প্রদর্শনী
হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৫ ১১:৩২ এএম
আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৫ ১৭:০৬ পিএম
গ্যালারিতে প্রদর্শিত ছবি দেখছেন চিত্রশিল্পী কনক চাঁপা চাকমা। প্রবা ফটো
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, যা বাংলাদেশের মুক্তিস্পৃহার অন্যতম সোপান। এই আন্দোলনের প্রেরণা জুগিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা। তিনি শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। মহৎপ্রাণ এই শিক্ষক ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। তার আত্মদানের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে ‘দেশ গ্যালারি’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের। কেননা ওই বছরই শিল্পপ্রেমী ইউসুফ সাঈদ ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন এ গ্যালারিটি। কিন্তু ১৯৭৪ সালে এসে গ্যালারি বন্ধ হয়ে যায়। ড. শামসুজ্জোহার কন্যা সাবিনা জোহার হাত ধরে ৫১ বছর পর গতকাল শনিবার একই নামে পুনর্জন্ম নিল সেই গ্যালারি। উল্লেখ্য, দেশ গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাবিনার খালু। বর্তমান এই গ্যালারির অবস্থান রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১২ নম্বর সড়কের ১৩/১ নম্বর বাড়িতে।
স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে বাণিজ্যিক আর্ট গ্যালারি ছিল না। চিত্রকর্ম বিক্রির দোকানগুলোই আর্ট গ্যালারিতে রূপ নিয়েছিল। ষাটের দশকে আমাদের এখানে যে কয়টা উল্লেখযোগ্য গ্যালারির নাম পাওয়া যায়, সেগুলো হলোÑ ধানমন্ডির ‘আর্টস অনসেম্বল’, গুলশানের ‘সাজু আর্ট গ্যালারি’ ও শাহবাগের ‘জিরাজ গ্যালারি’।
দেশ আর্ট গ্যালারির পুনর্জন্মের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী রফিকুন নবী। বরণ্যে এই শিল্পী বলেন, একটি নতুন গ্যালারি প্রতিষ্ঠা হওয়া মানে শিল্পীদের কাজের প্রসারের সুযোগ করে দেওয়া। বিশেষ করে তরুণ শিল্পীদের চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর সুযোগ ঘটে। আমাদের তরুণরা এখন আন্তর্জাতিক মানের কাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্যালারিতে তাদের কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে। ‘দেশ’ গ্যালারি আজ নতুন রূপে প্রাণ ফিরে পেল, আমার বিশ্বাস এখানেও তাদেরকে সুযোগ দেওয়া হবে।
অন্য অতিথিরা বলেন, শিল্প সমঝদার সাবিনা জোহা খান যে কাজটি করেছেন, তা আমাদের দেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসের সেতুবন্ধন হয়ে থাকবে। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাবিনা জোহা খান বলেন, বাবা মারা যায়, আমার তিন বছর বয়সে। দেশ গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা আমার খালু। সঙ্গত কারণেই আমার শৈশবের সুন্দর মুহূর্ত কেটেছে এই গ্যালারিতে। এখানে অনেক বিখ্যাত শিল্পীর আসা-যাওয়া ছিল। তখনই তাদের কাউকে কাউকে চিনতাম। বলা যায়, আমার শৈশবের সুন্দর ও আনন্দঘন স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন করে এই গ্যালারিটি চালু করেছি। যখন গ্যালারি বন্ধ হয়ে যায়, তখন আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। সেই সময় আমার স্বপ্ন ছিল সুযোগ পেলে গ্যালারিটি চালু করব।
এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস, কনক চাঁপা চাকমা, গৌতম চক্রবর্তী, শিল্প সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদসহ দেশের অনেক স্বনামধন্য শিল্পীরা। এই গ্যালারির নবজন্ম প্রসঙ্গে শিল্পী কনক চাঁপা চাকমা বলেন, দেশে যত প্রদর্শনীর জায়গা হবে শিল্পীদের জন্য ততই আনন্দের সংবাদ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তো আরও আনন্দের খবর। মেধা বিকাশের সুযোগ ঘটবে। চিত্রকর্ম বিক্রি হলে মননশীলতাও বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ একটি পজিশনে এই গ্যালারির অবস্থান। এর সঙ্গে খুব সহজেই বিদেশিদের সংযোগ ঘটবে। বিদেশিদের ইচ্ছে থাকলেও নিরাপত্তার খাতিরে তারা বাইরে যেতে পারেন না। এখানে যত সহজে তারা আসতে পারবেন। এই এলাকায় গ্যালারি হওয়াকে আমি শিল্পযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দেখছি।
নবপ্রাণ ফিরে পাওয়া উপলক্ষে দেশ গ্যালারি আয়োজন করেছে বিশাল এক প্রদর্শনীর। দেশের ৩৮ শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে গ্যালারির দেয়াল। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীদের পাশাপাশি ঠাঁই পেয়েছে স্বশিক্ষিত শিল্পীদের কাজও। নানা মাধ্যমে করা বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে কাজ রয়েছে। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এসএম সুলতান, মুর্তজা বশীর, হামিদুজ্জামান খানের মতো বিখ্যাত শিল্পীর পাশাপাশি নবীন শিল্পীদের কাজও প্রদর্শিত হচ্ছে। শিল্প সমঝদাররা এসব চিত্রকর্ম সংগ্রহ করতে পারবেন। মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গ্যালারির দুয়ার খোলা দর্শনার্থীদের জন্য।