× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফকির লালন সাঁইয়ের আরশিনগর

সাইমন জাকারিয়া

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০১ এএম

ফকির লালন সাঁইয়ের আরশিনগর

ফকির লালন সাঁই— মানবতাবাদের এক অমর প্রতীক। তাঁর গানের বাণী আমাদের কাছে এমন এক চিন্তার মুক্তক্ষেত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে ধর্ম, জাত, লিঙ্গ কিংবা বর্ণের কোনো সীমারেখা নেই। আজ থেকে ১৩৫ বছর আগে তিনি দেহ রাখলেও তাঁর গান আজও আমাদের জীবনের গভীর সত্য ও মুক্তির সুর হয়ে বাজে। ইতিহাস বলে, লালনের জন্মস্থান ও ধর্মপরিচয় নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, তিনি ১৮ শতকের শেষ দিকে কুষ্টিয়ার আশেপাশে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের যুগে, যখন সমাজ বিভক্ত ছিল ধর্ম ও জাতপাতের কঠোর কাঠামোয়, তখন লালনের গান ছিল এই অমানবিক বিভেদের বিরুদ্ধে এক ধারালো প্রতিবাদ।

তাঁর গান আমাদের শেখায়, মানুষই মানুষের ধর্ম, আর শরীরই সাধনার ক্ষেত্র। লালনের এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে কেবল একজন ধর্মদার্শনিক নয়, বরং সমাজসংস্কারক ও মানবতাবাদী কবিতে পরিণত করেছে।

লালন সমাজে বহমান নানা ধর্মীয় মতের ভেতর দিয়ে এক মানবধর্মের বীজ রোপণ করেছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—মানুষের ধর্ম কী? জন্মের ধর্ম, নাকি কর্মের ধর্ম? তাঁর গানে শোনা যায় সেই অনন্ত অনুসন্ধান— ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।’

এই অনুসন্ধান কেবল আধ্যাত্মিক নয়, সামাজিকও বটে। ব্রাহ্মণ্যবাদ, ইসলামি শরিয়তবাদ কিংবা ঔপনিবেশিক আধিপত্য—সব কিছুর ঊর্ধ্বে লালন দেখতে চেয়েছেন মানবমুক্তির চূড়ান্ত অবস্থান। তাঁর গানে নারী-পুরুষের সমতা, যৌন পরিচয়ের অন্তর্নিহিত বৈচিত্র্য এবং জীবনের মৌলিক প্রয়োজনে শরীরের মূল্যায়ন গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। 

তাঁর সমাজচেতনা আজও বিস্ময় জাগায়। তিনি নারীর অধিকার ও মর্যাদাকে এমন উচ্চতায় স্থাপন করেছেন, যা তাঁর সময়ে অকল্পনীয় ছিল। তাঁর গানে নারী কেবল প্রেম বা ভক্তির প্রতীক নয়—তিনি জ্ঞান, বোধ, এবং মুক্তির সহযাত্রী।  

লালনের সমাজবোধ তাঁর বহু গানে প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে ‘উদয় কাল কলি রে ভাই, কলি আমি বলি তাই’ গানটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে তিনি ‘কলিযুগ’-এর সামাজিক বাস্তবতাকে রূপকভাবে তুলে ধরেছেন। কলিযুগে মানুষ হারিয়েছে সততা, ধর্মচেতনা, আর প্রেমের মূল্যবোধ। তিনি গেয়েছেন—  ‘উদয়কাল কলি রে ভাই, কলি আমি বলি তাই/… কলি কালে অমানুষের জোর/যত ভালো মানুষ বানায় তারা চোর/সুমঝেভাবে না চলিলে বোম্বেটের হাতে পড়বি ভাই।’  

এই গানের প্রতিটি পঙ্‌ক্তি এক প্রখর সামাজিক ভাষ্য। লালন এখানে সমকালীন সমাজের মিথ্যাচার ও কপটতার মুখোশ উন্মোচন করেছেন। তাঁর চোখে এই কলিযুগ কেবল কাল নয়—এক মানসিক অবস্থান, যেখানে মানুষ নিজেকে ভুলে গেছে।  

এই গানেই তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রকৃত ধর্ম কোনো মন্দিরে বা মসজিদে নয়, মানুষের অন্তরে— ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’ এই ‘মানুষ ভজনা’ই তাঁর সাধনার মূল কথা।  

লালনের দর্শনের মূল ভিত্তি তাঁর ‘দেহতত্ত্ব’। তাঁর বিশ্বাস, শরীরই সাধনার কেন্দ্র—এই দেহের মধ্যেই রয়েছে চেতনার জগৎ, প্রেমের সাগর, আর মুক্তির পথ। 

