বাজেট ২০২৪-২৫
রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৪ ০৮:৪০ এএম
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৪ ২৩:৩১ পিএম
জাতীয় বাজেটের অন্যতম প্রধান সমস্যা রাজস্ব আয়ের ঘাটতি। ব্যয়ের তুলনায় প্রয়োজনীয় আয় না থাকায় প্রতি বছরই ঋণ করে ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে। ফলে তারল্য সংকটে পড়ে ব্যাংক খাত। অন্যদিকে দিন দিন বৈদেশিক ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে। বাড়ছে সুদের ব্যয়। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রবৃদ্ধির গতি থমকে দাঁড়াচ্ছে এবং কর্মসংস্থান কমছে। তাই আয় বাড়ানোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবারের বাজেটে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্ব আয়ে অব্যাহত ঘাটতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে বড় ধরনের সংস্কার দরকার। নীতি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। এ ছাড়া দুর্নীতি বন্ধ এরং জবাবদিহি নিশ্চিত করে আয়ের পুরো অর্থ কোষাগারে জমা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ২ লাখ ২০ হাজার ৭৭১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ঘাটতি ছিল ৫৯ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। সে সময় ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ২ লাখ ১৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। ঘাটতি ছিল ৮৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছর ৩ লাখ ১০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ২ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ঘাটতি হয় ৩৮ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ঘাটতি ছিল ২৮ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয় ৩ লাখ ২৫ হাজর কোটি টাকা। ঘাটতি ছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের লক্ষ্য নির্ধারিত আছে ৩ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ১০ মাসে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি আছে আরও ২৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও মে মাস শেষ হয়ে যাওয়ায় হাতে আর এক মাস সময় আছে।
রাজস্ব আয় বাড়াতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুটি পদক্ষেপের মাধ্যমে আয় বাড়ানো যেতে পারে। প্রথমত, কর নীতিতে যেসব ছাড় দেওয়া হয়েছে সেগুলো সংস্কার দরকার। যেসব খাতে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে ছাড় দিয়ে সুফল মিলছে না তাতে সংস্কার আনতে হবে। কারণ ২০ বছর ধরে সুবিধা দিলেও যদি কেউ নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে তাহলে ছাড় দিয়ে লাভ নেই।’
ছাড়ের কারণে আড়াই লাখ কোটি টাকা আয় কমে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একসঙ্গে কমিয়ে আনা সম্ভব নয়, তবে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। এবারের বাজেটে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনতে পারলে একটা ভালো শুরু হবে।
দ্বিতীয়ত, রেট রেশনালাইজেশন বা করহার যৌক্তিকীকরণ। একই খাতে বিভিন্ন ধরনের রেট আছে এগুলো কমিয়ে এনে একক রেটের দিকে যেতে হবে। একটি বাস্তবায়ন করতে পারলে করদাতাদের ট্যাক্স পলিসি বুঝতে সুবিধা হবে। ২০১২ সালে যে আইন ছিল সেখানে ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাকি সব খাতে ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। বর্তমানে একই ধরনের ব্যবসার বিভিন্ন ধরনের রেট রয়েছে, এটি থাকা উচিত নয়।
এ ছাড়া কর উত্তোলনের লিকেজগুলো কমানো দরকার। অর্থাৎ করদাতা টাকা দিচ্ছে কিন্তু কোষাগারে জমা হচ্ছে না; এমন সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। সাধারণত নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে এটি হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে মেশিন ও যন্ত্রাংশের আলাদা রেট থাকার কারণে কর কর্মকর্তার সঙ্গে সমঝোতা করে হার নির্ধারণ করা হয়। ফলে করদাতা ঠিকই টাকা দেয় কিন্তু তার পুরোটা কোষাগারে জমা হয় না। এটি রুখতে কর কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের সুযোগ বন্ধ করতে হবে বলে মনে করেন ড. জাহিদ।
