রামমোহন রায় লাইব্রেরি
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১৬:১৫ পিএম
লাইব্রেরির দেয়ালে টাঙানো আছে নানা মনীষীর ছবি। প্রবা ফটো
পুরান ঢাকার অলিগলিতে চাপা পড়ে আছে জানা-অজানা ইতিহাস। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা নগরে ছড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন। সেসবের কোনোটা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আবার কোনোটি ধ্বংসের মুখে। কালের আবর্তে এখনও অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে ঢাকার প্রথম পাঠাগার ‘রামমোহন রায় লাইব্রেরি’। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর ব্রাহ্ম সমাজ ভবনের একটি কক্ষে ১৫৪ বছরের পাঠাগারটি এখনও সচল। তবে প্রাচীন এই জ্ঞানকেন্দ্রটির নেই আগের সেই জৌলুস। নেই আগের মতো বই ও পাঠক।
একসময় এই জ্ঞানকেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ১৫০-৩০০ পাঠক আসতেন। জানা যায়, ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাসের অনবদ্য সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা এই ‘রামমোহন রায় লাইব্রেরি’তে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব মনীষীর নিয়মিত পদচারণা ছিল। এখানে এসেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯২৬ সালে কবিগুরুর আগমনের ছেচল্লিশ বছর পর তার নাতি সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় এলে তিনিও গ্রন্থাগারটিতে আসেন। এ ছাড়া এখানে নিয়মিত আসতেনÑ বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত, প্রথম কুরআন শরীফের অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, জ্ঞানতাপস ও বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রেম ও প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ ও তার মা প্রখ্যাত কবি কুসুমকুমারী দাশ, কবি বুদ্ধদেব বসু, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কবি সুফিয়া কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী লীলা নাগ (বিয়ের পরে লীলা রায়), কবি শামসুর রাহমান ও সৈয়দ শামসুল হকের মতো স্বনামধন্যরা।
এই পাঠাগার সম্পর্কে কৌতুক করে জ্ঞানতাপস ও বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলতেন, ‘আমি মুসলমান হয়েছি ব্রাহ্ম সমাজের লাইব্রেরিতে এসে। কারণ, এখানে গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদ করা বাংলা কুরআন পড়ে ইসলাম বোঝার সুযোগ পেয়েছিলাম।’
ঢাকার প্রথম পাঠাগার ‘রামমোহন রায় লাইব্রেরি’র সংগ্রহশালা নিয়ে কবি শামসুর রাহমান তার জীবনীগ্রন্থ ‘কালের ধুলোয় লেখা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ব্রাহ্ম সমাজ পরিচালিত এ গ্রন্থাগার আমার সামনে খুলেছিল আলাদা এক জগৎ। বেড়ে গেল আমার পাঠস্পৃহা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার বেশি পরিচয় তো হলোই, বঙ্কিমচন্দ্র ও শরত্চন্দ্রের সঙ্গেও পরিচিত হয়ে উঠলাম।’
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানাভাবে এই পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করতে যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের মাঝে রয়েছেনÑ রতন মনি গুপ্ত, দমোদর গোবর্দ্ধন দাস, ত্রিপুরার মহারাজা, ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়, রেবতীমোহন দাস, সি আর দাস, মনোরমা মজুমদার, লর্ড কারমাইকেল, বরদার মহারাজা ও কোচিনের মহারাজা, পি. সি. সেন, কৃষ্ণগোবিদ গুপ্ত, গিরিজানাথ রায়, সুরেশচন্দ্র সিংহ, মোহিনীমোহন দাস, বর্ধমানের মহারাজা, এস. আর দাস, মিসেস কে. জি. গুপ্ত, প্রসন্ন কুমার রায়, অতুলচন্দ্র রায়, কাশিমবাজারের মহারাজা ও পি. এন. মুখার্জ্জী প্রমুখ।
জানা যায়, এই পাঠাগার থেকে একসময় ‘ব্রহ্ম কাহিনী’ নামে একটা পত্রিকাও বের করতেন কবি কুসুমকুমারী দেবী।
বর্তমানে এই পাঠাগারের তত্ত্বাবধানে থাকা রনবীর পাল রবি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একসময় গ্রন্থাগারে ৩০ হাজারেরও বেশি বাংলা ও ইংরেজি’র দুষ্প্রাপ্য সব বই ও পুঁথির সংগ্রহ ছিল। যে কারণে গ্রন্থাগারটিতে পাঠকদের আনাগোনায় মুখরিত থাকত।’
পুরান ঢাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করা ও লোকসংস্কৃতি গবেষক ইমরান উজ-জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৮৬৯ সালে ঢাকায় গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠিত পূর্ববঙ্গের ‘ব্রাহ্ম সমাজ’। এরপর ১৮৭১ সালে পাটুয়াটুলীর ব্রাহ্ম সমাজ ভবনের দোতলার একটি কক্ষে ঢাকার প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক অভয় চন্দ্র দাস।’
তিনি বলেন, ‘নাট্যজন অভয় চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এ পাঠাগারটি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দানে ও আশীর্বাদে সমৃদ্ধ হলেও বর্তমানের বই ও পাঠকশূন্য হওয়ায় অস্তিত্ব হারানোর পথে ঢাকার প্রথম এই পাঠাগারটি। একে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’