হওয়ায় ও আমদানির নীতিমালা লঙ্ঘনের পর ইএফডি মেশিন আমদানিতে শুল্ক মওকুফ সুবিধা চেয়েছে জেনেক্স। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত জটিলতার দোহাই দিয়ে একক এখতিয়ার চাওয়ার পাশপাশি সরকারি দুই টিমকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চিঠিতে জেনেক্স বলছে, ইএফডি মেশিন আমদানিতে শুল্কহার ৩৭ শতাংশ ও এসডিসি মেশিন আমদানিতে শুল্কহার ৩২ শতাংশ। এর কারণে সরকারি প্রকল্পে ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে ডিভাইস স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই আমদানিতে শুল্ক মওকুফ করলে আরও বেশি বিনিয়োগ সম্ভব।
এ ছাড়া এই প্রকল্পের সঙ্গে বর্তমানে সরকারি চারটি টিম কাজ করছে। এরা হলোÑ আইভাস প্লাস প্লাস, আইবাস প্লাস প্লাস, এনবিআর ও জেনেক্স। তবে জেনেক্স চায় এই টিমে শুধু এনবিআর ও জেনেক্স কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে বাকি দুই টিমকে বাদ দেওয়ার দাবি প্রতিষ্ঠানটির। তারা বলছে, দেশে এই প্রযুক্তি নতুন। সেহেতু এর সিস্টেমে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে সব টিমের মধ্যস্থতায় সমাধান করতে হয়। এতে অনেক সময়ক্ষেপণ ও জটিলতা তৈরি হয়। তাই এর দায়িত্ব এনবিআরের তত্ত্বাবধানে জেনেক্স করলে আরও বাস্তবসম্মত হবে।
তবে এনবিআর কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও আন্তরিকতার অভাবের অভিযোগ সঠিক নয় বলে মনে করেন এনবিআর কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এনবিআর কর্মকর্তাদের সহযোগিতার কোনো ঘাটতি ছিল না। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করতে না পারায় এখন জেনেক্স মনগড়া কথা বলছে। প্রশিক্ষণ দেওয়া, বিনামূল্যে ডিভাইস দেওয়াÑ এগুলো চুক্তির মধ্যেই ছিল। তারা সব জেনেবুঝেই চুক্তি করেছে। এখন শর্ত পালন করতে না পারায় বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। শিগগির তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের ব্যবধানে তারা অর্ধেকের মতো ডিভাইস বসাতে পেরেছে। তার মধ্যে আবার অধিকাংশ ডিভাইসই এনবিআরের স্পেসিফিকেশন না মেনে আমদানি করা হয়েছে। এতে আমদানি নীতিমালার শর্তও লঙ্ঘন করা হয়েছে।’
সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ইএফডি মেশিনের বিকল্প খুঁজে বের করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ অবস্থায় বিকল্প ভাবনার দিকে যাচ্ছে এনবিআর। তবে বিকল্প এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি সংস্থাটি। এনবিআরের মধ্যকার উইংগুলোর মধ্যে ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইন্টিগ্রেশন তৈরি করার পর তা ঠিক করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জেনেক্স ইনফোসিসের হেড অফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স আবু জাহিদ পরাগ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত, এনবিআর থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। আমরা ইএফডিএমএস প্রকল্পের মাধ্যমে খুচরা পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় রাজস্ব উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছি। এনবিআর এই প্রকল্পের সফল অগ্রগতির জন্য কিছু শর্ত বেঁধে দিয়েছে, যেগুলো আমরা বর্তমানে আরও কার্যকর ও সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করছি।’
২০১৮ সালের আগপর্যন্ত কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রারের (ইসিআর) মাধ্যমে ভ্যাট আদায় করা হতো। তবে ওই বছরে ২৫ ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইএফডির মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ের উদ্যোগ নেয় এনবিআর। ব্যবস্থাটি এনবিআরের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত রাখার কথা ছিল। কোনো পণ্য বিক্রির পর ওই তথ্য এতে ইনপুট দিলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআরে রক্ষিত সার্ভারে যুক্ত হবে এবং এতে কত ভ্যাট তা দেখা যাবে।
এর ফলে ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ থাকবে না। কিন্তু এ ব্যবস্থা চালু করতে পাঁচ বছর দেরি হয়। শুরুতে প্রায় এক বছর পরীক্ষামূলকভাবে কিছু প্রতিষ্ঠানে চালু হওয়ার পর গত বছরের আগস্টে জেনেক্স ইনফোসিসের মাধ্যমে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেয় এনবিআর। বছরে ৬০ হাজার এবং পরের পাঁচ বছরে ৩ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এই মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ১৫ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইএফডির আওতায় এসেছে।
শুরুর আগে থেকেই ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জেনেক্স ইনফোসিসের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আপত্তি ছিল। তারা জানান, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি না করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করলে এনবিআর উপকৃত হতো। একটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে সেখানে কোনো জবাবদিহিতা থাকে না এবং স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ থাকে। এ ছাড়া চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেছেন অনেকে।
ইএফডি মেশিনের মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব পাওয়ার আগে থেকেই ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে জেনেক্স ইনফোসিস। প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট ফাঁকির পাশাপাশি জেনেক্সের চেয়ারম্যান ও পরিচালকেরা দিয়েছেন কর ফাঁকি। পুঁজিবাজারে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করলেও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আদনান ইমাম ও পরিচালকেরা আয়কর রিটার্নে সেই তথ্য উল্লেখ করতেন না। এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এই সংক্রান্ত জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে।