উন্নয়ন প্রকল্প
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ১০:০১ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ১০:৪৩ এএম
আইএমইডি ভবন। ছবি : সংগৃহীত
দেশের আর্থসামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিবছর হাজারের বেশি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে এসব প্রকল্প সঠিক সময়ে শেষ হয় না। এক বছরের কাজ ১০ বছরেও শেষ না করার নজির রয়েছে। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অর্জিত হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, গত ৪ বছরে ১ হাজার ৫৮৪টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে ৪২৯টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের প্রকল্পগুলোর বড় সমস্যা হচ্ছে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারা এবং ব্যয় বাড়ানো। বারবার মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে অর্থের অপচয় হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এ কথাটি বলে আসছিলাম। প্রত্যাশা থাকবে সামনের দিনগুলোয় সুশাসনের সঙ্গে প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে শেষ হবে।’
আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্যবিদায়ি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭৫টি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় এসব প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এর মধ্যে ৩৪৫টির প্রতিবেদন জারি করা হয়েছে। বাকি ৩০টির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবের প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলমান।
পরিকল্পনা কমিশনের কয়েকটি প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে না পারায় ৩৫৪টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে আইএমইডি। একনেক সভায় ৬০টি প্রকল্পের সময় ও ব্যয়Ñ দুই-ই বাড়ানো হয়। এছাড়া ১৫টি প্রকল্প তিনবার মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ না হওয়ার চতুর্থবার একনেকে উঠেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৮০টি প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে। এর মধ্যে ৩২১টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে আইএমইডি। ৫৯টি প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে একনেক সভায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪০০টি প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে। এর মধ্যে ৩৩৭টির মেয়াদ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে আইএমইডি। একনেক সভায় ৬৩টি প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, কিছু প্রকল্পে সময় বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ থাকে। অনেক দেশীয় প্রকল্প চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পায় না। তবে অনেক সময় প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ও প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতার কারণে বাস্তবায়নে দেরি হয়। বেশিরভাগ প্রকল্প পরিচালকেরই প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা কম। জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা না থাকলে আর বরাদ্দ ঠিকমতো দেওয়া হলে সময় বাড়ানো ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলেও জানান তারা।
তাদের মতে, বারবার মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর টেনে নেওয়ায় সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মমূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণও ব্যাহত হচ্ছে। জানা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপিতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ২৪৬টি, যার বেশিরভাগই পুরোনো। এর মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ১৪টি প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এছাড়া এক দশকের বেশি সময় ধরে চললেও শেষ হয়নি ৩৬টি প্রকল্প।
সম্প্রতি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এডিপির প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রকল্প চারবার সংশোধিত হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে, এসব প্রকল্পের সংখ্যা ৫১৮। চলমান ১ হাজার ১৩৮টি প্রকল্পের গড় বয়স ৫ বছর ২ মাস। ৬ থেকে ১০ বছর ধরে চলছে ৩৫৭টি প্রকল্প। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ৩৬টি। এর মধ্যে ১০টি প্রকল্প চলছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে।
এদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের (বিআইডিএস) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৯৫ শতাংশ প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। এসব প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়িয়ে শেষ করতে হয়। জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে। কাজের পরিধি পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে ৪৯ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়ে ব্যয় বাড়ে প্রায় ২৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ পর্যাপ্ত সম্ভাব্যতা যাচাই ও অংশীজনের মতামতের অভাব এবং কোনো এক্সিট প্ল্যান না থাকা। এছাড়া প্রকল্প পরিচালকদের কখন কোন কাজ করতে হবে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) সেই পরিকল্পনা দেওয়া থাকলেও সে অনুযায়ী তারা সময়মতো কাজ করতে পারেন না। এসব কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার সংশোধন ও সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। এতে যেমন ব্যয় বাড়ে তেমনি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রিটার্ন পাওয়া যায় না। তাৎক্ষণিক না হলেও দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রকল্প দেরি হওয়ার বড় একটি কারণ ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা। অনেক প্রকল্প সম্ভাব্য সমীক্ষা ছাড়াই নেওয়া হয়। অর্থাৎ পুরোটাই অনুমাননির্ভর। এ কারণে প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয় না। প্রকল্পের খরচ বেড়ে যায়।’