রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৪ ১১:৫৬ এএম
নজরুল ইসলাম মজুমদার। ফাইল ফটো
সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের শাসনামলে ঋণখেলাপিদের সেফগার্ড বা রক্ষক হয়ে উঠেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছত্রছায়ায় চলেছে ব্যাংক লুট, যা ছিল ব্যাংক খাতে ‘ওপেন সিক্রেট’।
চাঞ্চল্যকর খবর হচ্ছে, খোদ ব্যাংক মালিকরাও ছিলেন ব্যাংক লুটে সহায়ক। পরিচালকদের পারস্পরিক ঋণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও মালিকদের পক্ষে খেলাপিদের সহায়তা করতে চিঠি দেওয়ার ঘটনা ছিল অবিশ্বাস্য। এমন ভয়াবহ খবরও এখন বেরিয়ে আসছে। ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে উল্টো লুটেরাদের সুবিধা দিতে তৎপর ছিলেন ব্যাংক মালিকরা। বিগত সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারকে এমন একটি চিঠি দিয়েছিলেন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। সংগঠনের পক্ষ থেকে ওই চিঠিতে খেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার আবদার করেন বহুল আলোচিত এই বিতর্কিত ব্যবসায়ী। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা। যদিও ওই চিঠিটি বিএবির কোনো দাপ্তরিক চিঠি ছিল না বলে জানা গেছে। লুটেরাদের সিন্ডিকেট ব্যাংক মালিকদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে বিএবিকে তখন ব্যবহার করেছেন সভাপতি।
নাম প্রকাশ না করে একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাধারণত ভালো ব্যাংকের মালিকরা বিএবির সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখেন না। কারণ একটি সিন্ডিকেট সংগঠনটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত। একইভাবে ওই চিঠির সঙ্গে বিএবির সাধারণ সদস্যদের কোনো সংযোগ নেই। কারণ নৈতিকভাবে বিএবি এ ধরনের চিঠি দিতে পারে না। মজুমদারের সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থেই ওই চিঠিটি দিয়েছিল। আগেও অনেক অনৈতিক কাজে তারা বিএবিকে ব্যবহার করেছে।’
বিভিন্ন সময় নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে ঋণখেলাপিসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। বিভিন্ন গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠানও নানা অনৈতিক সুবিধা লুফে নিতে সব সময় প্রস্তুত থাকত। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনও সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনৈতিক আবদার করেছিলেন বিএবি সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার।
নিয়ম-নীতির বাইরে গিয়ে বেশকিছু অনৈতিক সুবিধা চেয়ে গত ৩১ জুলাই গভর্নরকে একটি চিঠি দেন তিনি। ওই চিঠিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সময় ছয় মাস বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়। এ ছাড়া মেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধে অতিরিক্ত তিন মাসের বিশেষ সুবিধা চায় সংগঠনটি। তবে ৫ জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়ে কীভাবে ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী আবদার নিয়ে আসতে পারেন? ব্যবসায়ীদের সুবিধা দরকার হলে তারা আসবেন। এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা চাওয়ার রাইটস তার নেই।’
একই কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেকেই বিভিন্ন সময় নানা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন আব্দুর রউফ তালুকদারের কাছ থেকে। অনেককে সুবিধা দেওয়ার জন্য নীতি পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে।’
মেয়াদি ঋণ শ্রেণিকরণের বিষয়ে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে বিআরপিডি সার্কুলার-৩ অনুযায়ী, একটি মেয়াদি ঋণের অপরিশোধিত কিস্তি বা এর অংশবিশেষ যে তারিখে পরিশোধের জন্য নির্ধারিত থাকে, সে তারিখ হতে পরবর্তী ছয় মাস পর মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার-৯ এর নির্দেশনা অনুযায়ী ওপরে উল্লিখিত ছয় মাসের পরিবর্তে আগামী ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিন মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর এবং ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ থেকে নির্ধারিত দিন হতেই মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য করা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই সার্কুলারে নির্দেশিত পরিবর্তনসমূহ ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা আছে। অর্থাৎ খেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা আরও এক বছর বাড়ানোর আবেদন করে খোদ ব্যাংক মালিক।
মেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ-সংক্রান্ত আরেক দাবি জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, সকল অশ্রেণিকৃত এবং পুনঃতফসিলিকৃত মেয়াদি ঋণের কিস্তি ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিলম্বিত হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা আছে। এসব বিলম্বিত কিস্তি পরবর্তীতে ওই ঋণের মেয়াদ পূর্তির তিন মাসে সমকিস্তিতে পরিশোধযোগ্য হবে।
ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণের মেয়াদ বর্ধিতকরণ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া প্রায় সকল খাতেই বিক্রয়ের পরিমাণ কমে গেছে। তাই সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সকল ধরনের অশ্রেণিকৃত চলমান ও তলবি ঋণ, যেসবের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ২০২৪ সালের জুন হতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আছে, সেসব ঋণের মেয়াদ ন্যূনতম তিন মাস বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আছে, যাতে করে গ্রাহকের ব্যবসা সচল রাখা যায়। অর্থাৎ ব্যাংকের ঋণ উত্তোলনের পরিবর্তে গ্রাহকের সুবিধা নিয়ে তৎপর ব্যাংক মালিক।
জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, ‘বিএবি এ ধরনের আবেদন কিছুতেই করতে পারে না। ব্যাংকের স্বার্থ, ব্যাংকের পরিচালকদের স্বার্থ, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের বাইরে ব্যবসায়িক গ্রুপ বা কাউকে সুবিধা দিতে বলার কোনো এখতিয়ার নেই তাদের। এগুলো নীতি-নৈতিকতার বিষয়। এর আগেও তারা ব্যাংক কোম্পানি আইনের নীতি পরিবর্তন করিয়েছিল। এসব অনৈতিক কাজ।’
অপরদিকে অনাদায়ী ঋণ আদায় এক্সিট-সংক্রান্ত সার্কুলার প্রসঙ্গে চিঠিতে বলা হয়, ঋণগ্রহীতার ব্যবসা, শিল্প বা প্রকল্প কখনও কখনও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে বন্ধ হয়ে যায় অথবা লোকসান দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলশ্রুতিতে, ওই ঋণসমূহ বিরূপমানে শ্রেণিকৃত হয়ে যায়। এ ধরনের ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ৮ জুলাই জারিকৃত বিআরপিডি সার্কুলার-১৩তে এক্সিট-সংক্রান্ত একটি বিশদ নীতিমালা প্রদান করা হয়। ওই নীতিমালায় অন্যান্য নির্দেশনার পাশাপাশি এক্সিট সুবিধাপ্রাপ্তির গ্রাহককে ঋণস্থিতির ন্যূনতম ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নগদে পরিশোধপূর্বক আবেদন করতে হয়। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের ডাউন পেমেন্ট দেওয়া কষ্টসাধ্য হওয়ায় ব্যাংকের পক্ষে ঋণ আদায়ের হার কমে যাবে। এমতাবস্থায় ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই ডাউন পেমেন্টের নীতিমালা শিথিল করার অনুরোধ করা হলো। অর্থাৎ মাত্র ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায়েও খেলাপিদের ছাড় দিতে চায় ব্যাংক মালিকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক চাইবে কিছু হলেও ফেরত অর্থ আসুক, কিন্তু একেবারে মাফ করে দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দেওয়া নজিরবিহীন ঘটনা।
রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রণোদনা বা নগদ সহায়তার হার পুনর্নির্ধারণ প্রসঙ্গে চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী শিল্পসমূহের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রপ্তানি কার্যক্রম সম্পাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ওই শিল্পসমূহ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মাঝে এফই সার্কুলার নং-১২ (৩০ জুন ২০২৪) অনুযায়ী রপ্তানির বিপরীতে রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তার হার কমানো হলে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে একটি বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এমতাবস্থায়, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাসমূহকে আগামী তিন মাসের জন্য পূর্বনির্ধারিত হারে নগদ সহায়তা বহাল রাখার জন্য অনুরোধ করা হলো। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমনে সরকারের তুলে নেওয়া ভর্তুকি পুনর্বহাল করতে গভর্নরকে চাপ দিচ্ছিলেন এই প্রভাবশালী ব্যক্তি। তবে এখানে ব্যাংক মালিকদের স্বার্থ কী তা স্পষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নজরুল ইসলাম মজুমদারের মতো কয়েকজন ব্যাংক মালিক নিজেরাই ব্যাংক লুট করেছেন। তাই নীতিসহায়তার মাধ্যমে আইনি ছাড় পেতে ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয়টি সামনে আনেন।
এ বিষয়ে জানতে বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারকে ফোন করা হলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি, গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারসহ ব্যাংক লুটেরাদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘অনেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আবেদন নিয়ে আসেন এবং এসব বিবেচনা করে দেখেন গভর্নর। ওই আবেদনের বিষয়ে পরে কী হয়েছে আমার জানা নেই।’
তবে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘এখন থেকে ঢালাওভাবে কোনো সহায়তা দেওয়া হবে না। বিশেষ করে বড় ব্যবসায়ীদের কোনো সহায়তা দেওয়া হবে না। ক্ষেত্রবিশেষে ছোট কিছু ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেওয়া হবে; যারা প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’