জয়ন্ত সাহা
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২২:০৪ পিএম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২৩:১৮ পিএম
মেলার এ কয়দিন বই বিক্রি তুলনামূলক কম হলেও রবিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বদলে যায় চিত্র। পছন্দের বই হাতে ঘরে ফিরেছেন অনেকেই। প্রকাশকরা বলছেন, গত চার দিনের চেয়ে রবিবার তাদের বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। এদিন বেলা ৩টায় বইমেলার দুয়ার খুলতেই দেখা যায় নানা বয়সি পাঠকের ভিড়। রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে সপরিবারে বইমেলায় এসেছিলেন রিয়াজ আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আজ আমার ডে অফ ছিল। তাই আজকেই অবসর পেয়েছি মেলায় আসার। পছন্দের বইগুলো একটু যাচাই-বাছাই করে কেনা যাবে।’ তার সঙ্গে ছিল অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে শারার মাশরাফি চৌধুরী। তার ভাষায়, ‘আমি উপন্যাসই বেশি পড়ি। হুমায়ূন আহমেদের সবগুলো কিশোর উপন্যাস পড়া শেষ। এখন অন্যান্য লেখকের উপন্যাস কিনতে হবে।’
ক্রেতার ভিড় মানে প্রকাশের খুশি। ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মেলার প্রথম দিকে শুক্র ও শনিবার পড়েছে। ছুটির দিনে যেমন পাঠক হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে কিন্তু বেশ ভিড়। আশা করছি সামনের সপ্তাহ থেকে তিলধারণের ঠাঁই হবে না। বিক্রি তখন আরও জমজমাট হবে।’

এদিন মেলায় এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। এ বছর অনন্যা প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে তার আত্মজীবনী ‘যে জীবন আমার ছিল’। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার লেখালেখির বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হলো। এবার বেশ ভাবনাচিন্তার পর মনে হলো, নিজের আত্মজীবনী প্রকাশ করা যাক। লেখালেখি করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেগুলোই সংকলিত হয়েছে এই আত্মজীবনীতে।’ এবারের মেলায় ক্রেতাসমাগম দেখে তিনি মুগ্ধ জানিয়ে বলেন, ‘শুরুর দিকে যে জনসমাগম দেখছি তাতে আমি মুগ্ধ। তবে মনে হলো মেলার প্যাভিলিয়নগুলো একদম গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটু স্পেস থাকলে ভালো হতো।’
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী কামাল কাদের সাহিত্যচর্চা করেন। করোনা মহামারির আগে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। এরপর মন দিয়েছেন ছোটগল্প লেখায়। সাহিত্যপাঠে তিনি পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের অনুগামী হলেও বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য বইগুলোও পড়েছেন। বাংলার কথাসাহিত্যিকদের নতুন বইগুলো সংগ্রহ করতে গত শনিবার উড়ে এসেছেন ঢাকায়। এক দিন বিশ্রাম নিয়ে তিনি সোজা চলে আসেন অমর একুশে বইমেলায়। রবিবার সন্ধ্যায় বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু যে বই কিনতেই প্রতিবার বইমেলায় আসি তা নয়, সেই সঙ্গে প্রথিতযশা অনেক লেখকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও আমি পেয়ে যাই। তাদের সঙ্গে নিজের লেখালেখি নিয়ে আলোচনা করার সুবর্ণ সুযোগ তো শুধু এই বইমেলাতেই পাই।’

এদিন বইমেলায় আসেন রাজনীতিবিদ-গবেষক নূহ-উল-আলম লেনিন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি আজই মেলায় প্রথমবারে মতো এলাম। মেলা বেশ গোছানোই মনে হলো। প্রচুর দর্শক দেখছি। বইও কিনছেন তরুণরা। তাদের আড্ডা, বই নিয়ে তর্কাতর্কি ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগছে।’
তিনি জানান, এ বছর ঝুমঝুমি প্রকাশনী থেকে তার একটি প্রবন্ধ সমগ্র প্রকাশিত হবে মেলার শেষ ভাগে।
