× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আইনি সুরক্ষায় আস্থা বেড়েছে অফশোর ব্যাংকিংয়ে

রেদওয়ানুল হক

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৪ ১১:১৯ এএম

গ্রাফিক্স : প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স : প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার যে সংকট চলছে তা নিরসনের লক্ষ্যে গত মার্চে অফশোর ব্যাংকিং আইন পাস হয়। অর্থনীতিবদরা জানিয়েছেন, দেশে অফশোর ব্যাংকিং আগে থেকেই চালু রয়েছে। বর্তমানে এর আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নীতিগত স্থিতিশীলতার বিষয়ে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখন চাইলেই যেকোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে না। আইনের মাধ্যমে অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধির যেসব সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, তার স্থায়িত্ব বেড়েছে ও আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি হয়েছে। যদিও একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইন পরিবর্তনেরও সুযোগ রয়েছে, তবু এটি বিদেশি আমানতকারীদের জন্য শঙ্কার পরিবেশ তৈরি করবে না।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন আইনের মাধ্যমে ট্যাক্স মওকুফসহ বেশ কিছু সুবিধা যুক্ত হয়েছে, যা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ চাপে রয়েছে, বাজারে ডলার সংকট আছে। তাই অফশোর ব্যাংকিংয়ে সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডলার সংকট নিরসনে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’ 

তবে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অফশোর ব্যাংকিং আগে থেকেই আছে। তবে সেটা ছিল সীমিতÑ আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে। আইনে বেশ কিছু সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে ডলার প্রবাহ কিছুটা হলেও বাড়বে, যা রিজার্ভের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা বলছেন, নতুন আইনে তিন ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি সুবিধা, ঋণ বিতরণের সুযোগ, বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ ও জমা করার পাশাপাশি খরচ করার সুবিধা। এ ছাড়া অফশোর অ্যাকাউন্টের ওপর কোনো আয়কর দিতে হবে না। এর ফলে প্রবাসীরা ডলার আনতে পারবে। বিদেশিদের টাকাও আসতে পারবে, ঋণ নেওয়া যাবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই বিলের মাধ্যমে অফশোর ব্যাংকিংয়ের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।’ 

তিনি বলেন, ‘এই আইনের মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা ও ট্যাক্স আরোপ না করাসহ অনেক জটিলতা দূর হয়েছে। ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ট্রেড ফাইন্যান্স পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে অনেক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে দেশে ১৯৮৫ সালে অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ২০১৯ সালে অফশোর ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশে বর্তমানে ৪২টি ব্যাংক অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাঁচ ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা-ডলার, পাউন্ড, ইউরো, জাপানি ইয়েন ও চীনা ইউয়ানে এই অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম করা যাবে। এই ব্যাংকিং পদ্ধতিতে সুবিধার পাল্লা ভারী। এর মাধ্যমে যেকোনো কোম্পানি বা ব্যক্তি দেশ-বিদেশে সহজ শর্তে ব্যবসা করতে পারবে। নতুন আইনের আওতায় সরকার এই ব্যাংকিং কার্যক্রমে আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেয়ে অফশোরে বিধিনিষেধ তুলনামূলক কম। গ্রাহকের তথ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোয় চূড়ান্ত গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়।

আগে অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টিআইএন না থাকলে আমানতের আয়ে ১৫ শতাংশ কর দিতে হতো। নতুন আইনের ফলে এখন টিআইএন না থাকলেও কোনো কর দিতে হবে না। একই সঙ্গে অফশোর ব্যাংকিং লেনদেনে যে সুদ আসবে তার ওপর কোনো কর আরোপ করা হবে না। অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় কোনো সুদ বা চার্জ দিতে হবে না। নতুন আইনে কোনো ঋণসীমা রাখা হয়নি, এতে যেকোনো পরিমাণ লেনদেন করা যাবে।

তবে অসুবিধা নেই, তা বলা যায় না। এ ব্যবস্থায় অনেক ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে দেশে ব্যবসা করে এখান থেকেই ঋণ শোধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীর রপ্তানি পর্যাপ্ত না হলে ওই ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা কমে যাবে। অর্থাৎ স্থানীয় টাকায় ঋণ পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই। এ সমস্যা রোধে তদারকি করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। তবে এই কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় সুবিধা দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে। কারণ যারা এতে অংশ নেবে তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ওপর বিধিনিষেধ কম থাকবে। এ ব্যবস্থা ডলার সংকট কমাতে কাজ করতে পারে। অফশোর ব্যাংকিংয়ের আওতায় ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। অনাবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অফশোর ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্টে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাবেন, সেই মুদ্রাতেই লেনদেন হবে।

