এসডোর গবেষণায় দাবি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৪ ২২:১২ পিএম
রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডোর কার্যালয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রবা ফটো
দেশের অন্যতম রপ্তানিখাত পোশাকশিল্পে বিষাক্ত পলি অ্যান্ড পারফ্লোরোয়ালকিল সাবটেন্স (পিফাস) ব্যবহার হচ্ছে বলে একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এবং ইন্টারন্যাশনাল পলোটেন্টস ইলিমিনেশন নেটওয়ার্কের (আইপেন) যৌথ উদ্যোগে করা গবেষণায় বলা হয়েছে, পিফাস সহজে ধ্বংস হয় না বলে এটি দীর্ঘ সময় পরিবেশে রয়ে যায়। সেজন্য এটিকে ‘চিরস্থায়ী কেমিক্যাল’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। পদার্থটি ব্যবহারের কারণে শিল্প-কারখানা অঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে এটি প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি, ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি, কম ওজনে শিশুরজন্ম এবং টিকার ওপর প্রভাব ফেলে। লিভারের ক্ষতি করে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে এটি ব্যবহারের কোন মাত্রা নির্ধারিত না থাকলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমা থেকে ৩০০ গুণ বেশি এবং নেদারল্যান্ডের (ডাচ) সীমার চেয়ে ১ হাজার ৭০০ গুণ থেকে ৫৪ হাজার গুণ বেশি মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে।
বুধবার (২৯ মে) রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডোর কার্যালয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা ও সিনিয়র পলিসি ও টেকনিক্যাল উপদেষ্টা এবং গবেষণা দলের প্রধান ড. শাহরিয়ার হোসেন। গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন আইপেন গ্লোবালের গবেষক জিটকা স্ত্রাকোভা ও শ্যানন ইফফাত আলম, অংশ নেন গবেষক ড. সারা ব্রোসচি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পোশাক কারখানার আশপাশের এলাকার পানির নমুনায় উচ্চ মাত্রার ক্ষতিকর পিফাস নামক রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অনেক নমুনায় পিফাসের পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং নেদারল্যান্ডসের নির্ধারিত মাত্রার ওপরে। বাংলাদেশে পিফাস নিয়ে নির্দিষ্ট আইন না থাকায় গবেষণার ফলাফল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানদন্ডের সঙ্গে তুলনা করে করা হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ হিসেবে পরিচিত। দেশের অনেক কারখানা বিশ্বের প্রধান ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করছে। তাদের বিভিন্ন পণ্যে পিফাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যা তেল এবং দাগ-প্রতিরোধ করতে পারে। বিশ্বে ৫০ শতাংশ পিফাস ব্যবহার করা হয় টেক্সটাইল শিল্পে। বিশ্বব্যাপী পিফাস নির্গমনে পোশাকশিল্প দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। গবেষণায় বাংলাদেশের ৩১টি পানির নমুনার মধ্যে ২৭টিতে পিফাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যার ১৮টি নমুনায় নিষিদ্ধ পিফাস রাসায়নিক পিএফওএ, পিএফওএস, অথবা পিএফএইচএক্সএস পাওয়া গেছে এবং ১৯টি নমুনায় প্রস্তাবিত ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সীমা (8 দশমিক 8 ন্যানোগ্রাম প্রতি লিটার বা এনজিএল) অতিক্রম করেছে।
গবেষণায় বলা হয়, ২০১৯ সালে কর্ণফুলী নদীর পানিতে সর্বোচ্চ পিফাস শনাক্ত করা হয়েছিল। যা প্রস্তাবিত ইউরোপীয় সীমার চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি। সেই নমুনায় দুটি নিষিদ্ধ পিফাসেরও উপস্থিতি ছিল, একটির মধ্যে ডাচ সীমার চেয়ে ১ হাজার ৭০০ গুণ বেশি এবং অপরটিতে ৫৪ হাজার গুণ বেশি। ২০২২ সালে হাতিরঝিলের লেক থেকে নেওয়া আরেকটি নমুনায় পিএফওএ এবং পিএফওএস উভয়ই উপস্থিত ছিল। যা ডাচ সীমার চেয়ে ১৮৫ গুণ বেশি। এছাড়া পোশাক কারখানার কাছাকাছি এলাকায় উচ্চ পিফাস পাওয়া। পোশাকশিল্পে পাওয়া পিফাস পানি দূষণের জন্য দায়ী।
