× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের সম্মিলন

হাসনাত মোবারক

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৪৮ এএম

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৩৫ এএম

সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে লোকজ উৎসবে শখের হাঁড়ি দেখছেন এক দর্শনার্থী। রবিবার তোলা। প্রবা ফটো

সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে লোকজ উৎসবে শখের হাঁড়ি দেখছেন এক দর্শনার্থী। রবিবার তোলা। প্রবা ফটো

ইতিহাসের প্রাচীন নগরী সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর। কারণ গত শনিবার শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্মৃতিধন্য এ প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী লোকজ উৎসব। দেশের নানা প্রান্ত থেকে নিজেদের সৃষ্টিপণ্য নিয়ে এখানে জড়ো হয়েছেন স্বনামখ্যাত লোক ও কারুশিল্পীরা। নকশিকাঁথা, জামদানি, শীতলপাটি, শখের হাঁড়ি, টেপাপুতুল, বাঁশজাত পণ্য, কাঠের তৈরি খেলনা, তামা-কাসা ও পিতলজাত শিল্পসহ নানান পণ্যের সমাহার এখানে। 

শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের সামনে গিয়ে থমকে যেতে হয়। ছনের ছাউনিঘর; তিন পাশে উন্মুক্ত। এক পাশে বাঁশের বেড়া। বেড়ার গায়ে ঝোলানো কুলা, চালুন, খলই, মাথাল, লাঙলসহ কৃষির নানান উপকরণ। গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার নিদর্শন নিয়ে ঘরটি সাজানো। আর জাদুঘরে রাখা পুরাকীর্তি দেখে মনে হলো যেন পুরো বাংলাদেশ তুলে ধরা হয়েছে।

মাসব্যাপী লোকজ উৎসবের মূল আয়োজন চত্বরের গাছগুলোয় শোভা পাচ্ছে খনার বচনসংবলিত ফেস্টুন। অনুষ্ঠানে মূল মঞ্চে পৌঁছানোর আগে চোখে পড়বে লোকজীবন প্রদর্শনী। এখানে আবহমান বাংলার গ্রাম্যসালিশ, দাদি-নাতির গল্প বলা, ঢেঁকিতে ধানভানা, নকশি পিঠা তৈরি, পালকিতে বর-কনে, কনে দেখা, বরযাত্রা, গায়ে হলুদ, পণ্ডিত মশাইয়ের পাঠশালা, জামাইকে পিঠা খাওয়ানোসহ ইত্যাদির জীবন্ত প্রদর্শনী। এ আয়োজন ঘিরে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল দেখার মতো। বাংলার লৌকিক আচার এবং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিই তুলে ধরা ছিল এ প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য। আয়োজনে অংশ নিয়েছে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া ছিল লোকক্রীড়া। 

মূল মঞ্চের পূর্ব পাশে প্রদর্শিত হচ্ছে লোকজীবনের আলোকচিত্র। অর্ধশতাধিক ছবি এখানে স্থান পেয়েছে। যে ছবিগুলোয় দেখা যায় বাংলার লোক ও কারুশিল্পীদের কাজের দৃশ্য। এসবের মাঝে পাশ দিয়ে ছোট্ট একটি মেয়ে তার মায়ের সঙ্গে একতারা বাজাতে বাজাতে হেঁটে যাচ্ছিল। মেয়েটির নাম পড়শি, বয়স ছয় বছর। ওকে একতারাতে সুর তুলতে বললে লাজুক হাসি দিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের অভয় পেয়ে ওর ছোট্ট আঙুল দিয়ে টোকা মারল একতারায়। এই শিশুটির মতো হাজারও শিশু-কিশোর অভিভাবকদের সঙ্গে এসেছে মেলায়। পরিচিত হচ্ছে চিরায়ত বাংলার কৃষ্টির সঙ্গে। 

এর মধ্যে চত্বরের সবুজ পাতার ফাঁক গলে ভেসে এলো ‘তোমার বাড়ির রঙ্গের মেলায়/দেখেছিলাম বায়স্কোপ/ বায়স্কোপের নেশায় আমায় ছাড়ে না…’ গানের সুর। গ্রামীণমেলা মানে বায়োস্কোপওয়ালা। বিশেষ এক পোশাক পরে মানুষকে বিনোদন দেন তিনি। এখানেও দেখা মিলল এমন এক বায়োস্কোপওয়ালার। নাম তার জলিল মণ্ডল।

