প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৪ ২২:৪৮ পিএম
সদ্যবিদায়ি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ঋণ প্রতিশ্রুতি এসেছে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। তবে বন্ধুপ্রতিম ভারত, চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে এ সময়ের কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি পায়নি বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক সংকটে এসব দেশের ঋণ প্রতিশ্রুতি না পাওয়াকে কূটনৈতিক ব্যর্থতা মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। ইআরডির মাধ্যমে সরকারের বিদেশি ঋণ নেওয়া ও পরিশোধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার। যা আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৮৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ঋণ প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ১৯২ কোটি ডলার।
ঋণ প্রতিশ্রুতি বাড়লেও বন্ধুপ্রতিম ভারত, চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি বিদায়ি অর্থবছরে। এই তিন দেশ বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পের অধিকাংশ বাস্তবায়ন করছে।
গত বছর সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হচ্ছে বৈদেশিক ঋণে। দেনার দাবিদার হিসেবে প্রথম সারিতে রয়েছে রাশিয়া। এরপর জাপান, চীনসহ অন্যান্য দেশ। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাশিয়া, চীন ও জাপানকেই বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, কূটনৈতিক কারণে হয়তো এসব দেশ নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এ ছাড়া বাংলাদেশের ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার কারণেও প্রতিশ্রুতি আসেনি বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় পুরোনো ঋণের অর্থ পাওয়া নিয়ে সংশয়ে থাকতে পারে দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরা। রাশিয়ার রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে দেওয়া ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ভারতের পুরোনো প্রতিশ্রুতির অর্থ এখনও ছাড় হয়নি। এ কারণে নতুন করে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রয়োজন হয়তো পড়েনি। আর চীনেরও প্রতিশ্রুত অর্থের বড় একটা অংশ ছাড় হয়নি। এ ছাড়া চীন হয়তো দ্বিপক্ষীয়ের চেয়ে বহুপক্ষীয় অর্থাৎ এআইআইবির মাধ্যমে ঋণ দিতে চায়।’
ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া না গেলেও আগের দেওয়া প্রতিশ্রুতির অর্থছাড় করেছে দেশগুলো। এর মধ্যে ভারত অর্থছাড় করেছে ২৯ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার। চীন ছাড় করেছে ৩৯ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং রাশিয়া ছাড় করেছে ১২৯ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
রাশিয়ার ছাড় করা অর্থের পুরোটাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রোসাটম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশন। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় দেশের ১২ জেলায় ১২টি হাই-টেক পার্ক নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। তিনটি এলওসির আওতায় মোট ৭৩৬ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ দিচ্ছে ভারত।
চীনা অর্থায়নে বর্তমানে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ঢাকা সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলার প্রকল্প সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। এ অর্থে ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। তখন চার বছরের মধ্যে প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়ার কথা বলা হয়। তবে দুটি প্রকল্প পরে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। গত আট বছরে চীন থেকে মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলারের মতো সহায়তা পাওয়া গেছে। প্রতিশ্রুত ২৭ প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৯ প্রকল্পের বিপরীতে এ সহায়তা পাওয়া গেছে।
ইআরডির প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে বড় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির ঋণ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ২৯৪ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এর পরে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ২৬১ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ২০৪ কোটি ডলার ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান সরকার। একক দেশ হিসেবে এটি সর্বোচ্চ। ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন (এমআরটি) প্রকল্প, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, মাতারবাড়ীসহ দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে জাপান।
এশীয় পরিকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) দিয়েছে ৪০ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি। এ ছাড়া অন্য উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো দেবে ২৭২ কোটি ডলার।
এদিকে বিদায়ি অর্থবছরে প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৯৮৯ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এর মধ্যে অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে ৬২ কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আর ঋণ হিসেবে পাওয়া গেছে ৯২৬ কোটি ৬৮ লাখ ১০ হাজার ডলার।