এটিএম সেবা প্রায় অকার্যকর
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৪ ২১:৫০ পিএম
আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৪ ২২:০৮ পিএম
বিভীষিকাময় একটি দিন কাটল ব্যাংক গ্রাহকদের। নগদ টাকার অভাবে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্যাংকগুলোর প্রায় সব এটিএম বুথ বন্ধ ছিল। কারণ হিসেবে বেরিয়ে এলো নগদ টাকার অভাবের কথা।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পর্যাপ্ত টাকা ছাড় করেনি ব্যাংকগুলো। তাই নিজেদের ভল্টের টাকা দিয়ে কোনো মতে শুক্রবার চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে গতকাল শনিবার এটিএম বুথে টাকা লোড করা সম্ভব হয়নি। ফলে বন্ধ ছিল প্রায় সব এটিএম বুথ।
রাজধানীর কমলাপুর এলাকার বাসিন্দা হারুন। বাসাভাড়া দেওয়ার জন্য টাকা ধার করেছেন সহকর্মীর কাছ থেকে। তার অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া টাকা তুলতে কমলাপুর এবং আশপাশের এলাকার প্রায় অর্ধশত এটিএম বুথ ঘুরেও টাকা পাননি তিনি। অনেক ঘোরাঘুরির পর শেষ পর্যন্ত টাকা তুলতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বুথে টাকা না পেয়ে আরও কয়েকটি ব্যাংকে ঘুরেছেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এই গ্রাহক। বেশিরভাগ এটিএম বুথেই লেখা ছিল ‘আউট অফ সার্ভিস’। কোথাও কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি বা কারিগরি ত্রুটির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে ব্যাংকগুলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল দেশের প্রায় সব এলাকায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করেছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বেশির ভাগ এটিএমে অর্থ সরবরাহের কাজটি করা হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। টাকার অভাবে এ সেবা বন্ধ রেখেছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। এ কারণে এটিএমগুলোতে টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। তাই দেশজুড়ে এটিএম সেবা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, টাকার সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে নিরাপত্তা শঙ্কা। থানাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চলমান অনিরাপদ পরিস্থিতিতে টাকা পরিবহনের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না অনেক ব্যাংক ও এটিএমে অর্থ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও চাহিদা অনুযায়ী নগদ টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্যাংকের এটিএম বুথে টাকা সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠান সিকিউরেক্স প্রাইভেট লিমিডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে আমাদের কোম্পানি প্রতিদিন ২৫০ কোটি টাকা সরবরাহ করেলেও আজ (শনিবার) কোনো টাকাই দিতে পারিনি। কারণ আমাদের ভল্টে আর টাকা নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা ও বাংলাদেশ ব্যাংকও টাকা দিচ্ছে না। নগদ টাকার সংকট ও নিরাপত্তার ঝুঁকি অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন তিনি।
ব্যবসায়িক কারণে প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন রেখে আরও দুটি টাকা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারাও টাকা সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। শুধুমাত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেমন কূটনৈতিক পাড়া ও সেনানিবাসের মতো জায়গাগুলোতে স্বল্প পরিমাণে টাকা সরবরাহ করা হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকা সরজামিন পরিদর্শনে দেখা যায় ইসলামী, এনসিসি, এক্সিম, প্রাইম, উত্তরা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের এটিএম বুথগুলো বন্ধ। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতেও একই অবস্থা। এই এলাকার এসআইবিএল, ইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, যমুনা ও ব্যাংক এশিয়ার কোনো বুথেই টাকা নেই।
জানতে চাইলে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ‘বেশিরভাগ ব্যাংকের এটিএমের অর্থ সরবরাহের কাজটি তৃতীয় পক্ষ করে থাকে। কয়েক দিন ধরে নিরাপত্তাহীনতার কারণে তৃতীয় পক্ষের এ সেবা বন্ধ রয়েছে। এ কারণে অনেক ব্যাংকের এটিএমে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দেওয়া সম্ভব হয়নি। আশা করছি, আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুল মওলা বলেন, ‘দেশের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে এটিএম বুথগুলোতে টাকা পাঠানো যাচ্ছে না। নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত সমস্যা কেটে যাবে।’
গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার ব্যাংকের অনেক শাখা বন্ধ রাখতে দেখা যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধান দরজা বন্ধ রাখতে দেখা গেছে রাজধানীর কোনো কোনো ব্যাংকের। বিকল্প দরজা দিয়ে যাওয়া আসা করেছেন ব্যাংকার ও গ্রাহকরা। ব্যাংকাররা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যদি কোনো শাখায় নিরাপত্তা ঝুঁকি অনুভূত হয় তাহলে ব্যাংক চাইলে সেসব এলাকার শাখা এবং এটিএম বুথ বন্ধ রাখতে পারবে।
এ বিষয়ে পদত্যাগ করার আগের দিন (৬ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কাজী সাইদুর রহমান জানান, এখনও দেশে স্বাভাবিক অবস্থা আসেনি। বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন দুর্ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো ব্যাংক কোনো শাখা বা কোনো এটিএম বুথের নিরপত্তার ঝুঁকি মনে করে তাহলে সেটা বন্ধ রাখতে পারবে। এমন পরিস্থিতি বেশিদিন থাকবে না। আশা করি খুব দ্রুত স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হবে সব ব্যাংক ও এটিএম বুথগুলোতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের মোট এটিএমের সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৪২৮। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে ৯ হাজার ৪০৯টি আর গ্রামাঞ্চলে ৪ হাজার ১৯টি। এটিএম ছাড়া সিআরএমের (ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন) মাধ্যমেও নগদ টাকা উত্তোলন করা যায়। দেশের বেসরকারি খাতের ব্র্যাক, সিটি, ঢাকা ব্যাংকসহ অনেক ব্যাংক এখন এটিএমের বদলে সিআরএমের প্রতি ঝুঁকছে। সিআরএমে টাকার উত্তোলনের পাশাপাশি নগদ জমারও সুযোগ রয়েছে। এ কারণে ধীরে ধীরে সিআরএমের সংখ্যা বাড়ছে। গত মে মাস শেষে দেশে সিআরএমের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫০। এসব সিআরএমের সিংহভাগই শহরাঞ্চলে, এর সংখ্যা ৩ হাজার ৯৮৫টি।
প্রসঙ্গত, গত ৫ আগস্ট রাজধানীর অনেক থানা খালি করে চলে যায় পুলিশ। পরদিন থেকে কর্মবিরতির ডাক দিলে সারা দেশ পুলিশ শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তবে গতকাল থেকে সীমিত পরিসরে বেশিরভাগ থানার কার্যক্রম চালু হয়েছে। রবিবার ব্যাংকের শাখাগুলোও খোলা থাকবে। তাই এটিএম চালুর পাশাপাশি ব্যাংকের শাখা থেকেও টাকা তুলতে পারবেন গ্রাহকরা। তবে শবিবার ব্যাংক ও এটিএম একযোগে বন্ধ থাকার কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে দেশের ব্যাংকিং সেবা।