রাজশাহী থেকে এসেছেন। ছোট শিশুর ভিড় তাকে ঘিরে। গানের তালে তিনি তার খঞ্জনিটি বাজিয়ে চলছেন। কদাচিৎ দুয়েকজন দেখছে তার বায়োস্কোপ। জলিল মণ্ডল খেদ প্রকাশ করলেন। তিনিই শেষ প্রজন্ম। তারপর আর কেউ এই পেশায় আসবেন না। মাসব্যাপী এই মেলায় যা রোজগার হয়, তা দিয়ে তার বছরের সংসার খরচ চলে না। তিনি পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। অন্য কোনো কাজে তার মনও বসে না। 

কর্মরত কামার, কুমার, জেলে, তাঁতিরা এই লোকমেলার প্রাণ। কিন্তু দেখা গেল, এবার কুমার আছেনÑ তার চাক নেই। আবার কামারও অনুপস্থিত। স্থানীয়রা জানিয়েছে, প্রায় চার দশক ধরে অনুষ্ঠিত এই মেলাতে একসময় মুড়ি ভাজাও হতো। ঢেঁকি ছিল, জাঁতা ছিল, মসলা বাটার পাটা ছিল। বাঙালির পাত থেকে সেই কবেই তো হারিয়ে যেত তিলবাটা। এবারের লোকজ মেলায় তা চোখে পড়ল না। যদিও এই চত্বর ঘিরে আটপৌরে বাঙালির একটি দুর্নিবার টান থাকে। সেই আকর্ষণে অনেক পেশাজীবীর সঙ্গে দর্শনার্থীরাও ছুটে এসেছে মাসব্যাপী এ আয়োজনে। 

জেরিন বম পাহাড় থেকে এসেছেন শাল, মাফলার, কাঁথা, বাঁশের মগসহ নানান পণ্যের পসরা নিয়ে। আছে ঢাকাইয়া সরাচিত্র। সুশান্ত কুমার পাল এসেছেন রাজশাহীর শখের হাঁড়ি নিয়ে। তার স্টলে ভিড় বেশি। অন্যান্য বছর তার স্টলে চাকও রাখার ব্যবস্থা ছিল। চাক ঘোরা দেখতেও অনেকে ভিড় করত। রাজশাহী থেকে টেপাপুতুল নিয়ে এসেছেন বিজলী রানী পাল।

পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তিনি এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন। কাঠের ঘোড়া, হাতি, খেলনা ঢেঁকিসহ নানান জিনিস রয়েছে আরেকটি দোকানে। অনেক স্টলের নামসংবলিত ব্যানার এখনও টানানো হয়নি। স্থানীয় লোকশিল্পী আবুল হোসেনের দোকানে একতারা, ডুগডুগি, হুঁকা, মাথাল, ঢোল, ঝুমঝুমি, বাঁশিসহ কত প্রকারের বাদ্যযন্ত্র যে রয়েছে! অবিনাশ এসেছেন ঠাকুরগাঁও থেকে।

বাঁশের তৈরি নানান লোকজ পণ্য নিয়ে। নকশিকাঁথায় সেলাই ফুঁড়ছেন হোসনে আরা ও তার মেয়ে। তাদের স্টলে শোভা পাচ্ছে অসংখ্য ‘জমিনে তোলা কাঁথা’। তার স্টলের দুটি কাঁথা বিশেষ গুরত্ব পাচ্ছে। কেননা ওই কাঁথা দুটিতে এই সূচিশিল্পী তুলে ধরেছেন শিল্পাচার্যের প্রতিকৃতি। 

জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত শাহ আলম মিয়া ও তার ছেলে। তাদের স্টলের এক পাশে জামদানি বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। চত্বরে দেখা মিলল কাঁসা-পিতল ও তামাজাত শিল্পের স্টল। কুমিল্লার খাদি শিল্প, রংপুরের শতরঞ্জি, সিলেটের শীতলপাটি, মণিপুরি তাঁতশিল্পসহ আরও কত কিছু! 

লোকশিল্পীদের প্রাণের কথা শোনা গেল স্থানীয় সংগঠক ও লেখক শাহেদ কায়েসের বয়ানে। তিনি দাবি জানালেন, মেলায় ৬৩জন কর্মরত কারুশিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলা থেকে অন্তত দুজন করে হলেও এখানে ১২৮ শিল্পীর কাজ প্রদর্শন করা যেত। 

তিনি বলেন, ‘মেলার উদ্দেশ্য তো লোকশিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখা। তাই তাদের প্রণোদনা দেওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামী বছর শিল্পীদের সংখ্যা বাড়ানো হবে।’

লোকজ মেলার নিয়মিত আয়োজন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগান পরিবেশন। এখানে শিল্পীদের আলকাপ, গম্ভীরা, ধামাইল, লালনগীতি, পল্লীগীতি, ধুয়া গানসহ অন্যান্য গান মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয়। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা