বাবুল জামান, নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৪ ২৩:০৫ পিএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৪ ২১:২৫ পিএম
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে আবাদকৃত চুইঝালের একটি বাগান। প্রবা ফটো
খুলনা, যশোর, নড়াইলসহ দক্ষিণের জেলাগুলোতে চুইঝাল চাষ বেশ জনপ্রিয়। বাসাবাড়ি, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাঁস, গরু, খাসির মাংস ও মাছ ছাড়াও বিভিন্ন খাবারে বাড়তি স্বাদ পেতে এই মসলা বেশ জনপ্রিয় ভোজন রসিকদের কাছে।
শুধু তাই নয়, খাবারের স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যানসার, হৃদরোগ, ক্ষুধামন্দা, গ্যাস্ট্রিক, হাঁপানিসহ অসংখ্য রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও ব্যবহার করা হয় চুইঝাল। বিভিন্ন রোগের ওষুধি গুণ থাকায় অধিক ব্যবহৃত এই লতাজাতীয় মসলার চাষ বাড়ছে বাণিজ্যিকভাবেও।
বাড়ির আনাচে-কানাচে, পরিত্যক্ত ও সুপারি-বাগানসহ বিভিন্ন গাছে পরজীবী হিসেবে বেড়ে ওঠায় খরচের তুলনায় চুই চাষ অধিক লাভ। তাই ওষুধি গুণসম্পন্ন ও মসলাজাতীয় চুইঝাল চাষে আগ্রহ বাড়ছে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর কৃষকদের। আর এসব চুইঝাল বিক্রিতেও নেই ঝামেলা। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যায় বাড়ি থেকে। অল্প পুঁজি ও কম পরিশ্রমে অধিক লাভ হওয়ায় চুইঝাল চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এ উপজেলার অনেক কৃষক।
চুইগাছের আকার-আকৃতি ও পরিমাপ অনুযায়ী প্রতিটি চুইঝালের গাছ বিক্রি হয় ৩ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। নেওয়াশী ইউনিয়নের গোবর্ধ্বনকুটি ব্লকের চাকেরকুটি এলাকার চুইঝালচাষি হোসেন আলীর সুপারি-বাগানে বিভিন্ন গাছের গোড়ায় চুইঝাল লাগিয়েছেন ২ শতাধিক, মকবুল হোসেন লাগিয়েছেন প্রায় ৩০০, মোস্তফা কামাল সাড়ে ৩০০, জালাল উদ্দিনের দেড় শতাধিক এবং মোজাফ্ফর হোসেনের বাগানে রয়েছে দেড় শতাধিক চুইগাছ। কৃষকরা জানান, চুইঝাল চাষে তেমন কোনো খরচ নেই। যেকোনো গাছের গোড়ায় বর্ষা মৌসুমে রোপণ করে মাঝে মাঝে হালকা জৈব সার ও পানি দিলেই হয়ে যায়। ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যেই চুইঝাল খাওয়া কিংবা বিক্রির উপযোগী হয়। আর এসব গাছ বিক্রি হয় ৩ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
কৃষক মকবুল হোসেন জানান, চুইঝাল চাষ করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে তার। চুই বিক্রির টাকা দিয়ে তার সংসারের যাবতীয় খরচ চলে। এই টাকায় তিনি ইট কিনে বাড়ি করেছেন। অন্যদিকে জালাল উদ্দিন জানান, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে নিজের সুপারি-বাগানে চুইঝাল চাষ করছেন। তিনি এ পর্যন্ত একটি গাছ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। চুইগাছ হুবহু পানগাছের মতো হওয়ায় এটি গাছের গোড়ায় রোপণ করতে হয়। তখন চুইগাছ পরজীবীর মতো অন্য গাছ আকড়ে ধরে থাকে। সে গাছ বড় ও মোটা হলেই খাবার ও বিক্রি উপযোগী হয়।
উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের নাখারগঞ্জ এলাকার রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি তার সুপারি-বাগানে ৪০টি গাছে চুইঝাল লাগিয়েছেন। প্রতিবছর তিনি চুই বিক্রি করেন এক থেকে দেড় লাখ টাকা।
নেওয়াশী ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, চুইঝাল ওষুধি গুণসম্পন্ন ও মসলাজাতীয় হওয়ায় চুই চাষের কদর বাড়ছে। আমি আমার ব্লকের কৃষকদের চুই চাষে উৎসাহিত করছি। ফলে এই এলাকায় অনেক চুইচাষি তৈরি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি এখন নাগেশ্বরীতেও সুপারি-বাগান ও বিভিন্ন গাছে সাথি ফসল হিসেবে চুইঝাল চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। শুধু গাছপালা নয়, চুইঝাল চাষ করা যায় ঢালাওভাবে মাটিতে কিংবা মাচার মাধ্যমেও। এর বাণিজ্যিক প্রসার ঘটাতে আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি যাতে দেশের মসলার চাহিদা অনেকাংশে পূরণ হয় সেই লক্ষ্যে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।’