প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২২ ২০:৫৪ পিএম
মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব উদ্বোধনী আসরে এসে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতিজনেরা। ছবি: প্রবা
অসাম্প্রদায়িক-শোষণমুক্ত ও মানবিক দেশ গঠনের যে লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার অকুতোভয় তরুণ, তিনিই জীবন সায়াহ্নে দেখেন তার স্বপ্নের বাংলাদেশ বিভক্ত হয়েছে ধর্মের কারণে। বাংলার সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিভাজিত হয়েছে ধর্মান্ধ মৌলবাদের ধারাল ছুরিতে। তাই যতই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হোক না কেন, সেই ধর্মান্ধদের আস্ফালন পুরোপুরি বন্ধ না হওয়াকেই নিজেদের সবচেয়ে ‘বড় ব্যর্থতা’ বলে আক্ষেপ করেছেন তারা।
মঙ্গলবার (১৩ ডিসেম্বর) বিকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব উদ্বোধনী আসরে এসে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতিজনরা তাই শপথ নিলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনীতির সঙ্গে উদারনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের সংস্কৃতিকেও জুড়ে দিতে হবে। ধর্ম যেন কখনও রাজনীতির হাতিয়ার না হয়ে উঠতে পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বানও ধ্বনিত হলো সংস্কৃতিজনদের কণ্ঠে।
'স্পর্ধায় তাড়াব ধেয়ে আসা যত কালো' শিরোনামে মঙ্গলবার থেকে শুরু হলো পাঁচ দিনের এ বিজয় উৎসব। এদিন বিকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব উদ্বোধন করেন নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদার।
উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, জোটের সাবেক সভাপতি নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক,জোটের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, জোটের সহসভাপতি ঝুনা চৌধুরী, মীর বরকত, সহ-সাধারণ সম্পাদক আহাম্মেদ গিয়াস ও সাংগঠনিক সম্পাদক আজহারুল হক আজাদ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।
বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী পর্বের শুরুতে শহীদ বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অতিথিরা। পরে মহান মুক্তিযুদ্ধে সব শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক মিনিট নিরবতা পালন করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সদস্যরা।
বহ্নিশিখা সদস্যরা জাতীয় সংগীত ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন৷ দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দন নৃত্যগোষ্ঠী। জোটের অর্থ সম্পাদক আখতারুজ্জামান বিজয় উৎসবের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন৷
অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, ‘নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, তা রক্ষা করতে যাওয়া আরও কঠিন। আমাদের তাই সবসময় সততার সাথে চলতে হবে, আমাদের ভালো মানুষ হতে হবে।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে অনেক। তবে দেশটা আমাদের সেই ১৯৪৭ এর মতো ধর্মের ভিত্তিতে, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভাজিত হয়ে গেছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম এটা আমাদের জন্য বড় ব্যর্থতা। পঁচাত্তরের পনের অগাস্টের পরে বাংলাদেশের রাজনীতি এমনকি সংস্কৃতিও বিভাজিত হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ তাই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।’
তিনি বলেন, ‘এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে আমাদের সঠিক রাজনীতিটাকেই আবার সামনে নিয়ে আসতে হবে, যে রাজনীতি হয়েছে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। ক্ষমতার লড়াইয়ের যে রাজনীতি তার সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিরও মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব রাজনৈতিক শক্তিকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। কেবল তাহলেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত অসাম্প্রদায়িক ও সম অধিকারের বাংলাদেশ ফিরে পেতে পারি।’
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিটি আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে বলে সংস্কৃতিকর্মীদের সতর্ক করে নিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘বিরোধী শক্তিটি সবসময় প্রস্তুত। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের বিচার হয়েছে। তারা কী ছেড়ে কথা বলবে? আমরা সংস্কৃতিকর্মীদের আমাদের আদর্শকে সবসময় ঊর্ধ্বে তুলে ধরব।’
নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘কোভিড মহামারির পর ইউক্রেন যুদ্ধ- বিজয় দিবসের আগে নিত্যনতুন সংকটের যেন শেষ নেই। এই সংকটের সুযোগ নিয়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তিটি রাজনীতিতে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইছে। তারা ধর্মের অপব্যাখ্যায় বারবার এ দেশকে বিভাজিত করতে চায়। আর একটি বছর পর নির্বাচন। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে তারা যেন ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বা পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ না পায়।’
এবার ঢাকার যেসব মঞ্চে বিজয় উৎসব অনুষ্ঠিত হবে সেগুলো হলো- কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ, মিরপুর-৬ নং সেকশনের মুকুল ফৌজ মাঠ, দনিয়া মাসুদ মঞ্চ, ভিক্টোরিয়া পার্ক, মতিঝিল টি অ্যান্ড টি কলোনি মাঠ, উত্তরা বঙ্গবন্ধু মুক্ত মঞ্চ ও পূর্বাচলের জয় বাংলা স্কয়ার৷
গোলাম কুদ্দুছ জানান, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ, মিরপুর-৬ নং সেকশনের মুকুল ফৌজ মাঠ ও ভিক্টোরিয়া পার্ক মাঠে অনুষ্ঠান হবে প্রয়াত সংস্কৃতিজন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, নাট্যকার মান্নান হীরা ও গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীরের নামে।
বিজয় মঞ্চে কর্মসূচি শুরু হবে প্রতিদিন বিকাল ৪ টায়৷ অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে একক ও দলীয় সঙ্গীত, নাটক, নৃত্য, একক ও দলীয় আবৃত্তি, শিশু সংগঠনের পরিবেশনা ও স্মৃতিচারণ৷
এসব কর্মসূচি ছাড়াও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহযোগিতায় বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ আগামী ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন, ১৭ ডিসেম্বর বেনাপোল ও যশোর, ২৩ ডিসেম্বর ঢাকার গুলশানে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন পার্কে বিজয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে৷ এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেড় শতাধিক সংগঠনের প্রায় তিন হাজার শিল্পী অংশ নিচ্ছেন৷