প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ০৮:৪৩ এএম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ১০:৫৭ এএম
বিগত সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে উল্লেখ করে এর একটি চিত্র তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনেক মৃতপ্রায় ব্যাংককে আর বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ দেওয়া উচিত হবে না বলে মনে করে সংস্থাটি। একই সঙ্গে বিপর্যস্ত কিছু ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে আরও একবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
সিপিডি বলছে, পুরো ব্যাংক খাত চলে গেছে নিয়মনীতির বাইরে। এতদিন বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রসারে কাজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত এক দশকের বেশি সময়ে এই খাতে ২৪টি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছে। এতে লুট হয়েছে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের লুটেরাদের ধরতে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের তাগিদ দিয়েছে সিপিডি। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নরসহ জড়িতদের বিচার দাবি করা হয়েছে। দ্বৈত শাসন বন্ধ করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সোমবার ১২ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনা, শিগগির কী করতে হবে’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংস্থাটির গবেষকরা।
সেখানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে লাইসেন্স পাওয়া তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের কিছু ব্যাংক মৃতপ্রায় হয়ে আছে। এদের চলনশক্তি নেই। এদের জনগণের করের টাকা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এরা মরে যাক। এতে শুধু অর্থের অপচয় হচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাক এসব ব্যাংক। এ ছাড়া কিছু ব্যাংকের পারফরম্যান্স খারাপ, আরেকটু ধাক্কা লাগলেই মরে যাবে। এগুলোর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে পরিচালনার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।’
ব্যাংক খাতের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করতে ব্যাংক কমিশন গঠন করার সুপারিশ করে সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ব্যাংক খাতে দ্বৈত প্রশাসন চলছে। বন্ধ করে দেওয়া উচিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ ছাড়া কোনো ধরনের বিবেচনা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বন্ধ হয়ে গেলে বিভাগটির আওতায় থাকা ব্যাংক ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদ নিয়োগ দেওয়াসহ অন্যান্য কাজ তাহলে কে করবেÑএমন প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘অর্থ বিভাগ করবে’।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এমন না যে, তাদের স্বাধীনতা নেই; তারা এটা ব্যবহার করছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বরং বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের কথা চিন্তা করে নীতিমালা করেছে। দুই বছর ধরে দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে। দরকার ছিল সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর যাতে সুবিধা হয়, সে জন্য সুদহার বাড়ায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।’
ব্যাংক একীভূত করার ব্যাপারে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ব্যাংকগুলো একীভূত করার পূর্বশর্ত হলো অডিট করে ফাইন্যান্সিয়াল অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দেখা। পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ক্যাটাগরি ঠিক করে দিতে হবে।’
অন্যদের মধ্যে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।
অলিগার্ক সৃষ্টি
সিপিডি জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাংক খাতে অলিগার্ক (গুটি কয়েক লোকের হাতে) সৃষ্টি করা হয়েছে। চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের হাতেই সাতটি ব্যাংক। তারা একাই ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। একসময় ইসলামী ব্যাংক ভালো ব্যাংক ছিল। দখলের পর তাও মুমূর্ষু হয়ে গেছে। এ ছাড়া একক গ্রাহকের জন্য ঋণসীমা নীতি লঙ্ঘন করে জনতা ব্যাংক এননট্যাক্স গ্রুপকে দিয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা।
অপরদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে নতুন করে ৯টা ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে। সিপিডি সুপারিশ করেছে রাজনৈতিক কারণে যেন কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স না দেওয়া হয়। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিভিন্ন ব্যাংক, টেলিভিশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইসেন্স কি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে দেওয়া হয়? আর নতুন কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স যেন অর্থনৈতিক উপযোগিতা বিবেচনা ছাড়া দেওয়া না হয়।
তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ব্যাংককে ক্যাপিটালাইজ করার জন্য ১৫ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এটা বন্ধ করতে হবে। দুর্বল ও সমস্যা-সংকুল ব্যাংক যেন সরে যেতে পারে, সে জন্য আমাদের সঠিক এক্সিট পলিসি দরকার। যাতে করে গ্রাহকের অর্থ সংরক্ষিত হয়।’
পরিবারতন্ত্র রুখে দেওয়ার তাগিদ
ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ একজন দুই মেয়াদে সর্বোচ্চ ৬ বছর দায়িত্ব পালন করার প্রস্তাব করেছে সিপিডি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘২০১৮ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইনটি সংশোধন করে দুজন থেকে চারজন করা হয় এবং মেয়াদ করা হয় ৯ বছর। পরে ২০২৩ সালে কমিয়ে তিনজন করে, কিন্তু মেয়াদ করা হলো ১২ বছর। এই ব্যবস্থাটা একটি অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। আমাদের রিকমেন্ডেশন হচ্ছে, প্রতি পরিবার থেকে একজন করে পরিচালক থাকবে এবং তিন বছর করে সর্বোচ্চ দুই বারে ৬ বছর থাকবে।
বেআইনিভাবে গভর্নর নিয়োগ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে আইন মানা হয়নি। সিপিডি জানায়, সাধারণত ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে ব্যাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাক্ট ২০০৩ অনুযায়ী কোনো বর্তমান বা অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান নেই, সেই আইনের তোয়াক্কা না করে গত কয়েক টার্ম গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
খেলাপি ঋণের বিপুল বোঝা
ফাহমিদা খাতুন বলেন, খেলাপি ঋণ অব্যাহতভাবে বেড়েছে। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া আর্থিক খাতের অন্যতম সমস্যা মামলা জটিলতা। মামলার কারণে বিপুল পরিমাণ টাকা আটকে আছে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক আদালতে মামলার সংখ্যা ৭২ হাজার ৫০০টি। টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে আর্থিক কেলেঙ্কারি খুঁজে বের করা প্রয়োজন। আমাদের গবেষণায় দেখিয়েছিলাম ২৪টি আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে, যার পরিমাণ ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।’
সিপিডি নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘বারবার পুনঃতফসিল করার কারণে ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছেÑ এটা বন্ধ করতে হবে। ২০১২ সালের হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারিতে দেখেছিলাম অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা দুর্বল ছিল, এখনও বিভিন্ন ব্যাংকে তা রয়ে গেছে।’
এ ছাড়া ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করার জন্য সিআইডি ৭৯ বার সময় নিয়েছে। নতুন সময় ৪ সেপ্টেম্বর। ওই তদন্ত প্রতিবেদন উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানায় সিপিডি।
মৃতপ্রায় ও ক্লিনিক্যালি ডেড হওয়া ব্যাংকের সংখ্যা না জানালেও ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১১টি ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। এসব ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত গবেষণা করে বলেছিলাম শক্তিশালী প্রশাসক নিয়োগের সুপারিশ করছি। অনেকগুলো মৃতপ্রায়। এগুলো বেঁচে থাকার কথা নয়। ওইগুলো বন্ধ করা উচিত। যেগুলো দুর্বল রয়েছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে যথাযথভাবে ঠিক করতে হবে। না হলে সক্রিয় করা সম্ভব নয়।’
ঋণখেলাপিদের বিভিন্ন কার্ড সেবা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ব্যবহার করা মাস্টার, ভিসা, সুইফট কার্ডের নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাদের তথ্য শেয়ার করা দরকার; যেন বিদেশে তাদের কার্ড ব্যবহার বন্ধ থাকে।’
তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক
প্রতিষ্ঠার বছর বিবেচনায় বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোকে চারটি প্রজন্মে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। যেসব ব্যাংক ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে লাইসেন্স করেছে এবং তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে তাদের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক বলা হয়।
১৯৯১ থেকে ২০০০ সালÑ এ সময়কালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলোকে দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। যেসব ব্যাংক ২০০১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত লাইসেন্স পায় সেগুলোকে তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক বলা হয়।
আর ২০১৩ সালের পরের ব্যাংকগুলোকে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক বলা হয়। তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হলোÑ ব্র্যাক, ডাচ-বাংলা, যমুনা, প্রবাসী কল্যাণ, শাহজালাল ইসলামী, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। আর চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো হলোÑ বেঙ্গল কমার্শিয়াল, কমিউনিটি, মেঘনা, মিডল্যান্ড, মধুমতী, এনআরবি, এনআরবি কমার্শিয়াল, পদ্মা, প্রবাসী কল্যাণ, সীমান্ত, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী এবং সিটিজেন ব্যাংক।