প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২২ ১৮:৩১ পিএম
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২২ ১৮:৫০ পিএম
সংগীত রচয়িতা, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী বা বাদ্যযন্ত্রশিল্পী-কাউকে যেন আর দুস্থ শিল্পী পরিচয়ে বেঁচে থাকতে না হয়। শিল্পকর্মের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের পাশাপাশি ওই শিল্পকর্মের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে প্রাপ্য অর্থটুকু যেন তারা বুঝে পান এমন দাবি উঠেছে বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের পক্ষ থেকে। তারা বলছেন, গুণী শিল্পীদের জীবদ্দশাতেই যেন তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়।
শনিবার (১২ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল আর্কাইভস ভবনের মিলনায়তনে এমন দাবি তুলেছেন চার জ্যেষ্ঠ সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম, সুজিত মোস্তফা ও মনির খান। এদিন কপিরাইট অফিসের আয়োজনে বাংলা গানের তিন কিংবদন্তির সরকারি ওয়েবসাইট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট দাউদ খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এসময় মরমি কবি হাছন রাজা, বাউল সম্রাট হিসেবে পরিচিত শাহ আবদুল করিম ও রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গানের ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, হাছন রাজার প্রপৌত্র সামারীন দেওয়ান ও শাহ আবদুল করিমের ছেলে শাহ নূর জালাল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া এই তিন শিল্পীর গানের ওয়েবসাইটের মূল উদ্যোক্তা কপিরাইট বিশেষজ্ঞ জাফর রাজা চৌধুরী ও কারিগরি সহযোগিতা টিমের প্রধান জেড এম স্টুডিওর কর্ণধার জুয়েল মোর্শেদও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জুয়েল মোর্শেদ ওয়েবসাইটের বিস্তারিত অতিথিদের সামনে উপস্থাপন করেন ।
পরে আলোচনায় যোগ দিয়ে একুশে পদকজয়ী সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদকে বলেন, ‘৪৫০টিরও বেশি সিনেমাতে গান গেয়েছি আমি। একুশে পদক পেয়েছি। এই শেষ জীবনে এসে আমি আর কিছু চাই না। আমি চাই, এই বয়সে এসে যেন আমাকে কোনোভাবেই যেন দুস্থ শিল্পী হিসেবে বেঁচে থাকতে না হয়। এ জন্য যা কিছু করার আপনারা করবেন।’
রফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা তো বড় বেশি বিস্মৃতপরায়ণ। আমি জানি না, আমি বা আমার স্ত্রী আবিদা পারভীন এ পর্যন্ত যত গান গেয়েছি, আমরা মরে গেলেও সেসব গানের কী হবে বা আমাদের কেউ আদৌ মনে রাখবে কী না! আজকে শাহ আবদুল করিম, হাছন রাজা ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান সংরক্ষণে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। এ তো শুধু ওয়েবসাইট উদ্বোধন নয়, এর মাধ্যমে তাদের গানকেও সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। তেমনিভাবে আমরা যারা জীবিত আছি, তাদের দাবি একটাই আমার গানগুলো যেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌছায়। আর তা যেন আমাদের জীবদ্দশাতেই হয়।’
সুজিত মোস্তফা বলেন, ‘আজকে অল্প কিছু শিল্পী ছাড়া বাকিদের তেমন উপার্জন নেই। ছেলেরা গান শেখাও ছেড়ে দিয়েছে। আগে যারা মাস্টারি করে টিকে ছিলেন, তারা টিকতে পারছেন না। আমরা যারা টপ গ্রেডের আর্টিস্ট তারা রেডিওতে অনুষ্ঠান করে মাসে ১৩৫০ টাকা পাই। বাংলাদেশ টেলিভিশনে মালঞ্চ অনুষ্ঠানে গান করে আমি পেতাম ছয় হাজার টাকা। সেটাকে দ্বিগুণ করার দাবি জানালাম। তো কী হলো! আগে ৫০ মিনিটের হিসাব করে ছয় হাজার টাকা দেওয়া হত। এখন ২০ মিনিটের হিসাব করে দেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা। আমাদের অনেক শিল্পী রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে সুযোগ পান না, গাইতে পারেন না। ইউটিউবে সস্তা গানের ভিউ বিবেচনায় এখন আয় হচ্ছে। তো আমাদের ভরসা তো এই কপিরাইট অফিস। আমাদের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে এখন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করতে হবে। ভালো জিনিসের ভিউ তো সবসময় হয় না, ভাইরাল হয় না। এই শিল্পকর্ম থেকে কীভাবে অর্থ উপার্জন করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে।’
আলোচনায় যুক্ত হয়ে শিল্পী মনির খান, গীতিকবি আসিফ ইকবাল, প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের স্ত্রী লিপিকা এন্ড্রু ও প্রয়াত ব্যান্ডতারকা আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনাও একই দাবি তোলেন।
ওয়েবসাইট উদ্বোধনের প্রতিক্রিয়ায় শাহ আবদুল করিমের ছেলে শাহ নূর জালাল বলেন, ‘বাবাকে একবার সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা গান যে এত শিল্পী গাইছে, ওরা কি আপনাকে টাকা দেয়? বাবা হতবাক হয়ে বললেন, আমার গান ওরা ঠিকমতো গাইছে কি না, মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে কি না, তাই আমার চাওয়া। বাবা চাইতেন, তার গানের কথা ও সুর যেন বিকৃত না হয়। কিন্তু তার জীবদ্দশাতেই দেখলাম, তার গানের কথা ও সুর ঠিক থাকছে না। আমরা এখন চাই, তার গানের স্বরলিপি প্রণয়ন করে ওই বিকৃতি রোধ করতে।’
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, ‘এখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রধানতম দায়িত্ব হলো, শুদ্ধ সংস্কৃতিকে ধরে রাখা। সেই সংস্কৃতিকে রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি তা যেন তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছায় তার ব্যবস্থাও করতে হবে।’
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন,‘শিল্পীরাই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাদের সৃজনশীল সৃষ্টিকর্ম চিরস্থায়ী করে রাখতে ও নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের মাধ্যমে খ্যাতনামা আরও ২০ জন শিল্পীর ওয়েবসাইট তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে তাদের সৃজনশীল কর্ম সংরক্ষণের পাশাপাশি যথাযথ রয়্যালটি প্রাপ্তির অধিকারও নিশ্চিত হবে। সংগীত সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ, সিঙ্গার্স অ্যাসোসিয়েশন ও মিউজিক কম্পোজার্স সোসাইটি এর প্রতিনিধিরা সভা করে ঠিক করবেন কোন ২০ জন শিল্পীর ওয়েবসাইট তৈরি করা হবে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১৮তম দপ্তর হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংস্থাটিতে সিড মানি হিসেবে ৫০ কোটি টাকা প্রদান করেছেন। নির্মাণাধীন ১৩ তলা কপিরাইট ভবনের একটি ফ্লোরে মিউজিক মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানসমূহের ডিজিটাল আর্কাইভিংয়ের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শিল্পী শাহ নূর জালালের হাতে গত এক বছরে শাহ আব্দুল করিমের গানের রয়্যালটি বাবদ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত ১০ হাজার ডলারের চেক হস্তান্তর করেন।