এ বছর দুটি জলপথে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ঢাকা এবং আদমজী ইপিজেড) কাছাকাছি আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিমের নমুনা সংগ্রহ করা হয়, যেখানে ডাউনস্ট্রিমের নমুনায় পিফাসের ঘনত্ব পাওয়া গেছে।
নলকূপের পানিতেও পিফাসের উপস্থিতি রয়েছে উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়, ২০১৯ সালের চারটি কলের পানির নমুনার মধ্যে তিনটিতে পিফাস পাওয়া গেছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের খাবার পানির জন্য নির্ধারিত পিএফওএ সীমার ওপরে (৪ এনজিএল)। গবেষণাটি বাংলাদেশের পোশাকেও করা হয়েছে। পাঁচটি পোশাকের স্যাম্পলের সবকটিতেই পিফাস পাওয়া গেছে। আর একটি পুরুষের জ্যাকেটে নিষিদ্ধ রাসায়নিক পিএফওএ পাওয়া গেছে।
গবেষণাটি সম্পর্কে সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, ‘পিফাস মূলত যৌগিক পদার্থ। এক হাজার কেমিক্যালের সমন্বয়ে এটি গঠিত। পিফাস নিয়ে এটিই বাংলাদেশে প্রথম কোন গবেষণা। ২০১৯ ও ২০২২ সালে এ গবেষণাটি করা হয়েছে। পিফাস মানব স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক হুমকি। এটি জমির উর্বরতা নষ্ট করে, ভ্রূণ বিকাশ এবং থাইরয়েড ও হরমোনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া কিছু পিফাস শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, লিভার নষ্ট করে এবং ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। এরই মধ্যে কিছু পিফাস স্টকহোম কনভেনশনের মাধ্যমে সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আরও কিছু নিষিদ্ধের ব্যাপারে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘পোশাকখাত থেকে বিষাক্ত রাসায়নিক নির্গমন মানুষকে উচ্চঝুঁকিতে ফেলছে। আমাদের নদী-নালা ও কলের পানিতে পিফাস দূষণ ঘটছে। এ জন্য এখন থেকেই তৈরিপোশাক কারখানাগুলোকে সচেতন হতে হবে। পিফসের বিকল্প ব্যবহার করতে হবে।’
স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে গবেষণার প্রধান ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘নদী, লেক, কলের পানি, এবং পোশাকে পিফাস আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ও পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি। তবুও শিল্প-কারখানা এবং নীতিনির্ধারকরা সাড়া দিচ্ছেন না।’
পোশাক শিল্প-কারাখানায় পিফাসের নিরাপদ বিকল্প রয়েছে বলে জানিয়েছেন জিটকা স্ত্রাকোভা। তিনি বলেন, ‘মানব বিকাশের সব পর্যায় পিফাসের স্থায়ী এক্সপোজারের কারণে প্রচুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে। টেক্সটাইল শিল্পকে তাদের পিফাস ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করা উচিত। তাদের পণ্যে পিফাস সামগ্রী সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকা উচিত।’
গবেষণাটির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি এস এম মান্নান কচি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের পোশাক শিল্প-কারখানায় যদি এমন কোন (পিফাস) কেমিক্যাল ব্যবহার হয় যা দেশ, মাটি, পানি, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যদি তেমন কোন উপাদান পাওয়া যায় তাহলে সেটি আমরা বাদ দিব। কেননা তারা নিশ্চয় দেশের কল্যাণেই গবেষণাটি করেছে। সেক্ষেত্রে যে যে কেমিক্যালগুলো ক্ষতির কারণ হচ্ছে তা চিহ্নিত করে আমরা তা ব্যবহার করবো না।’
তিনি আরো বলেন, ‘ক্রেতারাও যদি প্রমাণ পান যে, আমাদের পোশাকে বা কারখানায় বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহৃত হচ্ছে তাহলে এ শিল্পের জন্য বড় ধরনের হুমকি আসবে। যারা গবেষণা করছে তাদেরকে কার্যক্রমও দেখতে হবে। প্রত্যাশা করবো তারা গবেষণাটি নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে এবং প্রয়োজনে বড় ধরনের সেমিনার করে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে।’