প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২২ ২১:০৩ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছায়ানটের শিল্পীদের পরিবেশনা। ছবি : প্রবা
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে ছেষট্টির ৬ দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির বহুল আকাঙ্খিত স্বাধীনতার কথা কবিরা লিখে গেছেন সহস্র পংক্তিতে। সুরস্রষ্টা তার দরদভরা কণ্ঠে সুরারোপ করেছেন সেসব শব্দে৷ কালান্তরে সেই দেশগান হয়ে উঠলো বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা, হাজারো বছরের পথ মাড়িয়ে সে গানে এখনও উদ্বেলিত হয় বাঙালি।
মহান বিজয় দিবসের গোধূলিবেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছায়ানটের ‘দেশগান’ এর আয়োজনে সহস্র কণ্ঠে ধ্বনিত হলো বাংলা নয় কবির কবিতা ও গান৷ সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মেলক নৃত্যে মুদ্রিত হয় বাঙালির মুক্তির চিরআকাঙ্ক্ষার কথা।
শুক্রবার (১৬ ডিসেম্বর) বিকেল পৌনে ৪টায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ছায়ানটের দেশগান-এর আয়োজন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ ও ‘এখন আর দেরি নয়’ গানের সঙ্গে সম্মেলক নৃত্য নিয়ে মঞ্চে আসেন ছায়ানটের শিল্পীরা৷ ততক্ষণে সমবেত তরুণদল কণ্ঠে তুলে নিয়েছে দেশগানের নানা কলি৷ যারা কথা ও সুর কিছুই জানেন না, তারাও গুণগুণ করে সুর মেলাতে চাইলেন সেসব গানে৷ হাজার বছরের সে গান যে বাঙালির হৃদয়ে আলোড়ন তুলে যায় অহর্নিশ৷
এরপর ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মেলক কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের ‘সংঘ স্মরণ তীর্থযাত্রা’ ও রণসঙ্গীত ‘চল চল চল’ গানের সঙ্গেও নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা৷
‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ জীবনানন্দ দাশের কথা এ গানে সুর করেছিলেন অজিত রায়। ‘দেশগান’ এর আসরে শিল্পী সুমন রায় গেয়ে শোনান এ গানটি৷
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ’ গানের সঙ্গে ফের সম্মেলক নৃত্য নিয়ে আসে ছায়ানের শিল্পীরা৷ তারা একে একে নৃত্য পরিবেশন করেন মো. আশাদ আলীর ‘বলো বলো বলোরে সবে’, আবদুল করিমের ‘হেঁইয়ো রে হেঁইয়ো’, আবদুল লতিফের ‘লাখো লাখো শহীদের রক্তমাখা’ গানের সঙ্গে৷
দেশগান-এর এবারের আসরে শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালের ‘ছবি’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়৷
গোবিন্দ হালদারের কথা ও আপেল মাহমুদের সুরে বিজয় মাসের গান ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি শোনান নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী।
১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বাঙালির পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের ক্ষণকে স্মরণ করে সম্মিলিত কণ্ঠে ৪টা ৩১ মিনিটে জাতীয় সঙ্গীত গাইবার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
সবাই মিলে নৃত্যশৈলীর সঙ্গে মুক্তকণ্ঠে দেশগান গাওয়ার এবং দেশকথা শোনার-বলার গোটা আয়োজনকেই প্রতীকীভাবে জাতীয় পতাকার রঙ দিয়ে সজ্জিত করার প্রয়াস ছিল এ আয়োজনে।
মিলিত কণ্ঠে দেশের গান গাইবার এই আয়োজনের নিরাপত্তা বিধানে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সাংস্কৃতিক জাগরণের সঙ্গে মানবিক বোধসঞ্চারের লক্ষ্যে ‘সকলে মিলে দেশ-গান গাইবার, দেশ-কথা বলবার’ এই মিলনানুষ্ঠান শুরু হয় ২০১৫ সালের বিজয়-দিবসে। সেই থেকে প্রতি বছর মহান বিজয় দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাঠে দেশগান গাইবার সফল আয়োজন করছে ছায়ানট।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সালে এই আয়োজনে ছেদ পড়ে। ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তির অনুষ্ঠানের জন্য বিজয় দিবসের আয়োজন উক্ত স্থানে করা সম্ভব হয়নি।
‘দেশগান’-এর আয়োজনে মহান বিজয়-দিবসের দিনে ভেদাভেদ দূরে ঠেলে জাতীয় পতাকার সবুজে দেহ ও মন রাঙিয়ে সর্বান্তকরণে ষোল আনা বাঙালি হয়ে উঠবার ব্রত নিতে সবাইকে আহ্বান জানায় ছায়ানট।