প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২২ ০৮:০৫ এএম
আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২ ০৮:৪৭ এএম
ছবি; সংগৃহীত
মরমি কবি হাসন রাজা, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গানগুলোর কথা ও সুর বিকৃতি রোধ করার পাশাপাশি মেধাস্বত্ত্ব সংরক্ষণ করতে এবার উদ্যোগী হয়েছে কপিরাইট অফিস। বাংলা গানের এই তিন কিংবদন্তির গানগুলো সংগ্রহ-সংরক্ষণের পাশাপাশি এবার তাদের সংগীত জীবনের আদ্যোপান্ত নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে আনার প্রয়াস হয়েছে সরকারি উদ্যোগে।
এই তিন শিল্পীর জন্য আলাদা তিনটি ওয়েবসাইট ডিজাইন করা হয়েছে, যা শনিবার (১২ নভেম্বর) এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানকিভাবে যাত্রা শুরু করবে।
এই ওয়েবসাইট উদ্বোধন হওয়ার পর হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার প্রকৃত গান কোনগুলো সেটা যেমন শ্রোতারা জানবেন, তেমনি ওই গানগুলো ডিজিটাল কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রচার করলে তা থেকে অর্জিত অর্থের একাংশ পাবে সুরস্রষ্টা বা তার উত্তরাধিকারীরা।
কপিরাইট অফিসের সাবেক রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী এই উদ্যোগটি নেন ২০১৯ সালে। বাংলাদেশের কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা ও প্রয়াত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর গান সংরক্ষণে ওয়েবসাইট উদ্বোধনের পর রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা একদিন আগারগাঁওয়ের কপিরাইট অফিসে যান। সেখানে তিনি তার গান সংরক্ষণে এমন একটি ওয়েবসাইট চালু করার কথা জানান, যেখানে তার গানের পাশাপাশি তার সংগীত জীবনের আদ্যোপান্ত উঠে আসবে।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার ওই ওয়েবসাইট ডিজাইন করতে গিয়ে কপিরাইট রেজিস্ট্রার তখন তার পূর্ব পুরুষ মরমি কবি সুরস্রষ্টা হাসন রাজার গান সংরক্ষণের কথাও ভাবতে শুরু করেন। পাশাপাশি ভাঁটি অঞ্চলের আরেক সুরসাধক বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের গানের মেধাস্বত্ত্ব সংরক্ষণের দাবিও জোরালো হয়ে উঠে।
গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আবদুল করিমের ৪৭২টি গানের মেধাস্বত্ব নিবন্ধন করে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস। গানগুলো পরে 'Shahabdulkarim.com' নামের ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ করা হয়।
শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে কাজ শুরু হওয়ার পর হাসন রাজা ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গানের মেধাস্বত্ত সংরক্ষণরে জন্য ওয়েবসাইট ডিজাইনের কথাও ভাবতে শুরু করে কপিরাইট অফিস। জেডএম স্টুডিও তাতে কারিগরি সহায়তা দিতে এগিয়ে আসে।
বাংলাদেশের কপিরাইট আইনের ৭৮ ধারায় উল্লেখ আছে, গীতিকার কিংবা সুরকারের অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের ওয়েলকাম টিউন, টেলিভিশন, বেতার কিংবা ইউটিউবে তাদের গান প্রচার করা যাবে না। কিন্তু এই আইনের তোয়াক্কা না করে শিল্পীদের গান হরহামেশাই বাজছে এফএমরেডিও, টেলিভিশনে। এ নিয়ে শিল্পীরা অভিযোগ জানালেও তাদের সংগীতকর্মের জন্য কপিরাইট নিবন্ধনে খুব একটা আগ্রহ দেখা যায় না।
কপিরাইট আইন অনুসারে, একটি গানের গীতিকার ও সুরকারকে গানরে মূল স্বত্বাধিকারী বিবেচনা করা হয়। ফলে তাদের অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে গান পরিবেশনের সুযোগ নেই। কপিরাইট আইনের ৮২ (১) ধারায় বলা আছে, স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে কোনো গান পরিবেশন করলে তা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে, ইচ্ছাকৃতভাবে আইনের লঙ্ঘন করলে দণ্ডের বিধানও রয়েছে।
বাউল শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর পর পরিবারের অনুমতি ছাড়া তার গান বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে অনেক সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অর্থ কামালেও কানাকড়ি পায়নি তার পরিবার। অন্যদিকে মরমি কবি হাসন রাজার গানের কথা ও সুর বিকৃত হচ্ছে দেশে-বিদেশে। হাসন রাজার গানের মূলভাবও ঠিক থাকছে না বলে অভিযোগ করেন হাসন রাজার প্রপৌত্র সামারীন দেওয়ান।
সামারীন দেওয়ান বলনে, ‘হাসন রাজার গানের তো এখন কপিরাইট স্বত্ব নেই। তার মৃত্যুর একশো বছর পর এসে আমরা দেখছি, এ দেশে বা আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় হাসন রাজার যে গানগুলো গাওয়া হয় নানা সময় তাতে কথা ও সুর বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আমরা উদ্যোগ নিই। হাসন রাজার গানের খাতা ও স্বরলিপি আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। তা থেকেই আমরা ১০০টি গান রেকর্ড করি। তাতে অর্থায়ন করে ইউনেস্কেো। বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের আওতায় তারা আমাদের ২৫ হাজার ডলার দেয়। সেই অর্থেই আমরা গান রেকর্ড করে ফেলি।’
প্রাথমিকভাবে হাসন রাজার ওয়েবসাইটে ১০০টি গান রাখার উদ্যোগ থাকলেও সেটা হচ্ছে না বলে জানান সামারীন দেওয়ান।
তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জেডএম স্টুডিও থেকে আমাদের ১০০টি গান দেওয়ার কথা বলা হলেও আমরা তা দিচ্ছি না। কারণ, হাসন রাজার প্রতিটি গানের সঙ্গে আমরা তার জীবনের নানা অধ্যায় জুড়ে দেবো কথায় কথায়। সেই কাজটি আমরা করছি সঠিক তথ্য প্রমাণের সাপেক্ষে। এমনি তো অনেক ওয়েবসাইটে অনেক রকম তথ্য আছে। এবারের ওয়েবসাইটটিতে যেন সঠিক তথ্যই পাঠক বা শ্রোতারা জানতে পারেন, সেই উদ্যোগ থাকবে আমাদের।’
কপিরাইট আইন অনুযায়ী, কারও মৃত্যুর ৬০ বছর অতিক্রান্ত হলেও তার সৃষ্টিকর্মের মেধাস্বত্ব কেউ দাবি করতে পারে না। তখন ওই সৃষ্টিকর্ম জনগণের সম্পত্তি (পাবলিক ডোমেইন) হয়ে যায়। সেই শিল্পকর্ম থেকেও রয়্যালিটি আদায়ের পন্থা বের করেছে কপিরাইট অফিস।
কপিরাইট বিশেষজ্ঞ জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘ট্রেডিশনাল কালচারাল এক্সপ্রেশন অ্যাক্ট- বলে একটা ধারা বিশ্বের নানা দেশের কপিরাইট আইনে রয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, যা কিছু পাবলকি ডোমেইন হয়ে গেছে এমন সৃষ্টিকর্ম কেউ বিকৃত করতে পারবে না। ওই সৃষ্টিকর্মের বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য যথাযথ সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করলে তাকে অর্জিত অর্থের একাংশ সেই কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ সেই সৃষ্টিকর্মের গবেষণা ও সংরক্ষণে ওই অর্থ ব্যয় করবে। আমাদের নতুন কপিরাইট আইনে এই ধারাটি রাখা হয়েছে, যা কি না আইন মন্ত্রণালয়ে পর্যবেক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা এভাবেই হাসন রাজার গান থেকেও রয়্যালিটি আদায় করবো।’
শাহ আবদুল করিমের ছেলে শাহ নূর জালাল বলেন, ‘সরকারি সহযোগিতায় আবদুল করিমের জীবনকর্ম সংরক্ষণের বন্দোবস্ত হয়েছে। এ তো আমাদের জন্যই আনন্দের খবর! আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল বাবার গানগুলো যেন বিকৃত না হয় কোনোভাবে। পাশাপাশি এখন আমার বাবার গান কেউ চাইলেই তার মতো করে টিভিতে, রেডিওতে বাজাতে পারবে না। তা থেকে যে টাকা আয় হয়, তা থেকে প্রাপ্য অংশটুকুও আমরা পাবো।’
রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান সংরক্ষণে একটি সমস্যায় পড়তে হয় কপিরাইট অফিসকে। বন্যা তার সংগীত জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন ভারতরে পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গে বেশ কয়েকটি রেকর্ড লেভেল থেকে তিনি গানের সিডি বা ক্যাসেট প্রকাশ করেছেন। কপিরাইট আইন অনুযায়ী, বন্যার অনেক গানের মেধাস্বত্ব থেকে গেছে ভারতের ওই রেকর্ড লেভেল কোম্পানির কাছে। বাংলাদেশের রেকর্ড লেভেল কোম্পানিগুলোও মেধাস্বত্ব দাবি করবে বন্যার গানের।
এমন পরিস্থিতি উত্তরণে পথ বের করে কপিরাইট অফিস। প্রথমে তারা বের করে ভারতে রেকর্ড করা কোন গানগুলোর মেধাস্বত্ব রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা নিজের কাছে রেখেছেন। সেই গানগুলো তারা সংগ্রহ করে। পরে বাংলাদেশের রেকর্ড লেভেল কোম্পানির মালিকদের নিয়ে তারা একটি সভা করে। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যদি রেকর্ড লেভেল কোম্পানির সঙ্গে বন্যার কোনো গানের চুক্তি হয় এবং বন্যা তা অন্যত্র ব্যবহার করতে চান, তবে সেখান থেকে যা আয় হবে তার এক চতুর্থাংশ ওই কোম্পানিকে দিতে হবে। বন্যার গান যারা রেকর্ড করেছেন, ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা ওই শর্তে রাজি হলে বন্যার অনেক গান নতুন ওয়েবসাইটের জন্য সংগ্রহ করে কপিরাইট অফিস।
তিন শিল্পীর ওয়েবসাইটের কারিগরি দিকটি দেখছেন জেডএম স্টুডিওর কর্ণধার জুয়লে মোর্শেদ। তিনি জানান, প্রতিটি ওয়েবসাইটে ‘কনটেন্ট আইডি সিস্টেমে শিল্পীর গানের কথা ও সুর ধারণ করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া কোনো ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুকে কারও সুর ও কথা পেলে তা শনাক্ত করে। পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গান থেকে স্বত্ব বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ শিল্পীর নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাবে।
কপিরাইট অফিসের সাবেক রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘এমনি করে আমরা প্রথতিযশা শিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে চাই। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিল্পীদের গানগুলো সংরক্ষিত থাকলে তা থেকে কীভাবে রয়্যালিটি আদায় করতে হবে, তা আমরা কেবল শুরু করেছি। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার মতো শিল্পীরা যদি সচেতন হন, তবে আমাদের অনেক গান কিন্তু বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পায়।’