তার মতে, পলিসিতেই সবকিছু বলা থাকবে। তা ছাড়া সবকিছু অটোমেশনের মাধ্যমে হতে হবে। যাতে কর কর্মকর্তা আর করদাতার মুখোমুখি হতে না হয়। এর ফলে ভোগান্তির ভয়ে ট্যাক্স না দেওয়ার প্রবণতা কমে আসবে।
এ ছাড়া জবাবদিহি নিশ্চিতের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে রিপোর্টিংয়ের জটিলতা দূর করতে হবে। অনেক তথ্যই আপডেট থাকে না তাই পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সময়মতো রিপোর্টিং করা এবং রিপোর্টে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
টার্গেটগুলো যাতে বাস্তবসম্মত হয় বা টার্গেট ঠিক করা হয়। এতে সংশ্লিষ্টরা লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ হবে। কিন্তু অবাস্তব টার্গেট নিলে প্রথমেই তারা ভয় পেয়ে যাবে, কাজের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ অ্যাকাউন্টেবিলিটির একটি বেঞ্চমার্ক তৈরি করা বা জবাবদিহির কার্যকর লক্ষ্য ঠিক করা প্রয়োজন।
বর্তমানে রাজস্ব সংগ্রহ এবং নীতি প্রণয়ন উভয় কাজই করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এটি বড় ধরনের আসামঞ্জস্য বা ভুল ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। কারণ যিনি কর আদায় করবেন নীতি প্রণয়নের ক্ষমতা যদি তার হাতে থাকে তাহলে তিনি তার নিজের সুবিধামতো নীতি তৈরি করেন। তাই রাজস্ব সংগ্রহ ও রাজস্ব নীতি আলাদা করতে হবে। রাজস্ব নীতি এনবিআর থেকে আলাদা করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে; যেখানে রাজস্ব নীতি প্রণয়নকারী কর্মকর্তারা ফুলটাইম কাজ করবে। সারা বছরই নীতিতে কিছু না কিছু পরিবর্তন আনবে। এটি চলমান প্রক্রিয়া, চলতে থাকবে।
তিনি বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়ন সবচেয়ে খারাপ হয় রাজস্ব খাতে; প্রতি বছরই ঘাটতি থেকে যায়। বড় ধরনের সংস্কার না হলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। আমরা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছি। আমাদের আয় অন্তত দ্বিগুণ হতে হবে। বর্তমানে আমরা জিডিপির ৮ শতাংশ আয় করি; ভারত আয় করে ১৮ শতাংশ। আমরা যদি ১৮ শতাংশে যেতে পারি তাহলে সরকারের আর কোনো সমস্যাই থাকবে না।’
প্রয়োজনীয় কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া পরোক্ষ কর আরোপ করে অসম নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে যা স্বল্প আয়ে মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হচ্ছে। প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধিতে নজর দিতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এনবিআরকে তৎপর ও দক্ষ হতে হবে। পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। ট্যাক্স নেট বাড়াতে হবে; এটা সমতাভিত্তিক হতে হবে। গ্রামের ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনতে হবে। কর কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া যাবে না, এতে কোষাগারে পুরো অর্থ জমা হয় না। ফি ও ট্যারিফ নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পোর্টে ট্যাক্সের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
এদিকে করের হার না বাড়িয়ে নেট বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে গ্রামেগঞ্জের অনেক মানুষ এখনও করের আওতার বাইরে রয়েছে। তাই আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে। এর পাশাপাশি কর দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা যেসব দাপ্তরিক জটিলতার মুখোমুখি হন সেটি অনেক বড় বাধা। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আয় বাড়ানোর জন্য ট্যাক্স নেট বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে আওতা সম্প্রসারণ করে উপজেলা পর্যায়ে নেট বাড়াতে হবে। তাহলে সেখান থেকে অনেক আয় হবে। এ ছাড়া কর আদায় সহজ করতে হবে। পোর্টের সমস্যা সমাধান করতে হবে। যেকোনো মূল্যে সময়ক্ষেপণ বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে পণ্য খালাসে ১০ থেকে ১২ দিন লেগে যায়, সেটি এক থেকে দুই দিনেই সম্ভব। এসব ঝামেলা কমলে অন্যান্য ব্যয় কমবে। ফলে কর ফাঁকির হার কমে যাবে।’