এই ভাবনা কোনো ধর্মবিশ্বাসের বিরোধিতা নয়, বরং মানবচেতনার মুক্তির পথে এক গভীর অনুসন্ধান। তাঁর সাধনা শরীরনির্ভর, কিন্তু লক্ষ্য আত্মিক— এ যেন জীবন ও মুক্তির মধ্যে সেতুবন্ধন।  

তাঁর গানে নারীর মর্যাদা এক বিশেষ স্থানে। লালন সেই সময়ে এমন ভাবনা প্রকাশ করেছিলেন, যখন নারীর অবস্থান ছিল সমাজের নিচুস্তরে। তিনি নারীকে দেখেছেন জ্ঞান ও প্রেমের ধারক হিসেবে। তাঁর গান— “নিলে ফাতেমার শরণ/ফতে হয় করণ/… শুনেছি মা তুমি অবিম্বধারী/বেদান্তের উপর গম্ভু তোমারি।”  

এই উচ্চারণ লালনের মানবতাবাদকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করে। তিনি কেবল সমাজের ধর্মীয় বিভাজন নয়, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকেও অতিক্রম করেছিলেন।  

লালনের এই দর্শন ও গানবিশ্বের অনুবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন মার্কিন গবেষক ড. ক্যারল স্যালোমন। প্রায় ত্রিশ বছরের শ্রমের ফল হিসেবে তাঁর অনুবাদ-সংকলন City of Mirrors: Songs of Lālan Sāi ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউ ইয়র্ক থেকে।  

এই বইটি লালনের ভাবধারাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এক নতুন দৃষ্টিতে। এতে রয়েছে মূল বাংলা গান এবং ইংরেজি অনুবাদ। সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন কিথ ই. কান্তু এবং আমি নিজে। স্যালোমনের কাজ ছিল নিবিড় গবেষণা ও জীবন্ত অভিজ্ঞতার মিশ্রণ। তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের লালনপন্থী সাধকদের ঘরে ঘরে গিয়েছেন, শুনেছেন তাঁদের মুখে গাওয়া গান, তুলেছেন নানা সংস্করণের পার্থক্য।

স্যালোমন তাঁর গবেষণায় লালনের গানের আধ্যাত্মিক অর্থ, সমাজবোধ এবং মানবচেতনার গভীর সংযোগ উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর অনুবাদ কেবল শব্দান্তর নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ।  

অনেকে লালনকে কেবল আধ্যাত্মিক বা প্রেমবাদের কবি হিসেবে দেখেন, কিন্তু তাঁর বহু গান সামাজিক ন্যায়বোধের প্রতীক। তিনি জাতপাত, ধর্মীয় ভেদাভেদ, মিথ্যা ধর্মাচার ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। তাঁর গানে তিনি প্রশ্ন তোলেন— ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে /লালন কয় জাত কিরূপ, দেখলাম না রে এই নজরে’ এই উচ্চারণে লালন মানুষের মৌলিক পরিচয় ‘মানবতা’-কে সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, যে সমাজে মানুষে মানুষে বিভাজন, সেই সমাজ প্রকৃত ধর্মচ্যুত।  তাঁর অপ্রচলিত গানের অনেকগুলোতে উঠে আসে সমাজের মানুষের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের কথা। আসলে গানের মাধ্যমে তিনি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও মানবতাহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।

লালনের গান শুধু সুরে নয়, চিন্তায়ও গভীর। তাঁর গান মানবদেহ, চেতনা, প্রেম, মৃত্যুচিন্তা ও মুক্তির এক বহমান ধারার রূপ। তাঁর দেহতত্ত্ব যেমন তত্ত্বচর্চার বিষয়, তেমনি তাঁর সমাজচেতনা আজও আমাদের জন্য দিকনির্দেশক।

লালন সাঁই শুধু একজন সাধক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক সমাজবিপ্লবী চিন্তাবিদ। তাঁর গান বাঙালির মাটি, ভাষা ও জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, তা আজও সামাজিক ন্যায়, মানবতা, ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে আমাদের পথ দেখায়। তাঁর প্রতিটি গান এক একটি আরশিনগর—যেখানে আমরা নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখি। City of Mirrors–এর মতো অনুবাদগ্রন্থ লালনের ভাবধারাকে বিশ্বমানবতার আলোয় তুলে ধরেছে, কিন্তু তাঁর গান যতদিন বাঙালি সমাজে জীবন্ত, ততদিন লালন সাঁই বেঁচে থাকবেন—মানুষের ভেতরের মানুষ হয়ে।

  • লেখক: লোকসংস্কৃতিক গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা