× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

কৃষি এগিয়ে রাখবে বরেন্দ্রকে

সোহেল রানা

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১১:৩৬ এএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১২:০৭ পিএম

সোহেল রানা

সোহেল রানা

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। দেশ স্বাধীনের পর দীর্ঘ ৫২ বছরের যাত্রায় এ খাতে সাফল্য কম নয়। স্বাধীনতার পর খাদ্যোৎপাদন ও শস্যনিবিড়তা আগের চেয়ে বেড়েছে। ফসলেও এসেছে কিছুটা বহুমুখিতা। উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র এখনও দেশের প্রধানতম কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী এলাকা। এ অঞ্চল দানাশস্য, ফল, সবজি, মসলা, ডাল, তেলবীজসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জনসংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে অথচ জমির পরিমাণ প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। এ বাড়তি জনসংখ্যার মুখে খাদ্য দিতে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার ছাড়া উপায় নেই। এজন্য পতিত, অনাবাদিসহ নদীর চরগুলোও চাষের আওতায় আনতে হবে।

প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও এখনও অনেকটাই সেকেলে বরেন্দ্রর কৃষিব্যবস্থা। ছবি : মো. ফখরুল ইসলাম

বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় নিচে নেমে যাওয়া। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের প্রয়োজনীয় পরিমাণ রিচার্জ হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমা এবং তাপমাত্রা বাড়ায় বরেন্দ্রের কোনো কোনো এলাকায় খরার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিক কৃষিকাজ কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এজন্য বরেন্দ্র এলাকায় কম পানি গ্রহণ করে এমন সব ফসলের জাত প্রবর্তন এবং সেচসাশ্রয়ী প্রযুক্তিগুলো কৃষকের মাঝে জনপ্রিয় করতে উদ্যোগ নিতে হবে। অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট অসংখ্য খাস মজাপুকুর, খাল ও বিল পুনঃখননের মাধ্যমে জলাধার সৃষ্টি করা প্রয়োজন এবং কমিউনিটি বেইজড ইরিগেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে কৃষিতে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে খুব দ্রুতদক্ষেনেওয়া উচিত। কৃষিকাজে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে খরচ কমাতে কৃষি খামারে আলাদা বৈদ্যুতিক মিটার দিতে হবে। এ এলাকার জমিগুলোয় জৈব উপাদান কমে গেছে। যেখানে মাটিতে ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা, সেখানে আছে মাত্র ১ শতাংশ। টেকসই কৃষি নিশ্চিতে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

শস্যভাণ্ডার খ্যাত বরেন্দ্র অঞ্চলে বর্তমানে প্রচুর ফলবাগান তৈরি হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ইতোমধ্যে বিদেশে রপ্তানি করা আম, পেয়ারার বড় অংশ এ অঞ্চল থেকে যাচ্ছে। রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষককে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে এর বিস্তার ঘটানো সম্ভব। ফল, সবজি ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানির যে সম্ভাবনা রয়েছে তা কাজে লাগাতে রাজশাহী বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি অত্যাধুনিক ল্যাব, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ প্যাকিং হাউস নির্মাণ করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে এবং রপ্তানির পরিমাণ ক্রমে বাড়ছে। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। সে ক্ষেত্রে বরেন্দ্র অঞ্চলের সুযোগ আছে বড় ভূমিকা রাখার। আমরা এখনও সম্ভাবনার ১ শতাংশও কাজে লাগাতে পারিনি। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানির বাজার বিশাল। এ ক্ষেত্রে আগ্রহী শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ঋণসুবিধা দিয়ে কাজে লাগাতে কবে। প্রয়োজন হবে এ অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক আলাদা ইপিজেড ও ইকোনমিক জোন স্থাপনের। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শাকসবজি বর্তমানে এগিয়ে রয়েছে। তবে ফলমূলও রপ্তানির ক্ষেত্রে আগামী দিনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনার পাশাপাশি অনেক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এসব সমস্য চিহ্নিত হয়েছে, এখন দ্রুত সমাধান করা জরুরি।

