× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তারল্য সংকটে ধার করে চলছে ব্যাংক

রেদওয়ানুল হক

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৪ ০০:৫৪ এএম

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪ ১০:২৪ এএম

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট প্রকট হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ধার করে দৈনন্দিন লেনদেন সম্পন্ন করছে বেশিরভাগ ব্যাংক। প্রয়োজনীয় আমানত সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দেশের ব্যাংক খাত। সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় অনেক ব্যাংকের ঋণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। কিছু ব্যাংক গ্রাহকের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। কেউ আবার দিচ্ছে কিস্তিতে। কয়েকটি ভালো ব্যাংক ৫-১০ লাখ টাকার চেক নগদায়নে গ্রাহকের কাছে সময় চাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধারের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলো। কখনও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় ধার নেওয়া হচ্ছে, আবার সমালোচনা ঠেকাতে কখনও কলমানি মার্কেট থেকে বেশি মাত্রায় ধার নিচ্ছে। তবে বেশিরভাগ ব্যাংকই ঋণ নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কলমানি মিলে গড়ে প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা ধার নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে সরকারি, বেসরকারি উভয় খাতেরই ব্যাংক রয়েছে। গত ১৯ মে নিলামে ৪২টি ব্যাংক ও ৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) রেপো ও তারল্য সহায়তা সুবিধার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ১৭ হাজার ৯২ কোটি ৪ লাখ টাকা ধার নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ওইদিন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো এবং অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট ফ্যাসিলিটির (এএলএসএফ) নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নিলামে এক দিন মেয়াদি রেপো সুবিধার আওতায় ৪টি ব্যাংক মোট ৩০৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ১৩টি বিড, ৭ দিন মেয়াদি রেপো সুবিধার আওতায় ২২টি ব্যাংক ও ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার ১৫৯টি বিড এবং এক দিন মেয়াদি অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট ফ্যাসিলিটির আওতায় ১৬টি পিডি ব্যাংক মোট ৭ হাজার ৮৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকার ৭৩টি বিড দাখিল করে। অকশন কমিটি কর্তৃক সব বিডই গৃহীত হয়। ফলে রেপো ও এএলএসএফের আওতায় মোট ১৭ হাজার ৯২ কোটি ৪ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। উল্লিখিত এক ও সাত দিন মেয়াদি রেপো এবং অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট ফ্যাসিলিটির সুদের হার ছিল যথাক্রমে বার্ষিক ৮ দশমিক ৫, ৮ দশমিক ৬০ ও ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। একই দিন আন্তঃব্যাংক বা কলমানি থেকে ব্যাংকগুলো ধার করেছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, সরকারি ট্রেজারি বিলের ক্রমবর্ধমান সুদের হার ও নীতিহার বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিয়ে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করছে। কারণ ট্রেজারি বিলের সুদহার এখন ১২ শতাংশ।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, কাঙ্ক্ষিত হারে আমানত পাওয়া যাচ্ছে না। বরং বিদ্যমান আমানত অভাবের কারণে অনেকেই তুলে নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, শরিয়াহ ব্যাংকগুলোর গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে আমানত কমেছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে বিনিয়োগ কমার কথা ছিল। কিন্তু আমানত কমলেও ব্যাংকগুলোর এক মাসে ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর ঋণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রের তথ্য বলছে, অধিকাংশ ব্যাংকের এডিআর বা আমানত ও ঋণের নির্ধারিত সীমা ভেঙে গেছে। পর্যাপ্ত আমানত না পেয়ে ব্যাংকগুলোর এডিআর সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে ধার দিয়ে ব্যাংক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় আমানত সংগ্রহে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কার্যদিবসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা পেলেও এখন ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী জুলাই থেকে রেপোর মাধ্যমে তারল্য সহায়তা প্রতিদিনের পরিবর্তে সাপ্তাহিক হবে।

জানা গেছে, দুর্বল ব্যাংক সবলের সঙ্গে বাধ্যতামূলক একীভূত হওয়ার খবরে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে আমানত প্রত্যাহার করছেন; এ তথ্য জানিয়েছেন কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, শুধু সাধারণ আমানতকারী নন, সরকারি আমানত প্রত্যাহার করার চিঠি দেওয়া হচ্ছে। অস্বাভাবিক হারে আমানত কমে যাওয়ায় তারা দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে পারছেন না। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করেছে বেসিক ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আমানত উত্তোলন করেছেন গ্রাহকরা। ফলে কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না।

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের গ্রাহকদের চেক ফেরত দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকের চাপে ব্যাংক কর্মকর্তাদের গা-ঢাকা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় তরল সম্পদ না থাকায় ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ধার করতে পারছে না। ফলে তীব্র তারল্য সংকটের মুখে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একীভূত হতে যাওয়া অপর ব্যাংক পদ্মাও গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না। ব্যাংকটি চেক ফেরত না দিলেও কয়েক কিস্তিতে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিচ্ছে।

আরও কয়েকটি ব্যাংকের আমানতকারীরা ৫-১০ লাখ টাকার চেক নগদায়নে জটিলতায় পড়ছেন। এসব চেক নগদায়নের জন্য ৭-১০ দিন আগে জানিয়ে দিতে হচ্ছে। তবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় এসব ব্যাংকের নাম প্রকাশ না করতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করেছে। এ ছাড়া অন্তত সাতটি ব্যাংকের চলতি হিসাবে ঘাটতি রয়েছে। অর্থনীতিতে বড় সংকট ঠেকাতে এসব ব্যাংককে বিশেষ সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশেষ সহায়তা দিয়ে কোনো ব্যাংক টিকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। এ ছাড়া সরকারি কোষাগার থেকেও অর্থ দেওয়া যাবে না। কারণ এতে কোনো লাভ হবে না। এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সমস্যাগ্রস্ত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো অধিগ্রহণ করে অন্য মালিকের হাতে দেওয়া কিংবা ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা। তবে বর্তমান একীভূত প্রক্রিয়ার সঙ্গে একমত নন এ অর্থনীতিবিদ।

অপরদিকে ডলার সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত হারে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে শিল্পের উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। লোকসান কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাই করছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে বেকারত্বের হার। মানুষের কর্মসংস্থান কমলেও সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। একদিকে মানুষের ব্যয় বেড়ে গেছে, অপরদিকে কমে গেছে আয়। বাধ্য হয়ে মানুষ তার জমানো অর্থ ভেঙে খাচ্ছে। এভাবেও আমানত কমে যাচ্ছে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এসব কারণে ব্যাংকগুলোর টাকার সংকট কাটছে না, বরং দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর টাকার সংকট দেখা দিলে আন্তঃব্যাংক থেকে ধার করে থাকে। কিন্তু আন্তঃব্যাংকে বা কলমানি মার্কেটে সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো ও বিশেষ রেপোর আওতায় ব্যাংকগুলোকে ধার দিচ্ছে। প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ধার করত ব্যাংকগুলো। কিন্তু এ বিষয়ে সমালোচনা হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কম ধার করে কলমানি মার্কেট থেকে বেশি ধার করছে। এতে কলমানি মার্কেটে সুদহার বেড়ে গেছে। বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলো আবারও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাড়তি ঋণ নেওয়া শুরু করেছে। অর্থাৎ ধারের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার পরিমাণ ধীরে ধীরে কমিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছিল। যেমন গত ১৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া হয় ১২ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। ১৪ মে ধার নেওয়া হয় ১৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। ১৫ মে ধার নেওয়া হয় ১৩ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। ১৬ মে ধার নেওয়া হয় ১৮ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। কিন্তু গত ১৯ মে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া হয় ১৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা। সম্প্রতি ধারের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। গত সপ্তাহে ১০ হাজার কোটি টাকার আশপাশে ছিল ধারের অঙ্ক। সাধারণত মাসের প্রথমে ধার কিছুটা কম থাকে। 

গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া কমিয়ে দিলেও কলমানি মার্কেট থেকে বেশি মাত্রায় ধার নেওয়া শুরু করে। এর ফলে কলমানি মার্কেটে সুদহার ১০ শতাংশে উঠে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আবারও বেশি মাত্রায় ধার দেওয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সর্বোচ্চ সুদ গুনতে হচ্ছে পৌনে ৯ শতাংশ।

অপরদিকে কলমানি মার্কেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১২ মে কলমানিতে ওভারনাইট ঋণে গড় সুদ ছিল ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। গত বৃহস্পতিবার এটি ছিল ৯ শতাংশ। অপরদিকে ১৪ দিন মেয়াদি ‍ঋণের সুদ ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এ ছাড়া এক থেকে তিন মাস মেয়াদি ঋণের সুদহার ১১ থেকে সাড়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করছে। অর্থাৎ চড়া সুদে ধার করতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফেরাতে হবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নেমে এলে আবারও মানুষ ব্যাংকে বেশি মাত্রায় আমানত রাখবে। এতে কমে যাবে ব্যাংকের টাকার সংকট।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা