কুষ্টিয়া প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৩ ১৮:৪৮ পিএম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৩ ১৯:২১ পিএম
তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব উপলক্ষে কুষ্টিয়ার আখড়াবাড়িতে জড়ো হয়েছেন বাউল সাধকরা। প্রবা ফটো
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছেড়ে ক্ষ্যাপারে, তুই মূল হারাবি, ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’ এমন শত শত গানের মায়াবী সুরের মায়াজালে আবিষ্ট হয়ে পড়েছে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি। শনিবার (৪ মার্চ) থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব-২০২৩। লালন একাডেমির আয়োজনে এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠান সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা থাকলেও শুক্রবার (৩ মার্চ) থেকেই লালন আখড়াবাড়িতে বসেছে ভবের হাট।
শনিবার গিয়ে দেখা যায়, আখড়াবাড়িতে সমবেত হয়েছেন মরমি সাধক ফকির লালন শাহের অসংখ্য ভক্ত অনুসারী। লালন স্মরণোৎসব-২০২৩ উপলক্ষে এসব ভক্ত এসেছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। আত্মিক নানা বাসনা নিয়ে, সহজ-সরলভাবে জীবন অনুসন্ধানের প্রত্যয় নিয়ে তারা এসেছেন। এখানে গুরু-শিষ্যের ভাবের আদান-প্রদান যেমন চলছে, তেমনি চলছে জীবনের তিরোধান, ভাবসাধন আর দেহতত্ত্ব নিয়ে অপূর্ব সুর মূর্ছনা।
সিলেট থেকে আসা ফকির শাহাদৎ শাহ্ বলেন, ‘প্রতিবছর দোলপূর্ণিমা এলেই আমরা সাধু-গুরু ছুটে আসি আখড়াবাড়িতে। গুরু-শিষ্যের মিলনমেলায় চোখে চোখ রেখে শুরু হয় ভাবের খেলা। ভাবজগতের মধ্যে বেজে ওঠে—তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে। সাধুবাজারেই পাওয়া যায় বাউলিয়ানার সরেজমিন আচারনিষ্ঠা এবং ভজন-সাধনের স্বরূপ বৃত্তান্ত।’
আখড়াবাড়ির আঙিনায় বসার
জায়গা হবে না বলে অনুষ্ঠান শুরুর ১০ দিন আগেই এসে আসন পেতেছেন সিরাজগঞ্জের লালন ভক্ত
ষাটোর্ধ্ব কলিম শাহ। প্রবীণ এই বাউল সাধক বলেন, ‘বছরে
দুবার সাঁইজির বারামখানায় সাধু-গুরুদের মিলনমেলা বসে। এই দিন এলে কিছুতেই বাড়িতে
মন টেকে না। সংসারের সব মায়ার সুতো ছিঁড়ে চলে আসি আখড়াবাড়ি।’
৩০ বছর ধরে এমনটা করে আসছেন বলে জানান কলিম শাহ।

বাউল হৃদয় শাহ বলেন, ‘মনের গরল যাবে যখন, সুধাময় সব দেখবি তখন—লালন শাহের মানবকল্যাণকর এ জাতীয় গানের বাণী ধারণ করে দীর্ঘদিন ধরে সাঁইজির এই তীর্থধাম আখড়ায় আসা-যাওয়া এসব বাউল সাধকদের। সাধু-গুরু যারা আছেন তারা মনে করেন, আত্মশুদ্ধি ছাড়া আত্মার দ্যুতি নেই। তাদের মতে মানবধর্মই সব কিছুর ঊর্ধ্বে। এর প্রাণ হলো প্রেম ও ভালোবাসা, তবেই সম্ভব মানবমুক্তির বাণীকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। এসব উপলব্ধি ধারণ করেই বাউলরা জড়ো হন বছরের এই স্মরণীয় দিনে।’
লালন অনুসারী বাউলরা
এ মাজারকে তাদের ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেই মানেন। লালন ভক্তরা এখানে পরম শ্রদ্ধায়
প্রার্থনা করেন। এ মাজারে একবার মাথা নোয়াতে পারলেই বাউল ধর্মাবলম্বীরা পুরো জীবনই
ধন্য মনে করেন। সাধু-ভক্তদের পাশাপাশি বাউল সম্রাটের মাজারের টানেও আসছেন পর্যটকরা।
আসছেন দেশিবিদেশি গবেষকরা। লালনের খ্যাতি এখন শুধু এই কুষ্টিয়ায় নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে
ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। লালনের চিন্তা, আদর্শ, জীবনকর্ম এবং সংগীত এখন পৃথিবীজুড়ে গবেষণার
বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কোনো এক অচিন গায়ের অচেনা মানুষ ফকির লালন এখানে বসেই জীবনভর
সন্ধান করেছেন অচিন পাখিকে।
লালন একাডেমির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সেলিম হক বলেন, ‘লালনের গানে মানবতাবোধ, অহিংস ভাব ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে দিন দিন লালনের গানের ভক্ত ও অনুসারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আমরা লালনকে নিয়ে অনেক মাতামাতি করি ঠিকই, কিন্তু তার উপযুক্ত মর্যাদা দিতে পারি নাই। আমাদের দাবি, লালনের গান কবিতা আকারে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’
বাউল সম্রাট লালন শাহের
পুণ্যভূমি কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার কালী নদীর তীরে বিশাল মাঠে এ স্মরণোৎসব উপলক্ষে বসেছে
লালনমেলা। যেখানে একতারা, দোতারা থেকে শুরু করে ঘর-গৃহস্থালির নানা জিনিস পাওয়া যাচ্ছে।
বাদ নেই মিষ্টান্ন দ্রব্যও।
মরমি সাধক লালনের জীবনকর্ম, জাতহীন মানবদর্শন ও চিন্তাচেতনার আদর্শিক বিষয়গুলো নিয়ে সোমবার (৬ মার্চ) পর্যন্ত তিন দিন চলবে আলোচনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে আলোচনা, লালনমেলা ও লালন সংগীত।