হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ২২:০৪ পিএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪ ২২:০৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
স্বাভাবিক সময়ে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে গেলেই চোখে পড়ে সড়কজুড়ে থাকা ট্রাক ও মিনি ট্রাকের সারি। একটি ট্রাকে পণ্য লোড হচ্ছে তো অন্যটি থেকে করা হচ্ছে আনলোড। আড়ত থেকে পণ্য আনা-নেওয়ায় ব্যস্ত শ্রমিকরা। কিন্তু খাতুনগঞ্জের চিরচেনা এই দৃশ্য এখন আর নেই। এলাচের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) বিক্রি করে এক ব্যবসায়ী অর্ধশত কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনায় খাতুনগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরাজ করছে স্থবিরতা। যার প্রভাবে খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং ব্যবসায় নেমেছে ধস। বাজারে কমেছে পণ্য বেচাকেনা। লেনদেন কমেছে ব্যাংকে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘খাতুনগঞ্জে এখন ব্যবসা-বাণিজ্য নেই বললেই চলে। কোনো ট্রেড নেই। একজন এলাচ ব্যবসায়ী পুরো ব্যবসা-বাণিজ্যকে ধসিয়ে দিয়েছেন। নুর ট্রেডিংয়ের মালিক নাজিম উদ্দিন ব্যবসায়ীদের ৫০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তাই এখন অনেকে ট্রেড করছেন না। যে কারণে এখন বেচাকেনা নেই। স্বাভাবিক সময়ের চার ভাগের এক ভাগও বেচাকেনা হচ্ছে না।’
খাতুনগঞ্জে মূলত ট্রেডিং হয় ডিও স্লিপ বেচাকেনার মাধ্যমে। কিন্তু এই ডিও পরবর্তীতে পণ্য সরবরাহ ছাড়াই একাধিক হাত বদল হয়। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডিও কিনে পণ্য সরবরাহ নেন ব্যবসায়ীরা। আবার অনেক সময় পণ্য সরবরাহ না নিয়ে বেশি দামে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ডিও বিক্রি করে দেন। এই ডিও বিক্রি করে গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন খাতুনগঞ্জের সোনামিয়া মার্কেটের নুর ট্রেডিংয়ের মালিক নাজিম উদ্দিন।
নূর ট্রেডিং গত জুন মাসের প্রথম চার-পাঁচ দিন ব্যবসায়ীদের কাছে এলাচের ডিও বিক্রি করলেও এর বিপরীতে ব্যবসায়ীদের পণ্য অথবা টাকা কোনটি পরিশোধ করেননি। সর্বশেষ গত ৫ জুন ব্যবসায়ীর কাছে এলাচের ডিও বিক্রি করে টাকা নগদায়ন করে হঠাৎ মোবাইল বন্ধ করে দেন নূর ট্রেডিংয়ের নাজিম উদ্দিন। পরে বিষয়টি নিয়ে পরদিন (৬ জুন) সন্ধ্যায় পাওনাদার ব্যবসায়ীরা নাজিমকে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে নিয়ে যান।
ঘটনার সুরাহা না হওয়ায় ওইদিন রাতে তাকে সমিতির কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়। পরদিন তার ভগ্নিপতি এসে সমিতির নামে ১০ কোটি টাকার চেক দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে নাজিম উদ্দিন এবং তার ভগ্নিপতির আর কোনো হদিস মিলছে না। যে কারণে যেসব ব্যবসায়ী নুর ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে এলাচের ডিও কিনেছেন তাদের টাকাগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। নুর ট্রেডিংয়ের মালিকের এই বিশ্বাস ভঙ্গের ঘটনায় খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং ব্যবসায় নেমে এসেছে ধস। ব্যবসা করতে গিয়ে এখন ব্যবসায়ীরা আস্থার সংকটে ভুগছেন। তাই বাজারে কমেছে ডিও বিক্রি। যার প্রভাব পড়ছে খাতুনগঞ্জের পণ্য বেচাকেনায়।
ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল, চাল, মশলাসহ বিভিন্ন পণ্যে অন্তত তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার আড়ত আছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব আড়তে গড়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা বেচাকেনা হতো বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এলাচ বিক্রির নামে টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনায় গত কয়েক দিন ওই বেচাকেনা নেমে এসেছে এক থেকে দেড়শ কোটি টাকার মধ্যে। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় এখন খাতুনগঞ্জে স্থবিরতা বিরাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, পণ্য বেচাকেনায় স্বাভাবিক সময়ে খাতুনগঞ্জে যে সরগরম অবস্থা বিরাজ করে সেটি এখন নেই। আড়তদার, ট্রেডিং ব্যবসায়ীরা দোকান খুলে বসে থাকলেও ক্রেতা খুব একটা নেই। ট্রেডিং অফিসের সামনে মানুষের জটলা নেই। ট্রাক, মিনি ট্রাকে পণ্য লোড-আনলোড নিয়ে সড়কে শ্রমিকদের ব্যস্ততাও নেই।
ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করায় লেনদেন কমেছে ব্যাংকে। কয়েকটি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা কমে যাওয়ায় ব্যাংকের লেনদেনও প্রভাব পড়ছে। আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ লেনদেন হতো। কিছু কিছু ব্যাংকে সেটি অর্ধেকে নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি একটি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ম্যানেজার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এলাচের ডিও বিক্রির টাকা নিয়ে এক ব্যবসায়ী পলাতক হওয়ার ঘটনায় ব্যাংকে লেনদেন কমেছে। খাতুনগঞ্জে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সেটি স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকের লেনদেনে প্রভাব ফেলে। কারণ যেসব ব্যবসায়ীর টাকা আটকে যায়, তখন তারা ব্যাংকে লেনদেন করতে পারেন না। অন্যদিকে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটলে তখন অন্য ব্যবসায়ীরা আরও সতর্ক হয়ে যান। এতে বাজারে বেচাকেনা কমে যায়। বাজারে বেচাকেনা কমলে তখন ব্যাংকেও লেনদেন কমে। কারণ ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রি করে টাকা ব্যাংকে রাখেন। আবার দরকার হলে ব্যাংক থেকে তুলেন। কিন্তু বেচাকেনা না হলে তখন লেনদেন স্থবির হয়ে যায়।