প্রাথমিক উৎপাদন পর্যায় থেকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে কখনওই খাদ্য নিরাপদ করা সম্ভব নয়। তাই কৃষি খাতে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। ফল ও সবজির রপ্তানি বাড়াতে হলে কৃষককে উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করে নিরাপ সবজি উৎপাদন করতে হবে। এতে কৃষক যেমন লাভবান হবে, তেমন দেশের মানুষ থাকবে রোগমুক্ত, পরিবেশ থাকবে নিরাপ এবং অর্জিত হবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

এ অঞ্চলে শস্য উৎপাদন বাড়লেও আধুনিক মজুদসক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। আবার যা আছে তা-ও চলছে সনাতন পদ্ধতিতে। ফলে খাদ্য সংরক্ষণ যেমন করা সম্ভব হচ্ছে না, তেমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপচয়ও হচ্ছে। কাজেই জাতীয়ভাবে আধুনিক ও মানসম্মত আরও বেশিসংখ্যক গুদাম তৈরি করতে হবে। কৃষক অনেক ক্ষেত্রে উপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য আরও পানি কম ব্যবহার হয় এমন শস্য বিন্যাস উদ্ভাবন করতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে আলাদা ফল উৎপাদন প্রকল্প এবং আলাদা ফ্রুট জোনিং সিস্টেমের আওতায় এনে উন্নত চাষাবা কৌশলের জন্য গবেষণা করতে হবে।

অনেক সময় কৃষক পণ্য বিক্রি করে উৎপাদন খরচও ওঠাতে পারে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, লবণাক্ততা, শৈত্যপ্রবাহ, পোকামাকড়ের আক্রমণে মাঝেমধ্যেই ফলন বিপর্যয় দেখা দেয়। দুর্যোগে কৃষক পরিবারগুলো আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। কৃষকের এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার কৃষি ও কৃষক পুনর্বাসনে নানা কার্যক্রম হাতে নিলেও তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যাপকভাবে শস্যবীমা বা কৃষিবীমা চালু করা। কৃষক বীমার মাধ্যমে সহায়তা লাভ করলে তারা আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে, যার মাধ্যমে দেশও উপকৃত হবে। এটি আমাদের কৃষি খাত টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি খাতের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট স্মার্ট’ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হয়ে উঠেছে শিক্ষা এবং আধুনিক কৃষি ক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনার অংশ। এরই মধ্যে কৃষিতেও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি, ন্যানো টেকনোলজি ব্যবহার শুরু হয়েছে। কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষি খাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে।

কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। এর ফলে কৃষিকাজে ব্যবহৃত উপকরণ, সময়, শ্রম ও অর্থের সাশ্রয় হয় সেই সঙ্গে ফসল আবাদের দক্ষতা, নিবিড়তা, উৎপাদনশীলতা ও শস্যের গুণগতমান বৃদ্ধি পায় এবং কৃষিকাজ লাভজনক ও কর্মসংস্থানমুখী হয়। এ ছাড়া প্রতিকূল পরিবেশে যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। উন্নত দেশগুলো স্বল্পসংখ্যক লোক নিয়োজন করেও কৃষির টেকসই রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। কৃষি খাত দেশগুলোর অর্থনীতিতে রাখছে বড় অবদান। নিজেদের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রপ্তানিও করছে। এটা সম্ভব হয়েছে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সব ধাপে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা, মজুদসক্ষমতা বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন, উন্নত বাজার, বিপণন ব্যবস্থাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ্যাভিমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারতও অব্যাহতভাবে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। এদিকে আমাদেরও কাজ করতে হবে। সরকার যথার্থভাবেই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছে। এটা ইতিবাচক। এর মানে কেবল যন্ত্র ব্যবহার নয়, এর সঙ্গে অনেক কিছু যুক্ত। যন্ত্র বিকল হলে তা মেরামতে সার্ভিসিং সেন্টার গড়ে তোলা, খুচরা যন্ত্রাংশের শিল্প, রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্রও গড়ে তুলতে হবে।

  • জাতীয় যুব পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা