× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

লক্ষ্য বড়, অসুবিধা সাময়িক

শরিফুল ইসলাম রনি

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:০৫ এএম

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২০:৪৭ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বেশ কয়েক বছর ধরে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তৈরি হয়েছে বেশকিছু অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এগুলো হলো- জ্বালানিস্বল্পতা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি, সম্পদ ও আয়বৈষম্য, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়া ও বেকারত্ব। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এরপরই আত্মগোপনে চলে যায় সরকার-ঘনিষ্ঠ আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং ব্যাংক পরিচালকদের একটি অংশ। 

গত ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ সময় ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের হাত ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার শুরু হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বেশকিছু ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন, দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ, ব্যাংক কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত এবং বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে টাস্কফোর্স গঠন। এছাড়া দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান চিত্র নিরূপণের লক্ষ্যে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১০০ দিনের মধ্যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে।

তবে সংস্কারের সুফলের পাশাপাশি কিছু ব্যাংকের আমানত, ঋণ, লেনদেন ও বিদেশি বাণিজ্যে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি লেনদেন প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক গতি দ্রুত ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে সংস্কারের ধাক্কায় সাময়িক কিছু সমস্যা হলেও ব্যাংক খাতের হারানো আস্থা ফিরছে। ব্যাংক থেকে টাকা ওঠাতে সমস্যায় পড়েও গ্রাহকরা ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। গত ২০ আগস্ট থেকে ব্যাংকের পর্ষদ সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ওইদিন ন্যাশনাল ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর এস আলমের হাত থেকে মুক্ত করা হয় বহুল আলোচিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে, যে ব্যাংক একসময় ঋণ ও আমানতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের স্বীকৃতি পেয়েও অনিয়ম ও কেলেঙ্কারিতে নাজুক হয়ে পড়েছে। এ ব্যাংকে দুর্নীতি কমাতে পাঁচ সদস্যের ছোট পর্ষদ গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একে একে গ্রুপটির সব ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। 

গত এক মাসে মোট ১০টি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলো হলোÑ ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। পর্ষদ পুনর্গঠন হতে পারে— এমন তালিকায় রয়েছে আরও পাঁচটি ব্যাংক। এগুলোর মধ্যে পদ্মা ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক অন্যতম। এ ছাড়া সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে অর্থ বিভাগ। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। 

চলমান সংস্কার বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটা খুবই কঠিন কাজ, এর জন্য সময়ের প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে বলা যায় সংস্কার প্রক্রিয়া সঠিক পথেই আছে।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি কোনো পরামর্শ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এদের গ্রেপ্তার করে জেলের ভাত খাওয়াতে হবে। তাদের সম্পদ ক্রোক করে ঋণের টাকা আদায় করতে হবে। তাহলে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’ 

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিগত বছরগুলোতে ব্যাংকে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে, তা এক দিনে নির্মূল করা অসম্ভব। তবে নতুন গভর্নর যেভাবে কঠোর হাতে সংস্কার শুরু করেছেনÑ এর প্রয়োজন আছে। ব্যাংকগুলোর শাখাপর্যায়ে গিয়ে পরিদর্শনের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ বড় বড় দুর্নীতিবাজের শিকড় খুঁজে বের করতে গভীর তদন্তের বিকল্প নেই। অন্যদিকে ব্যাংকের দুর্নীতি নির্মূল করতে গিয়ে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বড় ধরনের যে সমস্ত সংস্কার হচ্ছে, তা হলোÑ দুর্বল ব্যাংকগুলোকে হয়তো আমরা সবল করব, নয়তো কারও সঙ্গে একীভূত করব অথবা বিলুপ্ত করব। এখন কোন প্রতিষ্ঠান কোন পথে যেতে পারবে, সেটি ব্যাংক কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে হবে। এটি রাতারাতি নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।’ 

তিনি বলেন, ‘আইনের সংস্কার রয়েছে, অর্থ ঋণ আদালত রয়েছে; সেগুলোর সংস্কার ছাড়া অর্থাৎ বৃহত্তর কাঠামোগত সংস্কার দরকার হবে। ব্যাংকিং কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এসব হবে বলে আমরা আশা করি। অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সেটি দেখা যাবে আগামীতে তারা কী করে।

অর্থ অপচয়ের প্রকল্পে কাটছাঁট

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে কয়েকশ রাজনৈতিক প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। যেসব প্রকল্প জনকল্যাণে তেমন একটা কাজে না লাগলেও হয়েছে অর্থের অপচয়। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামিয়ে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট ঠিকাদার, আমলা ও এমপিরা। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা নিয়েই অপ্রয়োজনীয় এসব প্রকল্প বাতিল করার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এছাড়া যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও পর্যালোচনা করে দেখা হবে প্রয়োজনীয়তা আছে কি নেই। 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিকল্পনা উপদেষ্টার নির্দেশে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত ২৩টি প্রকল্প ফেরত পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এতগুলো প্রকল্প ফেরত পাঠানোর নজির নেই একনেক উইংয়ে। যদি কোনো প্রকল্প নিয়ে আপত্তি ওঠে তাহলে একনেক সভায় সেটার কোয়ারি দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঘটনাও খুবই কম। 

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্প কিংবা একনেকে যাওয়ার প্রক্রিয়াধীন, এমন প্রকল্প আবার যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রয়োজনে ছাঁটাই করা হবে। চলমান প্রকল্প হলেই রেখে দিতে হবে, তা নয়। অর্থের অপচয় হবেÑ এমন অনেক প্রকল্পও এর মধ্যে রয়েছে।’

রাজনৈতিক প্রকল্পের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে, এমপিদের ইচ্ছে পূরণের প্রকল্প হিসেবে পরিচিত, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এছাড়া একনেক উইং থেকে ফেরত যাওয়া প্রকল্পের মধ্যে রয়েছেÑ চট্টগ্রামের কালুরঘাটের রেল-রোড সেতু প্রকল্প, ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত প্রকল্প, মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, র‌্যাব ফোর্সেস সদর দপ্তর নির্মাণের চলমান প্রকল্প, চিলমারী এলাকায় নদীবন্দর নির্মাণ প্রকল্প, উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়), রেজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটরিয়াল ডেভেলপমেন্ট (আরইউটিডিপি) প্রজেক্ট, রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন, গাছবাড়িয়া-শোলকাটা-কালাবিবির দীঘি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, মোংলা-বৌদ্ধমারী বাজার জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন, ডাল ও তেলবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই পুষ্টিনিরাপত্তা জোরদারকরণ, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে কর্মচারীদের আবাসিক ভবন নির্মাণ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্য চাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ প্রকল্প।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘১৫ বছর ধরে চলা একটি সিস্টেম এক দিনেই তো আর পরিবর্তন সম্ভব না। সময় লাগবে। গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে শত শত প্রকল্প রয়েছে। যেগুলোতে শূন্য বরাদ্দ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এসব প্রকল্পের তো কোনো দরকার নেই। কার স্বার্থে মাত্র এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? সেগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। এসব প্রকল্প দুর্নীতির সুযোগ দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। এগুলোতে অনিয়ম হচ্ছে।’ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা