প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৪ ২২:১৫ পিএম
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪ ২২:১৫ পিএম
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনা করে সানেম। ছবি: সংগৃহীত
সংস্কার না হলে সহজেই সঠিক পথে উঠতে পারবে না দেশের অর্থনীতি। মনে হচ্ছে, সংস্কারবিরোধী গোষ্ঠী অনেক বেশি শক্তিশালী; কর ও ঋণখেলাপিরা একসূত্রে গাঁথা। ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতি ও খেলাপি ঋণের সমস্যা বড় আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে প্রভাবশালী ও ধনীরা কর দিচ্ছেন না বা নানা রকম ছাড় পাচ্ছেন। তাই এখনই ব্যাংক ও রাজস্ব খাত সংস্কারের পথনকশা প্রণয়ন করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।
শনিবার (৮ জুন) প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫–এর পর্যালোচনা তুলে ধরে গবেষনা সংস্থাটি। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটের আকার আরও ছোট করার পাশাপাশি দরিদ্রদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। তারা জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের ওপর চাপ আরও বেড়ে যাবে। এ ছাড়া বাজেটের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করে সানেম।
সানেম জানায়, দেশের অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচকই এখন নেতিবাচক। টানা ১৫ মাস ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় অর্থনীতির ভিত্তিগুলো ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এ জন্য বৈশ্বিক ধাক্কার ধকল সইতে পারছে না। এ বাস্তবতায় অর্থনীতি সঠিক পথে ফেরাতে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে দ্রুত সংস্কার শুরু করতে হবে; সংস্কার না হলে অর্থনীতি সঠিক পথে ফিরবে না। সে জন্য সংস্কারের পথনকশা প্রণয়ন করে দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘করোনার আগে অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ছিল। সে সময় ছিল অর্থনৈতিক সংস্কারের সুবর্ণ সময়। কিন্তু সবার তাগাদা সত্ত্বেও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল আমাদের অর্থনীতি নিতে পারেনি। সংস্কার না হওয়ায় আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত অবস্থায় নেই। বাংলাদেশের মতো ভিয়েতনামও একই রকম ধাক্কা খেয়েছিল; কিন্তু তাদের অর্থনীতি ধাক্কা সামলে নিতে পেরেছে।’
সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক সায়েমা হক মূল বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিভিন্ন সমস্যা বিদ্যমান। মোটাদাগে বলতে গেলে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভের ক্ষয় এখন বড় বিষয়। সে জন্য বাজেটের আকার ছোট করা হয়েছে, কিছু পণ্যের উৎস কর কমানো হয়েছে ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে। এটা ভালো দিক। এর সুফল কিছু জনগণ পাবে। তবে সাড়ে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এটি অর্জন করতে হলে বাজেট ছোট করার পাশাপাশি আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বাজেটে সে ধরনের কিছু নেই।’
সায়েমা হক আরও বলেন, ‘করহার বাড়ানোর দিকে যতটা নজর দেওয়া হয়েছে, করের আওতা বাড়ানোর দিকে সেভাবে নজর দেওয়া হয়নি। মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেওয়ার বদলে অস্বস্তি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো এমনিতে তারল্যসংকটে আছে, ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকঋণ নেওয়া সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে ধার দিলে মূল্যস্ফীতিতে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘এত উদ্যোগের পরও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কমছে না। ৬-৯ সুদহার ছিল ভুল নীতি। যাঁদের টাকার প্রয়োজন ছিল, তাঁরা কম সুদে ঋণ নিয়ে খরচ করেছেন। এখন সুদহার বাড়ানো হয়েছে। চাপে পড়া মানুষ ইতিমধ্যে সেই সংকটে অনেকটা মানিয়ে নিয়েছেন। ফলে সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি কমানো যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। যথাসময়ে যথাযথ নীতি না নেওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে।’
সেলিম রায়হান আরো বলেন, অতিধনীদের করের আওতায় আনা না গেলে ও ন্যায্যভাবে কর আদায় করতে না পারলে কর ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা আসবে না। কালো টাকা ১৫ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করার সুযোগ সাংবিধানিক চেতনাবিরোধী। এটি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে; দুর্নীতি সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে। দরিদ্র ও নিম্নমধ্য আয়ের মানুষের জীবনে তার প্রভাব পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সময় নয়। নিকট ভবিষ্যতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা প্রধান কাজ। পাশাপাশি দরিদ্রদের স্বস্তি দিতে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
অনুষ্ঠানে সানেমের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ইশরাত হোসাইন, আফিয়া মোবাশ্বিরা তিয়াশা, নাফিসা জামানসহ অন্য গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।