রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৪ ০৮:৫৯ এএম
আপডেট : ২২ জুন ২০২৪ ০৯:০৩ এএম
বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের কারণে রিজার্ভ রক্ষায় কৃচ্ছ্রসাধন নীতিতে চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে ডলার খরচ কমানো হয়েছে। এতে একদিকে কিছু ডলার সাশ্রয় হলেও উৎপাদনমুখী পণ্যের কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও লাগাম পড়েছে। আমদানি কমায় উৎপাদনও কমেছে। ফলে চাহিদার বিপরীতে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্যমতে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) নিত্যপণ্যের এলসি বা ঋণপত্র খোলা কমেছে ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডলার সংকটের কারণে দুই বছর ধরে কম গুরুত্বপূর্ণ ও বিলাসপণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা। এর কিছু সুফলও মিলেছে। তবে বিলাসী পণ্য নিয়ন্ত্রণের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের আমদানিতে। ডলারের অভাবে এসব পণ্যের আমদানিকারকরাও চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে পারছেন না।
আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকটের কারণে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কমার প্রভাব পড়েছে বাজারের ওপর। চাহিদামতো এলসি করতে না পারায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা হয়েছিল ৬১৪ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা হয়েছে ৫২৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে এলসি খোলা কমেছে ৯০ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের।
আর ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ৬০৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারের। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৮২ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ১২১ কোটি ৪ লাখ ডলারের এলসি কম নিষ্পত্তি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে কম গুরুত্বপূর্ণ ও বিলাসীপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা একটা ভালো পদক্ষেপ। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। এমনিতেই দেশে এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস চলে এসেছে। আবার যদি ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারে, তাহলে সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। এজন্য ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ছাড় দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স রইসের কর্ণধার ইলিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘ডলার সংকটের চাপ সামলাতে বিলাসীপণ্যের ওপর কড়াকড়ি শর্তারোপ করা হলেও তা একটা পর্যায়ে নিত্যপণ্যের ওপরও পড়েছে। ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় আদানিকারকরা পণ্য আমদানি করতে পারছেন না। বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে ডলার সরবরাহ করে পণ্য আমদানি করা হয়েছে। তবে এত দামে ডলার কিনে ব্যবসা টিকে রাখা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা সত্ত্বেও আমদানির জন্য এলসি খোলা এবং নিষ্পত্তি দুটোই কমেছে। এতে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে।’
এদিকে, শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা এবং নিষ্পত্তিও কমেছে ১ দশমিক ৪১ শতাংশ ও ২১ দশমিক শূন্য ৮৭ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা হয়েছে ১ হাজার ৭৬৬ কোটি ১৫ লাখ ডলারের। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ২৫ কোটি ৭ লাখ ডলারের এলসি কম খোলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ২ হাজার ৮২ কোটি ১৪ লাখ ডলারের। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ৬২৭ কোটি ২৯ লাখ ডলারের। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৪৫৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের এলসি কম নিষ্পত্তি হয়েছে।
অপরদিকে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা কমেছে ১৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ ও এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল ২৩৮ কোটি ১৮ লাখ ডলারের। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১৯৩ কোটি শূন্য দশমিক ৪ লাখ ডলারের। সেই হিসাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা কমেছে ৪৫ কোটি ১৪ লাখ ডলারের।
আর গত অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ২৮২ কোটি ৯৯ লাখ ডলারের। আর চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ২১২ কোটি ২৮ লাখ ডলারের। সেই হিসাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য খোলা এলসি নিষ্পত্তি কম হয়েছে ৬৯ কোটি ৭১ লাখ ডলারের।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রপ্তানিমুখী শিল্পের সংঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। বিকেএমএমইএর নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কাঁচামাল আমদানি নিশ্চিত করতে না পারলে রপ্তানি ধরে রাখা যাবে না। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না। এতে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন কমাতে এবং পণ্যের অর্ডার ফেরত পাঠাতে হচ্ছে। রপ্তানির নতুন বাজার তৈরি করার যে প্রচেষ্টা চলছে; সে মুহূর্তে আগের বাজার ধরে রাখাই কঠিন হয়ে যাবে।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না। তাই সুতার জন্য ভারতে যেতে হচ্ছে। ডলার সংকটের আড়ালে কৌশলে বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে কি না; সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করেন ব্যবসায়ী এ নেতা।