আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৪ ১৬:৫৮ পিএম
সরকার ও জনগণের বড় একটি অংশই চলছে ঋণ করে। আজকে যে শিশুর জন্ম হবে তার মাথায়ও ঋণের বোঝা চাপবে ১ লাখ ৬ হাজার ৯৯৯ টাকা। এই মুহূর্তে এটাই দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ। এক বছরের ব্যবধানে মাথাপিছু ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৯৮০ টাকা। এ ছাড়া পরিবারের খরচ চালাতে বছরে গড়ে একজন ব্যক্তি ১৭ হাজার ৩৬৬ টাকা ঋণ করেন। ফলে বছর শেষে গড়ে একজন ব্যক্তির মাথার ওপর সার্বিকভাবে মোট ঋণের বর্তমান যে বোঝা চেপে রয়েছে তার পরিমাণ ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৫ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশ ও বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। একজন নাগরিকের সেই ঋণের দায়ের অংশই গড় ঋণ। কারণ জনগণ দেশের মালিক। এই ঋণ জনগণকে প্রত্যক্ষভাবে চাপে না ফেললেও পরোক্ষভাবে ফেলে। কারণ ঋণ শোধে সরকার ভ্যাট-কর ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়। এতে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়।
অর্থ বিভাগের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। যদিও মার্চ ও জুন মাসের হিসাব এখনও প্রতিবেদন আকারে তৈরি হয়নি। তবে অর্থ বিভাগ ধারণা করছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশি-বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়াবে ১৮ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১০ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ ৮ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা।
বিবিএসের জনশুমারি ও গৃহগণনার সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার জন। মোট স্থিতি ঋণের সঙ্গে মোট জনসংখ্যা ভাগ দিলে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজার ৯৯৯ টাকা। এটি সরকারের ঋণের মাথাপিছু হিসাব।
এ ছাড়া বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পরিবারের খরচ মেটাতে একজন ব্যক্তি গড়ে ১৭ হাজার ৩৬৬ টাকা ঋণ নিয়ে থাকে। সে হিসেবে যদি সরকারের মাথাপিছু ঋণ এবং ব্যক্তিগত গড় ঋণের হিসাব একত্রিত করা হয়, তাহলে একেক জনের গড় ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৫ টাকা।
২০২৩ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণ মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ১৬ লাখ ১৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। সে হিসাবে গত বছর মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ১৯ টাকা। বছরের ব্যবধানে সরকারি ঋণের বিপরীতে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১১ হাজার ৯৮০ টাকা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঋণের এই বোঝা মূলত দেশের মানুষকেই শোধ করতে হবে। এই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হবে বাজেটের মাধ্যমে। আর বাজেটের অর্থায়ন হয় করদাতার অর্থে। ভবিষ্যৎ করদাতাকেই এই টাকা পরিশোধ করতে হবে। কাজেই দিন শেষে দেশের মানুষকে এটার অর্থায়ন করতে হবে। বাজেটের ওপর বোঝা মানেই আমার আপনার ওপর বোঝা বৃদ্ধি। কারণ আপনার আমার আয় থেকে কর দিয়েই এগুলো বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে পরিশোধ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন কিছু প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ নিয়েছি যেগুলো এখনও শেষ হয়নি, কোনোটা মাঝপথে আছে বা শুরুর দিকে আছে। এখন যে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা এগোবো নাকি এগোবো না। এগোলে লাভের থেকে ক্ষতি যদি বেশি হয়, তাহলে এগোনো উচিত হবে না। অতীতে যা ঘটে গেছে তা গেছে। যা খরচ হয়ে গেছে সেটা তো আর ফেরত আসবে না। কিন্তু যদি এমন প্রকল্প হয়ে থাকে যেটা এখন অতিরিক্ত ব্যয় করে শেষ করলে ব্যয়ের চেয়ে লাভ বেশি হবে, তাহলে সেগুলো চালু রাখতে হবে। আর যেগুলো বোঝা বাড়াবে সেগুলো কমাতে হবে।’
২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে অর্থাৎ গত জুন মাস শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণ দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার। সে হিসাবে বর্তমানে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মাথার ওপর গড়ে ৪০০ ডলারের মতো বিদেশি ঋণের বোঝা রয়েছে।
মাথাপিছু ঋণ বাড়লেও তা আয় বাড়ার তুলনায় কম। দেশের মানুষের বর্তমান মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৮৪ ডলার, অর্থাৎ ৩ লাখ ৬ হাজার ১৪৪ টাকা। গত অর্থবছরে এটা ছিল ২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৬০ টাকা।