এ ছাড়া এ ধরনের অ্যাকাউন্টধারীদের সরকার প্রচুর ট্যাক্স বেনিফিট (কর সুবিধা) দেয়। কোনো অনাবাসী ব্যক্তি বা কোম্পানি বাংলাদেশের অফশোর অ্যাকাউন্টে বিদেশি মুদ্রা পাঠাবে তখন তিনি নিজের প্রয়োজনে এই অর্থ নিতে পারবেন। পরিবারের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন। আবার টাকায় এনক্যাশ করে শেয়ার বা বন্ড কিনতে পারবেন। মূলত, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানো, রিজার্ভ সংকট এবং এলসি খোলার সংকট সমাধানে এই অফশোর ব্যাংকিং কাজ করবে।

ঋণ কমলেও বেড়েছে খেলাপি

দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা উচ্চমাত্রায় খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি। খেলাপি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সুবিধা দিলেও তা কোনোভাবেই কমানো যায়নি। উল্টো বেড়েছে কয়েকগুণ। শুধু তাই নয়, কনভেনশনাল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি বিদেশি ব্যাংকিং ইউনিটেও (অফশোর ব্যাংকিং) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। যদিও একই সময়ে এই ইউনিটে ঋণ কমেছে ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অফশোর ব্যাংকিং হলোÑ ব্যাংকের অভ্যন্তরে পৃথক এক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিদেশি কোম্পানিকে ঋণদান ও বিদেশি উৎস থেকে আমানত সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে অফশোর ব্যাংকিংয়ে। এতে স্থানীয় মুদ্রার পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব হয়। ব্যাংকের কোনো নিয়ম-নীতিমালা অফশোর ব্যাংকিংয়ে প্রয়োগ করা হয় না। শুধু মুনাফা ও লোকসানের হিসাব যোগ হয় ব্যাংকের মূল হিসাবে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি ৪২টি ব্যাংক অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ডলারের সরবরাহ বাড়াতে অফশোর ব্যাংকিংয়ের আমানতে বিভিন্ন আকর্ষণীয় পণ্য তৈরি করেছে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সেই পথেই হেঁটেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকের অফশোর ইউনিটগুলোর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। আগের বছরের (২০২৩ সাল) একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৭৮ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অফশোর ব্যাংকিংয়ে ঋণ কমেছে ৬ হাজার ২৭ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মার্চে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অফশোর ব্যাংকিংয়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৭৪ কোটি টাকা বা ৩৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনুসর বলেন, ‘এ খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ারই কথা। কারণ বছরের ব্যবধানে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। এখন যারা এই ইউনিটগুলো থেকে ঋণ নিয়েছেন, তারা ঋণ পরিশোধ করতে গেলে টাকায় ৩৫ শতাংশ বেশি দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি সুদের হারও বেড়েছে। এজন্য অনেকেরই ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খেলাপি ঋণে।’

তিনি বলেন, প্রচলিত আইনের বাইরে ব্যাংকিংয়ের সুযোগ থাকায় ২০২০ সালের পর অনেক ব্যবসায়ী অফশোর ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে টাকার অবমূল্যায়ন, ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে রপ্তানিকারকরা এ খাত থেকে বিমুখ হয়ে পড়ছেন। এতে অফশোর ব্যাংকিংয়ে ঋণ কমছে বলে মনে করছেন এ অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে অফশোর ব্যাংকিংয়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে অফশোর ব্যাংকিংয়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ঋণ কমেছে ৮০২ কোটি টাকা। তবে এসব ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিংয়ে কোনো খেলাপি নেই।

গত মার্চে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬০ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি ব্যাংকগুলো অফশোর ব্যাংকিংয়ে ঋণ কমেছে ২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। যদিও একই সময়ে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিংয়ে খেলাপি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। যা আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৮৮৪ কোটি টাকা।

তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অফশোর ঋণ কমেছে ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের একই সময়ে ছিল ১৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ কমলেও খেলাপি বেড়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৭৯ কোটি টাকা। আর ২০২৩ সালের মার্চে যা ছিল ৫১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি বেড়েছে ১৬১ কোটি টাকা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা