প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৩ ২১:১০ পিএম
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৩ ২১:১৭ পিএম
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর ষ্টুডিয়েটার হলে ‘আমি বিরঙ্গনা বলছি’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। ইন্দ্রজিৎ কুমার ঘোষ
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী কি কেবল তার শরীর আর সম্ভ্রমের বিনিময়েই ৯ মাসের এক ভয়াল যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, সে কি তার মনন ও সাহসিকতার সর্বোচ্চ পরীক্ষা দেয়নি? মহান মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা নারীদের বীরত্বগাঁথা রচনা করেছে স্বকীয় ভাষ্যে৷ রাষ্ট্র বীরাঙ্গনাদের বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সেই দেশ কি কখনও নিঃসঙ্কোচে সেই বীর মায়েদের পরিচয় দিয়েছে গর্বে- অহঙ্কারে?
স্পর্ধা- ইন্ডিপেন্ডেন্ট থিয়েটার কালেকটিভের নতুন নাটক ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ নাটকে উঠে এসেছে বাংলাদেশের জন্মলগ্নে সেই বীর মায়েদের আত্মকথন৷ নিদারুণ আর্তনাদে ধ্বনিত হয়েছে বীর মায়েদের একাকী, অসহায় জীবনের নির্মম ও নিষ্ঠুরতম পীড়নের গল্প।
নাট্যকার অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ এ নাটকের কাহিনি প্রায় সবটুকুই নিয়েছেন নীলিমা ইব্রাহীমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ গ্রন্থ থেকে। নীলিমা ইব্রাহীমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাত বীর মায়ের বয়ানের নির্যাস নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন মর্মন্তুদ এ নাটকের ভাষ্য।
একাত্তরের নারায়ণগঞ্জের উচ্ছ্বল, রাজনৈতিক তরুণী ‘ময়না’ এবং কাপাসিয়ার অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া ‘মেহেরজান’ এর বয়ানে এ নাটকে উঠে আসে কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের ভয়াল দিনগুলোর কথা৷
বাংলা প্রচলিত নাট্যরীতির সঙ্গে ইউরোপীয় নাট্যধারার মেলবন্ধনে নাট্যকার সৈয়দ জামিল আহমেদ ‘ময়না’ ও ‘মেহেরজান’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের যে সত্যভাষণ রচনা করেছেন, সমকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তা হয়ে উঠে প্রাসঙ্গিক। একাত্তরে কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে নির্মমতার শিকার সে নারীর সঙ্গে সিরিয়া, মিয়ানমার কিংবা আফ্রিকায় সংগঠিত যুদ্ধাপরাধের সাযুজ্য খুঁজে পায় দর্শক। কেবল শরীরে দগদগে ঘাঁয়ের কথাই তো ইতিহাস বলে গেছে কালে কালে। কিন্তু সে যোদ্ধা নারীর মন ও চিন্তার জগতে যে ভয়াল ত্রাস রচনা করে গেছে পাক হায়েনা সেই সত্যানুসন্ধান করেছে কি ইতিহাস- নতুন এ নাটকের প্রতি অঙ্কে ধ্বনিত হয়েছে সে আর্তনাদ।
বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) বিকেলে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ নাটকের বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে স্পর্ধা।
সৈয়দ জামিল আহমেদ নাটকটি নিয়ে বলেন, এটা অনস্বীকার্য যে, বীরাঙ্গনারা নির্যাতিত ও শোষিত হয়েছেন বার বার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে অধিকাংশ বাঙ্গালির হাতে। উভয় ক্ষেত্রে নারী ব্যবহৃত হয়েছে, পাকিস্তানে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে এবং বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের দ্যোতক রূপে।
দীর্ঘ তিন মাসব্যাপী মহড়া শেষে ‘স্পর্ধা’ মঞ্চে এনেছে এ নতুন নাটকটি।
সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ নাটকটি মঞ্চে আনার তাড়না আমার সবসময় ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি তো সেই বীরাঙ্গনাদের জন্য কিছু করতে পারিনি৷ সেই তাড়না ছিল। তাছাড়া এ রাষ্ট্র কখনো কখনো তার জাতীয়তাবাদের স্বার্থে বীরাঙ্গনাদের ইতিহাস লিখে গেছে নিজের মতো৷ কিন্তু তাদের যথাযথ সম্মান বা ভালোবাসা কোনোটি দিতে পারিনি।’
এ নাটকে ‘ময়না’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন শারমিন আক্তার শর্মী এবং ‘মেহেরজান’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মহসিনা আক্তার৷ এ ছাড়া নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বুড়ী আলী, শ্রাবণী ফেরদৌস, আরমীন মূসা, মো. সোহেল রানা, সরওয়ার জাহান উপল, সিফাত নওরীণ বহ্নি, জৌপারী লুসাই, রিয়াসাত সালেকিন ঋত্বিক, উম্মে আইমান৷ নাটকে সঙ্গীত পরিবেশন করছে ঘাসফড়িং কয়্যার।
শুক্রবার (১৬ জুন) থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ নাটকের ৩০টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে৷ প্রতিটি প্রদর্শনীতে ১৩৫ জন দর্শকের আসন বরাদ্দ থাকবে৷