প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২২:৩৪ পিএম
আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২৩:১২ পিএম
আইন শক্তিশালী করতে পারলে খেলাপি ঋণের ৬০ শতাংশ আদায় করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বিএবির এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান সংগঠনটির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার।
তিনি বলেন, ‘আইনের নানা রকমের ফাঁকফোকর রয়েছে। সে কারণে কারণে খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনকে শক্রিশালী করতে পারলে ব্যাংকিং খাতের যে খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার ৬০ শতাংশ আদায় করতে সক্ষম হব বলে আমরা মনে করি। কারণ বেশির ভাগ (ইউলফুল ডিফলটার) ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি।’
তিনি জানান, বিএবির পক্ষ থেকে গভর্নরকে অনুরোধ করা হয়েছে যে অংশীজন হিসেবে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে নীতি প্রনোয়ন করতে। যাতে পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি না হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আইনের দুর্বলতার কারণে এগুলো আদায় করা সম্ভব হয়নি। তাই গভর্নরের এসব বিষয়ে এডড্রেস করতে হবে।’
বেশ কয়েকটি ব্যাংকে বর্তমানে তারল্য সংকট চলছে সে বিষয়ে গভর্নর কোন কিছু বলেছি কি-না সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘৮-৯ টি ব্যাংকে তারল্য সংকট থাকতে পারে, কিন্তু সব ব্যাংকে তারল্য সংকট নেই। এ বিষয়ে গভর্নর ওয়াকিবহাল রয়েছে।’
তিনি জানান, ম্যানেজমেন্ট রাইট ট্র্যাকে রয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে ব্যাংকিংখাতে এক রকম পরিবর্তন দেখা যাবে।
তারল্য সহায়তার জন্য ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলো ট্র্যাডিশনাল ব্যাংকগুলো থেকে টাকা ধার চাইছে, যা শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকের আইনের লঙ্ঘন হয়। কারণ ইসলামী ধারার ব্যাংক সুদ নেয় না আবার দেয়াও হয় না এমন প্রশ্নের জবাব চাওয়া হয় বিএবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের কাছে।
এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে সেন্ট্রাল ব্যাংকের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করছি। অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। এ বিষয়টা কোন ইন্ডিভিজুয়াল ব্যাংকের বিষয় নয়। ওয়ান থার্ড অব দ্যা ব্যাংকিং সিস্টেম ইসলামী পদ্ধতিতে পরিচালনা হচ্ছে। তবে এ ধারার ব্যাংকগুলো কিছুটা সমস্যার মধ্যে পড়েছে। আমি মনে করি এ সমস্যা সাময়িক।’
তিনি বলেন, যেসব ব্যাংকে নতুন বোর্ড দেওয়া হয়েছে সেগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। যাদের নেতৃত্বে দেওয়া হয়েছে তাদের ব্যাংকিংখাতের ভালো ট্র্যাক রেকর্ড আছে। তাই তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে তারল্য সংকট কাঁটিয়ে উঠবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ‘ভবিষতে আমরা তারল্য সহায়তা নিব না, তারল্য সহায়তা দিব। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ব্যাংকিং সেক্টরের পজিটিভ কন্ট্রিবিউশন রাখতে সক্ষম হবে, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হবে।’
এ সময় তাৎক্ষনিক সংকট কিভাবে কাটানো হবে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। তারল্য সংকট কাঁটিয়ে ওঠার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করছি। ব্যাংকটির ( ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক) যে জটিল সমস্যা তৈরি হয়েছে সেগুলো আমরা দুই সপ্তাহের মধ্যে ওভারকাম করব।’
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ে যথেষ্ট আদালত নেই। চট্টগ্রাম একটি আদালত। ঢাকার পরই চট্টগ্রাম বৃহত্তর শহর। কিছু কিছু জায়গায় বাংলাদেশ ব্যাংক ওভাররেগুলেট করছে। আবার কিছু জায়গায় আন্ডাররেগুলেট। আমরা চাই ভবিষাতে যেনো আমাদের পরামর্শে সংস্কার করা হয়। অনেক জায়গায় সংস্কার করা হয়েছে, এর সঙ্গে এখনই ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কার করা উচিত।’
বৈঠকে বিএবি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল হক, মিডল্যান্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক, এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম এ বাশার, প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক ইমরান ইকবাল, পুবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুস, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক ফেরদৌস আলী খান ও ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।
বৈঠক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা বলেন, বৈঠকে তারল্য সহায়তা নিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলো প্রতিনিধিরা বলেছেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে সিদ্ধান্ত তা দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা গাইড লাইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে আলাদা ডিপার্টমেন্ট করারও দাবি জানানো হয়েছে। তবে তাদের এসব দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর কোনো মন্তব্য করেনি নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি তৈরিতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডকে (এবিবি) যুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, একটি স্টেকহোল্ডার কনসাল্ট্রেশন করা যেতে পারে। পলিসিগুলো স্টেকহোল্ডার কনসাল্ট্রেশন থেকে মাথায় রেখে করা যেতে পারে।
আর রিট করে খেলাপি ঋণ বন্ধ রাখার যে প্রবণতা সেটা বন্ধেরও দাবি জানান বিএবি নেতৃবৃন্দ। তাদের এই দাবির সাথে একমত পোষণ করে গভর্নর বলেছেন, এজন্য এনপিএল রেগুলাটরি পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া, অর্থঋণ আদালতের যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দূর করার জন্যও দাবি জানান বিএবি নেতৃবৃন্দ। এক্ষেত্রে গভর্নর বলেছেন, অর্থঋণ আদালতকে ফাংশনাল করতে হবে। এজন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের সাথে আমরা কথা বলবো।
এসময় বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব পলিসি বাস্তবায়ন করে সেগুলো বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে মাথায় রেখে করার দাবি জানান বিএবি নেতৃবৃন্দ। এক্ষেত্রে গভর্নর বলেছেন, আন্তর্জাতিক পলিসি স্ট্যান্ডার্ডকে ফলো করে এগুলো করা হয়। তাই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যারা করে তাদেরকে আন্তর্জাতিক মানে পৌছতে হবে।
বিএবি জানিয়েছে, অর্থঋণ আদালতে প্রোপার্টি বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এটা দূর করার দাবি করেছে বিএবি। এক্ষেত্রে গভর্নর বলেছেন, অর্থঋণ আদালতকে কার্যকরী করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় এটর্নি জেনারেল অফিসের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক বসবে। এরপর প্রয়োজনীয় কাজগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক করবে।
অপরদিকে এমডি ও স্টাফদের বেতন বিষয়ে বাংলাদেশ যে হস্তক্ষেপ করে সেটা ব্যাংকের উপর ছেড়ে দেয়ার দাবিও জানান বিএবি নেতৃবৃন্দ। গভর্নরও তাদের সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন, এগুলো ধীরে ধীরে ব্যাংকের উপর ছেড়ে দেয়া হবে।