প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৪ ২২:২৩ পিএম
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে পাস হওয়া কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, বিদেশী সাংবাদিকদের দেশে আসার সুযোগ দিয়ে ভিসার ব্যবস্থা করা এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে নিয়মিত প্রেস বিফ্রিংয়ের আয়োজন করা। গত দুদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার লিখা তিনটি পোস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে তিনি তাঁর প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন। জাহিদ হোসেন বলেন, কালোটাকা সাদা করার যে সুযোগটি এই অর্থবছরের বাজেটে দেওয়া আছে, সেটি বাতিল করা হোক। সর্বোচ্চ আয়করের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ শতাংশ জরিমানা যোগ করে সীমিত সময়ের (৩ থেকে ৬ মাস) জন্য এই সুযোগ পুনর্বহাল করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার পর তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। আগামী জুলাই থেকে এক বছরের জন্য কালোটাকা সাদা করার এই ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বাজেটে বলা হয়েছে, নগদ টাকা ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে বৈধ বা সাদা করা যাবে। একইভাবে জমি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট কিনেও এলাকাভেদে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে। একেক এলাকার জন্য বর্গমিটার অনুসারে নির্দিষ্ট কর দিতে হবে।
দেশের আয়করের সর্বোচ্চ হার ২৫ শতাংশ। বিশ্লেষকদের অভিযোগ, কালোটাকা সাদা করার বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মধ্যে সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অসৎ করদাতাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ শুধু সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে মানুষকে অসৎ হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়। তাঁর মতে, সর্বোচ্চ করহারের সঙ্গে জরিমানা দিয়ে সীমিত সময়ের জন্য এই সুযোগ রাখা উচিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এই সুযোগ তিন থেকে ছয় মাস রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করা যাবে না। অর্থাৎ আবাসন খাত বা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে ছাড় দেওয়া হবে, এমন নিয়ম রাখা যাবে না। নিয়ম হতে হবে সোজাসাপটা। সেই সঙ্গে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া যাবে না। যাঁরা সৎ পথে আয় করে আয়কর নথিতে তা প্রদর্শন করেননি, শুধু তাঁদের এই সুযোগ দেওয়া উচিত।
অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, এই অর্থ দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে উদ্ধার করা উচিত। দুর্নীতি দমন আইনে যেসব পরিবর্তন এনে তা শিথিল করা হয়েছিল, সেগুলো বাতিল করতে হবে। কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তদন্তের জন্য পুলিশ বা র্যাবের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কমিশনকে তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে।
গতকাল শনিবার অপর এক পোস্টে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে নিয়মিত প্রেস বিফ্রিংয়ের আয়োজন করার পরামর্শ দিয়েছেন ড. জাহিদ। এমন চর্চা বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এই ধরনের ক্রান্তিকালে নাগরিকরা জানতে চায়- কী হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দপ্তর প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার গণমাধ্যমের সম্মুখীন হলে ভালো হতো। স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগের একটি নিয়মিত ব্যবস্থা দরকার। তবে এটি যেন চাটুকরিতার মঞ্চে পরিণত হয় সে ব্যাপারেও তিনি সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ লিখেছেন, বাংলাদেশের দ্বিতীয় রূপান্তরের যে অধ্যয় শুরু হলো তা ইতিহাসে বিরল। এই নতুন পথের গন্তব্য একটি গণতান্ত্রিক প্রথায় সুশাসিত, বৈষম্যবিহীন, প্রগতিশীল সমাজ। নির্বাচিত সরকার যে কর্তৃতবাদী ও স্বৈরাচারি হতে পারে তা বাংলাদেশিদের শিখিয়েছে বিগত সরকার। অনির্বাচিত সরকার গণতান্ত্রিক হতে পারে কিনা তা এখন দেখার সুযোগ করে দিল আমাদের শিক্ষার্থীরা। আশা করি, তারা নিজেরাও গন্তান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করায় পূর্ণ সচেতন থাকবেন এবং সহযোগী হবেন।
তিনি লেখেন, অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকারের বয়স আজ ৯ দিন মাত্র। প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পরিচালনা যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরে সরকারকে একটু সময় দিতে হবে ঘর গোছানোর জন্য। সরকারের সিদ্ধান্তের যথার্থতা ও পদক্ষেপের সঙ্গতির আলোচনা ও সমালোচনার অনুকূল পরিবেশ এখন গড়ে উঠছে। এখান থেকে শুরু হোক গণতান্ত্রিক চর্চা।
সরকারের স্বচ্ছতা বাড়ানোর পথে এখন আর বাধা নেই উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এই ধরনের ক্রান্তিকালে নাগরিকরা জানতে চায়- কী হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছি। মুক্ত হয়েছি কিন্তু আগামীতে মুক্তির ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা কতটুকু? স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগের একটি নিয়মিত ব্যবস্থা দরকার। উপদেষ্টাদের অনেকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। এটা এক ধরনের সংযোগ। সরকারপ্রধানের দপ্তর থেকে নিয়মিত বিফ্রিং সেই তুলনায় বেশি খাঁটি। এমন উত্তম চর্চা অনেক গণতান্ত্রিক দেশে আছে।
বিগত সরকার দেশে ঘটে যাওয়া প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে বিদেশী সাংবাদিকদের ভিসা দেননি এমন তথ্য তুলে ধরে ড. জাহিদ ফেসবুকে আরেকটি পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেন, দ্য ইকোনমিস্টের সাংবাদিক ঢাকায় আসতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশে কী ঘটছে তা জানার জন্য। ভিসা না পেয়ে তারা দিল্লি থেকে রিপোর্ট লিখেছেন। ধরে নেয়া যেতে পারে বাংলাদেশ দূতাবাস আগস্ট ৫ এর আগে ঘটনা লুকানোর জন্য তাদের সরকারের পছন্দ মতো প্রতিবেদন দেবেনা এমন সাংবাদিকদের ভিসা দেননি।
এখন সময় বদলেছে। তবে বিশ্ব জানে না কীভাবে, কী ধরনের এবং কতটা বদলেছে। অনেক কুৎসা রটানো হচ্ছে। এতে বাঙালি তরুণদের বীরত্বের গল্পটি আন্তর্জাতিক মন্ডলে সঠিক প্রচার পচ্ছেনা।
ওরা আসুক, দেখুক, বুঝুক, বলুক আমাদের তরুণরা কীভাবে তাদের জীবন রক্ত আর ঘাম দিয়ে একটি দানব সরকারের পতন ঘটিয়েছে। তারপর কীভাবে তারা জনসেবা করে যাচ্ছে, কীভাবে রাজনৈতিক অধিকারের অতন্দ্র প্রহিরীর ভূমিকা রাখছে। ওরা শুধু আমাদের নয়, ওরা সারা বিশ্বের বিস্ময়, ওরা মানব অধিকার যোদ্ধাদের অহংকার।
তারা দেখুক কীভাবে নতুন সরকার দেশ পরিচালনার জন্য শিক্ষার্থী ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় একটি নতুন অধ্যায় রচনার চেষ্টায় আছে। যোগ্য ব্যক্তিদের দেশের হাল ধরার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। মুক্ত সাংবাদিকতা ফিরে এসেছে। রাজনীতিবিদরা কী ধরনের ভূমিকা রাখছেন।
বিদেশি সাংবাদিকদের বাংলাদেশে আসার জন্য ভিসা দেয়ার পদ্ধতি সহজ করা দরকার। কী ধরনের স্টোরি করবে তার কোনো শর্ত আরোপ করা যাবেনা। দানব সরকার পজিটিভ স্টোরি করার শর্তে বিদেশি সাংবাদিকদের ভিসা দিতো বলে প্রায় শোনা যেত।
প্রশ্ন রেখে তিনি লিখেন, নতুন বাংলাদেশের কাহিনি জানতে দিল্লি যেতে হবে কেনো। সেখান থেকে কী বিকৃত চিত্র দেওয়া হবেনা? ঢাকায় কেন আসতে পারবেনা? এ বিষয়ে তিনি পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।