রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৪ ১১:৩০ এএম
বাংলাদেশ ব্যাংক । ছবি : সংগৃহীত
ব্যাংক, আর্থিকপ্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের সর্বত্র চলছে তীব্র আস্থার সংকট। মহামারি, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে মন্দা চলছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। তাই নিরাপদ বিনিয়োগের হিড়িক পড়েছে সরকারি বন্ডে। উচ্চ সুদহার এ খাতে গ্রাহক আকর্ষণে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আর্থিক পরিমাণে বিনিয়োগ করছে এ খাতে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেসরকারি খাত। তারল্য সংকটে ভুগছে অধিকাংশ ব্যাংক।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, ‘বর্তমানে শহরাঞ্চলের বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকে টাকা না রেখে বিল বন্ডে বিনিয়োগ শুরু করেছে। সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি না করে বিল বন্ডের অর্থে নজর থাকলে সাধারণ মানুষের এ খাতে বিনিয়োগের হার বাড়বে। এতে ব্যাংক আমানতেও প্রভাব তৈরি করতে পারে।’
জানা গেছে, বিনিয়োগের অর্থের ওপর কর সুবিধার আশায় সদ্যসমাপ্ত জুন মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। অনেক গ্রাহক আবেদন করেও বিনিয়োগের সুযোগ পাননি। বিনিয়োগকারীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থবছরের শেষ মাসে সরকারের দরকার বিপুল অর্থ। ব্যাংক থেকে একসঙ্গে এত টাকা নিলে তারল্য সংকট আরও তীব্র হবে। তাই সাধারণ মানুষের বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একসঙ্গে অধিক আবেদন সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।
ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগের আবেদন করেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী পারভেজ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে জুন মাসে বন্ড কেনা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রক্রিয়াগত ধীরগতি রয়েছে। অথচ এ মাসের মধ্যে কিনতে না পারলে আমি কর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হব।’ গতকাল তিনি জানিয়েছেন জুন মাসের মধ্যে বন্ডে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে পারেনি ব্যাংক।
এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার ট্রেজারি বিভাগে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সেবা মিলছে না। অতিরিক্ত চাপে সার্ভার ঠিকমতো কাজ করে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার
ব্যক্তিপর্যায়ের আবেদন বেশি হওয়ায় অধিক চাপে সার্ভার স্লো হওয়ার পাশাপাশি সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ধীরগতি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আস্থাহীনতার কারণে ব্যাংক থেকে যেসব আমানত উত্তোলন হয়েছে কিংবা ব্যাংকে না রেখে হাতে রেখে দিচ্ছে, সেসব টাকা বন্ডে বিনিয়োগ হচ্ছে। এতে ব্যাংকে সরকারি ঋণের বোঝা কমবে। তাই ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একসঙ্গে অধিক চাপ তৈরি হওয়ায় সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে, যা দুশ্চিন্তার কারণ নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জুনের মধ্যে বিনিয়োগ সম্পন্ন না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা কর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেÑ এটা ঠিক, তবুও নিরাপদ ও সুদহার বিবেচনায় এ খাতে বিনিয়োগের চাপ আপাতত বাড়বে। এতে ব্যাংকে আমানত কমে যাবে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। কারণ বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের হাতে টাকা থাকবে না, আবার যাদের টাকা আছে তারাও বন্ডে বিনিয়োগ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জুন মাসে ৩৮ হাজার কোটি টাকার ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বন্ড বিক্রি করে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়েছে সরকার। এক মাসের মধ্যে ডজনখানেক অকশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব অকশনে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের আধিক্য দেখা গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তিন মাস থেকে ২০ বছর মেয়াদে বিল বন্ডে বিনিয়োগ করেছেন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।
জানা গেছে, সরকার অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। গত মে মাস পর্যন্ত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গত অর্থবছরের চেয়ে বেড়েছে ৬১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা, যা ১৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, আস্থাহীনতাসহ নানা দুরবস্থার মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।
তবে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার নিচ্ছে না। এর কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। গত মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণ ১৬ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকে বেড়েছে ৭৮ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। সমাপ্ত অর্থবছরের ১১ মাসে সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। যেখানে গত এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। যদিও ২০২৩ সালের এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছিল ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
বন্ডে উচ্চ সুদ
তথ্যমতে, ১০ বছরমেয়াদি বন্ডের সুদহার এখন সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু গত ডিসেম্বর মাসেও ১০ বছরমেয়াদি এই বন্ডের সুদের হার ছিল ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এদিকে ১৫ বছরমেয়াদি বন্ডে সুদ উঠেছে ১৫ দশমিক ২০ এবং ২০ বছরমেয়াদি সুদের হার ছিল ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ২০০৭ সালের দিকে বন্ডের সুদহার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এরপর থেকে কমতে থাকে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পথ অনুসরণ করছে। সুদহার বাড়িয়ে একদিকে মানুষের হাতের টাকা ব্যাংকে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে খরচ বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বন্ডে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১২ থেকে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ১২ দশমিক ৩০ থেকে ১৫ দশমিক ৩০, ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ১২ দশমিক ৫৪ থেকে ১৫ দশমিক ৮০, ১৫ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ১২ দশমিক ৬০ থেকে ১৫ দশমিক ২০ এবং ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ১২ দশমিক ৫৯ থেকে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। এটি প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে।
এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের ঋণ দিচ্ছে না। এজন্য ব্যাংকগুলো সরকারি বিল-বন্ড ক্রয়ের ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী সুদের হার বাড়িয়ে নিচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের যেমন সুদ ব্যয় দিনদিন বাড়ছে। একইভাবে বেসরকারি খাতের ছোট উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। কারণ ব্যাংক নিরাপদ খাত হিসেবে তার বেশিরভাগ অর্থই বেশি সুদের বিল-বন্ডে বিনিয়োগের চেষ্টা করছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ছোট উদ্যোক্তারা উৎসাহ হারাবেন। আর কর্মসংস্থান তৈরির পথ রুদ্ধ হবে।
দেশের উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য গত বছর থেকে সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। এরপর থেকেই হুহু করে বাড়ছে ব্যাংকঋণের সুদের হার। সঙ্গে লাফিয়ে বাড়ছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এসব উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সে উদ্দেশ্য এখনও পূরণ হয়নি। উল্টো মূল্যস্ফীতি দিনদিন বেড়েই চলেছে।