হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৫ ১০:৩৯ এএম
সুর, তাল, লয় ও ছন্দের সমন্বয়ে গঠিত অনন্য এক শিল্পকলা সংগীত। সংগীতের নিজস্বতা আর স্বকীয়তা এতই প্রবল যে কাঁটাতারের বেড়া ও ভাষার ভেদাভেদ মানে না। রাগ-রাগিণীর খেলা, তাল-লয়-ছন্দের রসে স্নাত হওয়ার জন্য ভাষা কখনও বাধার দেয়াল হতে পারে না সেটিই বুঝিয়ে দেয় সংগীত। ভাষা না বুঝলেও বিশ্বের যেকোনো সুর শ্রোতার হৃদয়ে আলোড়ন তোলে, ভালোলাগা ও ভালোবাসার সৃষ্টি করে। গতকাল শনিবার ছিল কোনো সীমারেখা না মেনে জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই অনবদ্য শিল্পমাধ্যমের জন্য অনন্য দিন; বিশ্ব সংগীত দিবস। গান, কথামালায় দিনটি বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয়েছে।
সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সংগীতের সুরে বিশ্বব্যাপী শান্তি ও ইতিবাচক চিন্তা ও দর্শনকে ছড়িয়ে দিয়ে সবার সঙ্গে মেলবন্ধন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দিবসটি পালিত হয়েছে। বিশ্ব সংগীত দিবসের সূচনা হয়েছিল ফ্রান্সে। সেখানে এ উৎসবের নাম দেওয়া হয় ‘ফেট ডে লা মিউজিক’। যার অর্থ ‘বিশ্বজুড়ে সংগীতের দিন’। ১৯৮২ সালে বিশেষ এই সংগীত উৎসবের দিনটি পরবর্তীতে ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
দেশে দিবসটি উদযাপনে পৃথক পৃথক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সৃষ্টি বিশ্বময়। এর মধ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের আয়োজনে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালায় আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠান ‘সুরের সম্মিলন’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় জাতীয় নাট্যশালার সম্মুখে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের পরিচালক মেহজাবীন রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য সংগীতশিল্পীরা।
অতিথিদের বক্তব্যের পর বেলুন উড়িয়ে বিশ্ব সংগীত দিবসের উদ্বোধন করেন শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন। এরপর একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। অনুষ্ঠানের সভাপতি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংগীতশিল্পীরা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন বলেন, ‘আজ হচ্ছে উৎসবের দিন। যারা সংগীত চর্চায় মনোনিবেশ করেছেন, যাদের জীবন অতিবাহিত করেছেন বা করছেন আজ তাদের উৎসবের দিন। বিশ্ব সংগীত দিবসের একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সূতিকাগার হচ্ছে ফ্রান্স। সেখানে এই দিবসের সূচনা হয়েছিল। আমাদের অস্থিরতা ও সুস্থতার জন্য সংগীত কতটুকু নিরাময় ভূমিকা পালন করেÑ এই বৈশ্বিক দিবস পালনের মাধ্যমে সেটি আমরা বুঝতে পারি। যারা সংগীত এবং ফুলকে ভালোবাসেন তারা কখনও অন্যায় করতে পারেন না। আমাদের ভেতরের যে তাড়না, কালো অধ্যায় ও কলুষিত রূপ শুধু সংগীতের মাধ্যমে আমরা মুছে দিতে পারি।’
জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে মূল আয়োজনে শুরুতেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যন্ত্রশিল্পীরা ‘অর্কেস্ট্রা’ এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কণ্ঠশিল্পীরা ‘কোলাজ’ সংগীত পরিবেশন করেন। আদিবাসী গান পরিবেশন করেন ব্যান্ডদল ‘চিম্বুক’ ও ‘বম শিল্পীগোষ্ঠী’। এরপর জনপ্রিয় তারকা শিল্পীরা পরপর কয়েকটি সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। সবশেষে জনপ্রিয় ব্যান্ড শিল্পীরা ‘কোলাজ’ সংগীত পরিবেশন করেন।
এদিকে সুরের ছোঁয়ায় শান্তি ও সুস্থতা এই স্লোগানকে সামনে রেখে এবং সংগীতকে বিশ্বের সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে বিশ্বের সংগীতপ্রিয় মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সৃষ্টি বিশ্বময়’ উদযাপন করেছে বিশ্ব সংগীত দিবস। সংগীতের নানান ধারা উপস্থাপন মাধ্যমে গতকাল শনিবার বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংগঠনটি।
মানুষের স্নিগ্ধ-শান্ত অনুভূতিগুলো প্রকাশ হোকÑ এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খায়রুল আলম সবুজ বলেন, ‘একমাত্র সংগীতই পারে যুদ্ধবিধ্বস্ত হানাহানিমুক্ত সাম্য ও শান্তির পৃথিবী গড়তে।’
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক সাংবাদিক বাসুদেব ধর ও সদস্য সচিব অলক দাশগুপ্ত। বক্তারা প্রতিবছরের মতো আগামীতেও এই দিবসটি পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে চর্যাপদ থেকে পদ, আবৃত্তি এবং জনপ্রিয় ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণে একটি কম্পোজিশন ‘সুরের ছোঁয়ায় শান্তি’ উপস্থাপনা করে শিল্পীরা। অংশ নেন লাইসা বিনতে কামাল, রত্ন দত্ত, সন্দীপা বিশ্বাস, রাইসা, অনন্যা, বর্ষা, পূজা, নওশীন জাফরিন, নাজিয়া আলম মমতা, আফিয়া তাইয়েবা, সানজিদা রহমান মুন, সাদিকা রহমান মেধা। এরপর নৃত্য উপস্থাপন করে শিল্পী অংকিতা অথৈ। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন বহ্নিশিখা, ভিন্নধারা, সপ্তকলি, আনন্দন।
আবৃত্তি উপস্থাপন করেন ফয়সাল আহমেদ ও মাহফুজা আক্তার মীরা। একক সংগীত পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী বর্ষা রাহা, রজত শুভ্র বিশ্বাস, সন্দিপা বিশ্বাস, মনি গোমেজ, শান্তা সরকার, সানোয়ারা জাহান নিতু, মার্টিনা এম সংমা তৃষ্ণা, আবিদা রহমান সেতু ও জাকারিয়া সুমন প্রমুখ। ছিল ব্যান্ডদল ‘ব্রেখলেস’-এর পরিবেশনা। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন রূপমঞ্জরি আর্যা ও শান্তনু তালুকদার। সব শেষে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।