হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ০৮:৫৯ এএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১১:৪৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
প্রতি বছর দেশে তুলা আমদানি হয় ১৪-১৫ লাখ মেট্রিক টন। এক কেজি তুলা আমদানিতে খরচ পড়ে ২০০-২২০ টাকা। সেই হিসেবে প্রতি বছর অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি হয় দেশে। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে চাইলেই তুলার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমাতে পারত বাংলাদেশ। ৫০ বছর আগে স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে তুলা চাষ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত চাহিদার ৫ শতাংশও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়নি দেশে। তুলা উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বর্তমানে চাহিদার দুই থেকে তিন শতাংশ তুলা চাষ হয় দেশে। অথচ দেশে তুলা চাষযোগ্য যে জমি আছে তাতে চাষ করলে চাহিদার অন্তত ২০-৩০ শতাংশ আমদানি কমিয়ে আনা যেত অনায়াসে।
কেন তুলা উৎপাদন বাড়ছে না জানতে চাইলে তুলা উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তুলা চাষ করলে ফসল তুলতে একজন প্রান্তিক কৃষককে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হয়। জুলাই মাসে চারা রোপণ করার পর ডিসেম্বর, জানুয়ারিতে তুলা আহরণ করা হয়। দীর্ঘ সময় লাগায় অনেক কৃষক তুলা চাষ করতে চায় না। অন্যদিকে কৃষকদের খাদ্যনিরাপত্তার একটি বিষয় আছে। জমিতে ধান অথবা গম চাষ করলে লাভ না হলেও সে উৎপাদন করে। কারণ তিন মাসের মধ্যে ফসল তোলা যায়। এরপর জমিতে অন্য ফসল উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু এখানে সময় বেশি লাগায় অনেকে আগ্রহ দেখায় না।’
আন্তর্জাতিক বাজারে এক কেজি তুলার দাম ১ দশমিক ৫২ ডলার। টাকার হিসাবে দাম পড়ে (প্রতি ডলার ১১৮ টাকা হিসেবে) প্রতি কেজি ১৮০ টাকা। অন্যান্য খরচ মিলে প্রতি কেজি তুলা আমদানিতে খরচ পড়ে ২০০-২২০ টাকা। প্রতি কেজি ২০০ টাকা হিসেবে ধরলে তুলা আমদানিতে প্রতি বছর খরচ হচ্ছে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা।
স্বাধীনতার আগে স্থানীয় বস্ত্রকলের জন্য কাঁচামালের জোগান দেওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে দেশের বস্ত্র শিল্পগুলো কাঁচামালের অভাবে মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হয়। তখন স্থানীয়ভাবে তুলা উৎপাদনের গুরুত্ব অনুভূত হয়। এই অবস্থায় ১৯৭২ সালে দেশে তুলা চাষ সম্প্রসারণ করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ড ১৯৭৪-৭৫ সালে মাঠ পর্যায়ে আমেরিকান আপল্যান্ড তুলা দিয়ে পরীক্ষামূলক তুলার চাষ শুরু করে। এরপর অর্ধশতক বছর পার হলেও তুলা চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি বাংলাদেশ। এই ৫০ বছরে বার্ষিক চাহিদার ৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়নি দেশে। যে কারণে ছোট দেশ হয়েও তুলা আমদানিতে সবার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তুলার চাহিদা ১৫-১৬ লাখ মেট্রিক টন। যার মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়। বাকি তুলা ব্রাজিল, আমেরিকা, তুর্কি, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, মালি, ভারত, বেনিন, ক্যামেরুন, জর্জিয়া, স্পেন, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
দেশে যেই পরিমাণ কাঁচা তুলা আমদানি করা হয় তার পুরোটাই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে আসে বলে জানিয়েছেন উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ (চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর) কেন্দ্রের উপপরিচালক মো. শাহ আলম। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘গড়ে প্রতি বছর দেশে ১৪-১৫ লাখ মেট্রিক টন কাঁচা তুলা আমদানি হয়। যার সবটুকুই জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আনা হয়।’
তুলা আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গড়ে প্রতি বছর দেশে ১৪-১৫ লাখ মেট্রিক টন তুলা আমদানি করতে হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে তুলা আমদানি হয় ১৩ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৯ মেট্রিক টন। করোনা মহামারির কারণে পরের অর্থবছর আমদানি কমে যায়। ওই বছর তুলা আমদানি হয় ৭ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন। এর পরের বছর আবার তুলা আমদানি বেড়ে যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে তুলা আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৯১১ মেট্রিক টন। এর পরের অর্থবছর তুলা আমদানি হয় ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তুলা আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৩০ হাজার ৪৪৪ মেট্রিক টন।
অথচ চাইলেই বার্ষিক এই আমদানির অন্তত ২০-৩০ শতাংশ তুলা দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। তুলা চাষযোগ্য বিশাল জায়গা থাকার পরও এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমি রয়েছে যেখানে চাইলে তুলা চাষ করা যাবে। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের ঢাকা, যশোর, রংপুর এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৩৯টি জেলার ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়েছে। এই ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করে ২ লাখ ১ হাজার ২৭২ বেল (৩৬ হাজার মেট্রিক টন) আঁশতুলা পাওয়া যায়। কিন্তু যদি তুলা চাষের উপযোগী পুরো জমিতে চাষ করা যেত, তাহলে এই উৎপাদন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেত। কিন্তু সক্ষমতা থাকার পরও সেই পরিমাণ জমিতে তুলা চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তুলা উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি উপজেলায় প্রায় ৫৫ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র ১৫ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়। এই অর্থবছর ১৫ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমি চাষ করে বীজসহ তুলা পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন। সেখান থেকে আঁশতুলা পাওয়া যায় ১ হাজার ৭৪৩ মেট্রিক টন। কিন্তু যদি পুরো ৫৫ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করা যেত, তাহলে তুলা উৎপাদন বাড়ত আরও কয়েকগুণ।
চাইলেই যে তুলা চাষ বাড়ানো যায় সেটি স্বীকার করেছেন তুলা উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘খাদ্যশস্য উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত না করেও তুলা চাষের ক্ষেত্র বাড়ানো সম্ভব। যেমন আমরা বরেন্দ্র এলাকায় যেতে পারি, সেখানে তুলা চাষের উপযোগী অনেক জমি আছে। চর এলাকায় যেতে পারি, সেখানেও তুলা চাষ হয়। লবণাক্ত এলাকায় যাওয়া যায়, যেখানে লবণাক্ততার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব হয় না, সেখানেও তুলা চাষ করা যায়। তাই যদি কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা যায়, তাহলে দেশে তুলা চাষের জমি অনেক পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। দেশের তুলা চাষ বাড়লে আমদানির পরিমাণ কমবে। এতে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয় হবে। কারণ তখন ডলার খরচ করে তুলা আমদানি করতে হবে না।’