পিআইবির চাকরি ছেড়ে এখন অখণ্ড অবসর গবেষক শামীমা চৌধুরীর। আগে প্রবন্ধ সমগ্র ও গবেষণার বই লিখলেও এ বছর বইমেলায় তার ছোটগল্প এসেছে। ছোটগল্প সমগ্র ‘ভেসে যায় বেহুলার ভেলা’ প্রকাশিত হয়েছে শিল্পতরু প্রকাশনী থেকে। তিনি বলেন, ‘এ বছর একটু ভিন্ন পরিচয়ে এলাম। আমি মুখিয়ে আছি আমার ছোটগল্প সমগ্রটি কীভাবে নেয় পাঠক।’
পঞ্চম দিনের নানা আয়োজন
রবিবার বিকাল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : সমরজিৎ রায় চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহিদ মুস্তাফা। আলোচনায় অংশ নেন মইনুদ্দীন খালেদ ও মুস্তাফা জামান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিল্পী হাশেম খান। প্রাবন্ধিক জাহিদ মুস্তাফা বলেন, ‘শিল্পী সমরজিৎ তার জীবনব্যাপী প্রগতিশীল আদর্শ ও চেতনা ধারণ করেছেন। শান্তির অন্বেষায় তার চিত্রপটে রং, রেখা, রূপক—এসব একাকার হয়ে আছে।’ আলোচকরা বলেন, সমরজিৎ রায় চৌধুরী একাধারে একজন প্রতিভাবান শিল্পী, অভিভাবকসূলভ শিক্ষক এবং বন্ধুবৎসল ছিলেন। পরম্পরা-নির্ভর শিল্পী হলেও তার চিত্রভাষায় আধুনিকতার ছোঁয়া ছিল স্পষ্ট। শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে আনন্দ ও লাবণ্য তৈরিতে তিনি বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। পরিচিত ও অপরিচিত দুই ধরনের মোটিফের ব্যবহার তার চিত্রের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতি, মানুষ আর লাল-সবুজের বিন্যাস তার চিত্রকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে শিল্পী হাশেম খান বলেন, ‘শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী ছিলেন নিষ্ঠাবান একজন শিক্ষক। দৃঢ় মনোবলের অধিকারী এই শিল্পী চাটুকারিতাকে কখনও প্রশ্রয় দেননি, বরং ভালোবাসা দিয়েই সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মন জয় করেছিলেন। তিনি তার নিজের চিত্রভাষা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন।’
‘আজ লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কুদরত-ই-হুদা, বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, আবু সাঈদ তুলু, ফরিদুর রহমান। আগামী সোমবার বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ : কাজী রোজী’ এবং ‘স্মরণ : দিলারা হাশেম’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন নাসির আহমেদ এবং তপন রায়। আলোচনায় অংশ নেবেন আসলাম সানী, শাহেদ কায়েস, আনিসুর রহমান ও শাহনাজ মুন্নী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অসীম সাহা।
নতুন বই
রবিবার নতুন বই এসেছে ৭৩টি। মেলার পঞ্চম দিনে চারুলিপি থেকে প্রকাশিত হয়েছে শহীদুল্লা কায়সারের ‘রাজবন্দীর রোজনামচা’, অনিন্দ্য থেকে আহমদ রফিকের ‘ফিলিস্তিনি-আফগান-রোহিঙ্গা নিপীড়নের নানান রূপ’, প্রথমা থেকে মহিউদ্দিন আহমদের ‘ইতিহাসের বাঁকবদল : একাত্তর ও পঁচাত্তর’, অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে মঞ্জু সরকারের ‘ডিজিটাল দেশের কৃষ্ণবিবর’, কথাপ্রকাশ থেকে ইমতিয়ার শামীমের ‘অন্ধপ্রদীপ শূন্য-পানে’, ইউপিএল থেকে ‘সময়ের কুয়াশায় দীপেশ চক্রবর্তীর সম্মানে প্রবন্ধগুচ্ছ’, অন্যধারা থেকে সাদাত হোসাইনের ‘সে এসে বসুক পাশে’, আগামী থেকে ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের ‘বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর অতীত ও বর্তমান’, পাঠক সমাবেশ থেকে আহমাদ মোস্তফা কামালের ‘গল্পসংগ্রহ : দ্বিতীয় খণ্ড’, অবসর থেকে মোহাম্মদ ইব্রাহীমের থ্রিলার উপন্যাস ‘বিষকাঁটালী’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে আহসান হাবীবের শিশুতোষ সাহিত্য ‘স্টপার’, অন্যপ্রকাশ থেকে মারুফুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ ‘চৈত্রে একাকী’, মিজান পাবলিশার্স থেকে আলী ইমামের ইতিহাসভিত্তিক বই ‘রক্তে রাঙানো পনের আগস্ট’, বিভাস প্রকাশনী থেকে যতীন সরকারের প্রবন্ধ সমগ্র ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান চেতনা’, টাঙন থেকে হাবিবা বেগমের প্রবন্ধ ‘সাহিত্য সংস্কৃতি ও ভাষা প্রসঙ্গ’।