হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৫ ০৯:২০ এএম
এসএম সুলতান
সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপকেন্দ্রিক, নগরনির্ভর, যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিক ও বিমূর্ত কিংবা নিরীক্ষাধর্মী শিল্পচর্চা ত্যাগ করে চিত্রকলায় মানুষের জীবনের শাশ্বত বোধ ও আপন সংস্কৃতির শিকড়কে বলিষ্ঠভাবে প্রতিষ্ঠা করা এক দার্শনিক ও বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পীর নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। যিনি এসএম সুলতান নামে সমধিক পরিচিত। চিত্রকলায় তিনি স্বদেশ চেতনার দরজা খুলে তুলে এনেছেন আবহমান গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের ভেতরের শক্তি। শিল্পকর্মের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালচাল তুলে ধরা বরেণ্য এই শিল্পীর ১০১তম জন্মবার্ষিকী আজ।
স্বদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রামীণসমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভেতরে নিজের জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পাওয়া মহান এই শিল্পীর এ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন ও নড়াইল জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি হাতে নিয়েছে নানা কর্মসূচি। আজ রবিবার সকালে শিল্পীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দিনব্যাপী কর্মসূচি। এরপরে এসএম সুলতানের সংগ্রহশালায় অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র কুরআন খতম, দোয়া মাহফিল এবং আলোচনা সভাসহ অন্যান্য কর্মসূচি।
এদিকে, ভারত উপমহাদেশের অন্যতম সেরা এই চিত্রশিল্পীর এ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দুই বছরব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদযাপন কমিটি। গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীর ধানমন্ডির ২৭-এর বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে ‘আমরা পরাজিত হলে এসএম সুলতানের স্বপ্ন আড়ালেই থেকে যাবে’ স্লোগানে এই দুই বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালা।
আয়োজনের শুরুর দিনে ‘শিল্পী সুলতানের উত্তরাধিকার : কল্পনা, সৌন্দর্য ও সহজ মানুষের উত্থানের রাজনীতি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ ড. শাহমান মৈশান। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বক্তব্য রাখেন আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব ক্যামেরার কবি নাসির আলী মামুন।
শিল্পী এসএম সুলতান ১৯২৩ সালের এই দিনে (১০ আগস্ট) নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক-পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শেখ মোহাম্মদ মেসের আলী, মায়ের নাম মেহেরুননেসা (মাজু বিবি)। চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া। লাল মিয়ার মাঝে শৈশবেই চিত্রাঙ্কনের প্রতিভা দেখা যায়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালে লাল মিয়া নড়াইলের তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের দৃষ্টিতে পড়েন। তিনি সুলতানকে কলকাতায় নিয়ে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও শিল্প-সমালোচক কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যাপক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একাডেমিক যোগ্যতা বিচার না করেই ১৯৪১ সালে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অষ্টম শ্রেণি পাস সুলতানকে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি করা হয়। ১৯৪৪ সালে কলেজের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করে চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হন সুলতান। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেননি তিনি। ছাত্রাবস্থায় তিনি কলেজ ছেড়ে কাশ্মিরের পাহাড়ি অঞ্চলে উপজাতিদের সঙ্গে বসবাস ও তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে চিত্রাঙ্কন শুরু করেন। পরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফরে বেরিয়ে পড়েন।
১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবি সমকালীন বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পল ক্লী, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। সুলতানই প্রথম এশিয়ান শিল্পী, যার ছবি এসব বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছে। এ ছাড়াও শিল্পী সুলতানের ছবি ভারতের সিমলা, পাকিস্তানের লাহোর, করাচি, নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন এবং জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়।
১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে শিল্পী মাটির টানে দেশে ফিরে আসেন। তিনি নিজস্ব উদ্যোগে জন্মস্থান নড়াইলের মাসিমদিয়ায় ফাইন আর্ট স্কুল ও ‘শিশুস্বর্গ’ নামে শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শিশু-কিশোরপ্রেমী সুলতান ১৯৮০ সালে নিজ বাড়িতে শুরু করেন শিশুস্বর্গের নির্মাণকাজ। এ ছাড়া তিনি ১৯৯২ সালে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থের ‘ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ’ নামে দ্বিতল নৌকা নির্মাণ করেছিলেন। এ নৌকায় তিনি শিশুদের নিয়ে চিত্রা নদীতে ভ্রমণ করতেন এবং নৌকায় বসেই তাদের চিত্রাঙ্কন শেখাতেন। সুলতানের শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু ছিলÑ বাংলার কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, মাঠ, নদী, হাওর, বাঁওড়, জঙ্গল, সবুজ প্রান্তর ইত্যাদি। এসব বিষয়ে শিল্পী তার ৭০ বছরের জীবনে তুলির আঁচড়ে দেশ তথা আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার অনন্ত সংগ্রাম, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতি মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেছেনÑ পাটকাটা, ধানকাটা, ধান ঝাড়া, জলকে চলা, চর দখল, গ্রামের খাল, গ্রামের দুপুর, নদী পারাপার, ধান মাড়াই, জমি কর্ষণে যাত্রা, মাছধরা, নদীর ঘাটে, ধান ভানা, গুন টানা, ফসল কাটার ক্ষণে, শরতের গ্রামীণ জীবন, শাপলা তোলা’র মতো বিখ্যাত সব ছবি। এসব ছবি থেকে কিছু ছবি নিয়ে ১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রদশর্নীর মাধ্যমে এদেশের সুশীল সমাজের সঙ্গে তার নতুনভাবে পরিচয় ঘটে।
শিল্পকর্মে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমাকে এবং কৃষককে সেই সভ্যতার রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা এই শিল্পীর চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি একজন সুর সাধক এবং বাঁশি বাজানোতেও খ্যাতি ছিল। তার হাতে প্রায়ই বাঁশি দেখা যেত। পুষতেন সাপ, ভল্লুক, বানর, খরগোশ, মদনটাক, ময়না, গিনিপিগ, মুনিয়া, ষাঁড়সহ বিভিন্ন পশুপাখি। তিনি বাড়িতে একটি মিনি চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আপাদমস্তক প্রাণ ও প্রকৃতিপ্রেমী এই চিত্রশিল্পী চিত্রশিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮২ সালে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ ও এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ এবং ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ খেতাব লাভ করেন। আর, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সরকার কালোত্তীর্ণ এই চিত্রশিল্পীকে ‘একুশে পদক’, ১৯৯৩ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’-এ ভূষিত করেন। এ ছাড়া তিনি ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্স আর্টিস্ট হিসেবে এবং ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা লাভ করেন।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর চিরকুমার এই শিল্পী দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগার পর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জন্মভূমি নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম এলাকার নিজ বাড়ির আঙিনায় তাকে সমাহিত করা হয়। সুলতানের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য তার নিজ বাড়িতে নির্মিত হয়েছে এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা।