রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৫:৫৮ পিএম
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। প্রবা ফটো
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ সংস্কারের মাধ্যমে সব খাত ঢেলে সাজানো। এরই ধারাবাহিকতায় আর্থিক খাতেও চলছে সংস্কার কার্যক্রম। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কী কী সংস্কার দরকার এবং কোন পদ্ধতিতে সেটি হতে পারে, এসব নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
প্রশ্ন : ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ তথা অর্থনীতির চাকা সচল করতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন?
উত্তর : ব্যবসায়িক নীতিমালাগুলো সংস্কার করতে হবে। নতুন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা আছে। এগুলোর সরলীকরণ প্রয়োজন। তাহলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। প্রতিযোগিতা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দাম নির্ধারণ করে দিয়ে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাই নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য প্রক্রিয়াগত সরলীকরণের বিকল্প নেই। অন্যদিকে নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে হবে। একই ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে নীতি প্রয়োগ করা হয়। কারও জন্য অনেক ছাড় দেওয়া হয়, আবার কারও জন্য অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত আসে। এগুলো সমাধান করতে হবে।
প্রশ্ন : দেশের অর্থনীতি বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কী কী সংস্কার দরকার?
উত্তর : সামষ্টিক অর্থনৈতিক দিক থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি, সেগুলো হলোÑ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য এবং আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা ফেরানো।
প্রশ্ন : ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়া কোনদিকে?
উত্তর : ব্যাংক খাতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, যদিও এটি সব ব্যাংকে না। বিষয়টি এমন পর্যায়ে গেছে যে, তাতে আস্থাহীনতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এ ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। যেমন এস আলম গ্রুপের মালিকানায় যেসব ব্যাংক ছিল, সেগুলোতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। রক্তক্ষরণ মূলত দুটি জায়গায় হয়েছেÑ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে, আরেকটা হচ্ছে বড় বড় কিছু গ্রুপের মালিকানায় যেসব ব্যাংক আছে, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলো। সেখানে অনেক বেশি লুটপাট হচ্ছিল।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কাঠামো ভিন্ন। সেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কিছু রদবদল হয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ হচ্ছে পর্ষদ ভেঙে দেওয়া। এ সমস্ত ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে মূলত অব্যবস্থাপনা ও করপোরেট কুশাসনের কারণে। এর দায়ভার পড়ে পর্ষদের ওপর। তাই পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন করে গঠন করা হলো। রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য এটি করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে আমাদের টাকা রয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য নতুন সরকার দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে গ্রাহকরা ভরসা পায়।
প্রশ্ন : রোগ নিরাময়ে কী করা উচিত?
উত্তর : চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট সময় পায়নি এ সরকার। পর্ষদ পুনর্গঠন করে কাকে কোথায় চেয়ারম্যান করা হবে সেটি বের করা সহজ কথা নয়। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এখন ব্যাংকিং কমিশনের কথা বলা হচ্ছে। এটি যদি করা হয় তাহলেও সময় লাগবে। তবে সংস্কারের কিছু ঘোষিত কর্মসূচি রয়েছে, যেগুলো তারা এগিয়ে নিতে পারে। আইএমএফের কর্মসূচির অধীনে কিছু কিছু পদক্ষেপ আছে, যেগুলো আগামীতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) রয়েছে, যেটি ২০২৫ সালের মার্চ থেকে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। তবে আমরা মনে করি, এতদিন অপেক্ষা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে ওই কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে পারে। ওখানে বলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করার জন্য চারটি সূচক দেখা হবেÑ খেলাপি ঋণ, তারল্য পরিস্থিতি, মূলধন পর্যাপ্ততা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন। এগুলোর ওপর ভিত্তি করে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া যায়। এর জন্য কমিশনের অপেক্ষা করার দরকার নেই।
প্রশ্ন : ব্যাংকিং কমিশনের সংস্কারগুলো কী রকম হতে পারে?
উত্তর : বড় ধরনের যে সমস্ত সংস্কার সেগুলো হলোÑ দুর্বল ব্যাংকগুলোকে হয়তো আমরা সবল করব, নয়তো কারও সঙ্গে একীভূত করব, নয়তো বিলুপ্ত করব। এখন কোন প্রতিষ্ঠান কোন পথে যেতে পারবে, সেটি ব্যাংক কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে হবে। এটি রাতারাতি নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আইনের সংস্কার রয়েছে, অর্থ ঋণ আদালত রয়েছে; সেগুলোর সংস্কার ছাড়া অর্থাৎ বৃহত্তর কাঠামোগত সংস্কার দরকার হবে। ব্যাংকিং কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এসব হবে বলে আমরা আশা করি। দেখা যাক, আগামীতে অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
প্রশ্ন : শ্বেতপত্র তৈরি হচ্ছে, সেখানে আপনিও আছেন। শ্বেতপত্র কি সংস্কারের পথ দেখাবে?
উত্তর : শ্বেতপত্র হলো অর্থনীতি কোন অবস্থায় আছে সে চিত্র তুলে ধরা। আগামীতে কর্মসূচি কী হবে সেটার কিছু আকাঙ্ক্ষা হয়তো থাকবে। এর বাইরে সামনে কী করতে হবে, দীর্ঘমেয়াদি কী করতে হবে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে কী করতে হবেÑ এসব বিষয়ের উল্লেখ শ্বেতপত্রের কর্মপরিধির মধ্যে পড়ে না।
প্রশ্ন : এজন্য জরুরি পরামর্শ কী দেবেন?
উত্তর : কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কমিশনসহ অন্যান্য পদক্ষেপ চলবে, কিন্তু কাজ চালিয়ে যেতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো তো আর বসে থাকবে না। অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য যে সমস্ত কাজ করা দরকার, সেগুলো চলবে। এরপর সংস্কারের প্রস্তাব এলে, সেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হলে এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি হলে তারপর বৃহত্তর সংস্কারের পথে যাওয়া যাবে।
প্রশ্ন : রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পরামর্শ কী?
উত্তর : করনীতিতে যেসব ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সংস্কার দরকার। যেসব খাতে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে ছাড় দিয়ে সুফল মিলছে না, তাতে সংস্কার আনতে হবে। এছাড়া একই খাতে বিভিন্ন ধরনের রেট আছে, এগুলো কমিয়ে এনে একক রেটের দিকে যেতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে ব্যবসায়ীদের ট্যাক্স পলিসি বুঝতে সুবিধা হবে। ২০১২ সালে যে আইন ছিল, সেখানে ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাকি সব খাতে ১৫ শতাংশ করারোপ করা হয়। একই ধরনের ব্যবসার বিভিন্ন টাইপের রেট থাকতে পারে না।
অন্যদিকে কর উত্তোলনের লিকেজগুলো কমানো দরকার। অর্থাৎ করদাতা টাকা দিচ্ছে, কিন্তু কোষাগারে জমা হচ্ছে না, এমন সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। সাধারণত নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে এটি হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে, মেশিন ও যন্ত্রাংশের আলাদা রেট থাকার কারণে কর কর্মকর্তার সঙ্গে সমঝোতা করে হার নির্ধারণ করা হয়। ফলে করদাতা ঠিকই টাকা দেয়, কিন্তু তার পুরোটা কোষাগারে জমা হয় না। এটি রুখতে কর কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। পলিসিতেই সবকিছু বলা থাকবে। তাছাড়া সবকিছু অটোমোশনের মাধ্যমে হতে হবে। যাতে কর কর্মকর্তা আর করদাতার মুখোমুখি হতে না হয়। এর ফলে ভোগান্তির ভয়ে ট্যাক্স না দেওয়ার প্রবণতা কমে আসবে।