প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩
নবনীতা তপু
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১০:৫৮ এএম
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১২:০৬ পিএম
নবনীতা তপু
যশোরাদ্য দেশ, গঙ্গা নদীর পলল অবক্ষেপণে সৃষ্ট বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ। ‘দিগ্বিজয় প্রকাশ’ গ্রন্থে এ অঞ্চলকে ‘কাননাবৃত্ত’ বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়েছে। যশোরের ভূমিতে, মাঠে-প্রান্তরে, প্রতিটি ইট-কাঠ-পাথরের খোঁজে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের উপকরণ, মানুষের কর্মে, যাপনে, শিল্প-সংস্কৃতিতে বিনি সুতোর বাঁধনে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্যের ইতিবৃত্ত, গর্বিত উত্তরাধিকার। ডব্লিউ বি হান্টারের ‘অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল’ (১৮৬৮) গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশে যেসব এলাকায় প্রথম লোকবসতি শুরু হয়েছিল যশোর তার মধ্যে প্রাচীনতম। এখানকার কৃষি ও কুটিরশিল্পের যশ জগৎজোড়া। যশোরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা ভাবতে গেলে এই ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে পথ হাঁটা সম্ভবপর নয় একেবারেই।
যশোরের নকশিকাঁথা শিল্প, যার প্রায় শতভাগ সূচিল্পীই নারী। ছবি : মো. ফখরুল ইসলাম
যশোরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ঘিরে ভবিষ্যৎ রূপকল্প তৈরি
করতে গেলে সামনে আসে চিরুনি শিল্প, খেজুরের গুড়, ফুল, রেণুপোনা, হালকা
প্রকৌশল শিল্প,
সবজি, তাঁত শিল্পসহ বহুবিধ কুটিরশিল্পের
সম্ভাবনার কথা। কিন্তু পরিতাপের কথা এই যে, মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে প্রথম
স্বাধীনতা অর্জনকারী এ জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের কাছে যে
গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল তার কিয়দংশও পাওয়া যায়নি। বিপর্যস্ত হয়েছে প্রত্যাশা ও
প্রাপ্তির মধ্যে তাল মেলাবার সকল প্রাণান্তকর চেষ্টা। ফলত আত্মাভিমানী যশোরের
মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। নিজেদের উদ্যোগে
ফুলচাষ, সবজিচাষ, রেণুপোনা উৎপাদন,
নকশি সেলাইসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কাজে এগিয়ে এসেছে।
ব্যক্তি উদ্যোগের এ আন্তরিক প্রচেষ্টাগুলোর মধ্য দিয়ে তাদের সৃজনশীলতা যেমন বেড়েছে, উদ্যোগগুলো
খ্যাতি পেয়েছে;
তেমনি উদ্যোগগুলোর মধ্য দিয়ে এলাকার অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর
দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে। সূচিশিল্প যশোরের অর্থনীতিকে এক সুদৃঢ়
ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে। সুচের
ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনে বুনে যশোরের অধিবাসীরা নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে
বিশ্বসভায়।
আমাদের জাতিগত, ঐতিহ্যগত ও ভৌগোলিক অবস্থানগত
যে সীমারেখা, সেখানে বহুযুগ আগে থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল ‘নকশিকাঁথা’ নামে একটি নিজস্ব
কারুশৈলী। গ্রামীণ জীবনযাপনের পটভূমিকায় আপন ইতিহাস ঐতিহ্যের মিশেল ঘটিয়ে
দৃষ্টিনন্দন এ সূচিকর্মের আবিষ্কর্তা এ অঞ্চলের গ্রামীণ নারীরা। শুধু নিজের
ব্যবহৃত তাঁতের নরম শাড়িই নয়, কাঁথা তৈরির জন্য ব্যবহৃত সুতাটিও তারা সংগ্রহ করতেন
পুরোনো শাড়ির পাড় থেকে। এহেন নকশিকাঁথার চিত্র বিন্যাসেও বিশেষজ্ঞরা বিশেষ
পরিকল্পনা লক্ষ্য করেছেন। তাদের মতে, প্রতিটি কাঁথার কেন্দ্রমণ্ডল
থাকে অন্তঃপুরের শিল্প আল্পনার চিত্ররীতির দ্বারা প্রভাবিত। আর বিস্তৃত জমিনে
ছড়ানো থাকে শিল্পীর মনমতো সূর্য, চন্দ্র, তারা, মানুষ, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পাখি, নৌকা, মাছ, পালকি, রথ, ফল-ফুল, পাতা, আয়না, চিরুনি, চক্র, ত্রিভুজ
ইত্যাদি চিত্রকল্পের বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস। নকশিকাঁথার এ আয়োজন থেকেই সৃজনশীলতার
নজির স্বরূপ গ্রামীণ নারীরা কালের ধারায় প্রস্তুত করেছেন নকশি আসন, জায়নামাজ, দস্তরখানা, বর-কনের
আসন, বালিশের আবরণী,
আয়না-চিরুনি/পান-সুপারি রাখার জন্য আরশীলতা বা বটুয়াসহ
অসংখ্য নিত্যনতুন সৃষ্টিশীল পণ্যসামগ্রী। যে ধারাবাহিকতা উত্তরাধিকার সূত্রে আজও বহমান।
যশোরের সূচিশিল্প আজ যশোরের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলা
যায়, এ অঞ্চলের প্রতিজন নারীই উত্তরাধিকারগতভাবে সূচিশিল্পের সক্ষমতা নিয়েই
জন্মগ্রহণ করেছে। তবে যশোরের সূচিশিল্পের এ সম্ভাবনাকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার ভাবনা
শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে। সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনীতির চাকাকে
সচল করতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হাতে হাত রেখে দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে স্থানীয় সূচিশিল্পীদের
দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নকশিকাঁথা বানানোর কাজ শুরু করে একটি বেসরকারি সংস্থা।
এরপর স্থানীয় অনেক উদ্যোক্তা এই স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হন।
এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বর্তমানে
যশোর জেলায় শুধু নকশিকাঁথা শিল্পের প্রায় পাঁচশ উদ্যোক্তা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে
যুক্ত। এসব উদ্যোক্তার অধীনে রয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার সূচিশিল্পী, যাদের
প্রায় সবাই নারী। এসএমই ফাউন্ডেশনের এ তালিকাকে যুক্তিযুক্ত হিসেবে ধরা গেলেও তা
যে পূর্ণাঙ্গ নয় সে বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কারণ ফাউন্ডেশনের অন্তর্ভুক্ত
উদ্যোক্তারা এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, যশোরের সূচিশিল্পীদের সংখ্যা, উৎপাদিত
পণ্যের পরিমাণ এবং বিপণন আয় কোনোটার নির্ভরযোগ্য
কোনো পরিসংখ্যান নেই। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে
যশোরে অন্তত ১০ হাজার নকশি শিল্পের উদ্যোক্তা রয়েছেন বলে
উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের প্রায় ১০০ ভাগই নারী। প্রতিবেদনের তথ্য মতে,
প্রতিবছর যশোরে কমপক্ষে পাঁচ লাখ পিস
নকশিকাঁথা উৎপাদন হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এ খাতে প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে প্রায় তিন লাখ মানুষ জড়িত বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ
করা হয়। যশোরের নকশিকাঁথা সমিতির একটি ছোট্ট পরিসংখ্যানে দৃষ্টিপাত করলেও সমীকরণটি
মিলে যায়। সমিতির তথ্য মতে, তাদের
সঙ্গে যুক্ত শ’খানেক উদ্যোক্তার প্রতিজন মাসে গড়ে এক লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করতে
পারেন। সেই হিসাবে একশ উদ্যোক্তা মাসে গড়ে এক কোটি ও বছরে ১২ কোটি টাকার নকশিপণ্য
বিক্রি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, যশোরের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার এত বড় একটি খাতকে
শুধু পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করা যাচ্ছে না। সম্ভব হচ্ছে না নারীর মুক্তি যাত্রায় আত্মনির্ভরশীলতার সোপান হিসেবে বিষয়টিকে
তুলে ধরার।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো যশোরেও সূচিশিল্পের
নির্মাণশিল্পী হিসেবে নারীদের ভূমিকা একচেটিয়া। গ্রাম-বাংলার নারীদের হাতেই
সূচিশিল্পের সৃষ্টি এবং তাদের হাতেই এর বিকাশ ও প্রবহমানতা নির্ভরশীল। যশোরের
যেকোনো উপজেলার যেকোনো গ্রামের পথে হাঁটুন, দেখা যাবে বাড়ির উঠোনে গ্রামীণ নারীরা সংসারের সব কাজের ফাঁকে হাতের সুচের
ফোঁড়ে দৃশ্যকাব্য ফুটিয়ে তোলায় ব্যস্ত। যদিও শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে,
বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি সূচিশিল্পের কাজ হয় শার্শা, মনিরামপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা
এবং সদর উপজেলায়। তবে পুরো জেলার অধিকাংশ
নারীই কোনো না কোনোভাবে এই শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত। ঐতিহ্যের হাতে হাত রেখে এই
শিল্পমাধ্যমটিকে যদি প্রণোদনা দেওয়া যায়, তবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এলাকার সব
মানুষকে যেমন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করবে, তেমনি স্বনির্ভরতা
অর্জনের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হবে এ শিল্প।
যশোরের সূচিশিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান
প্রতিবন্ধকতা এর নকশা বৈচিত্র্যতা এবং স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলা। মূলত পর্যাপ্ত
গবেষণার মাধ্যমে এ অঞ্চলের সূচিশিল্পের বৈচিত্র্যতাকে সংরক্ষণ এবং পরবর্তী
প্রজন্মের মধ্যে প্রবহমান রাখার কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফলে যশোর স্টিচ, নকশি
প্রভৃতি সেলাইয়ে যে বিশেষত্ব এ অঞ্চলের নারীদের জন্মগত, সে ধারা ধীরে ধীরে হারিয়ে
যাচ্ছে বর্তমানে চলমান সস্তা সেলাইয়ের দাপটে। এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, স্বকীয়তাকে
সংরক্ষণ ও প্রসারে তাই প্রয়োজন নকশা এবং বুননে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটাতে
সহায়ক গবেষণা,
শিল্প সংরক্ষণাগার তৈরি, প্রশিক্ষণ প্রদান, জাতীয়, আঞ্চলিক
ও হেরিটেজ মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি, সহজ শর্তে ঋণ, বিপণনের
প্রদর্শনীকেন্দ্র এবং নকশিপল্লীর পরিকল্পনা গ্রহণ। প্রয়োজন হেরিটেজের অংশ হিসেবে
সূচিশিল্পের এ ধারাকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ, জেলার সূচিশিল্পীদের
তথ্যভান্ডার তৈরি এবং বিশ্বব্যাপী বিপণনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই কমবেশি নকশি শিল্পের কাজ চলমান
থাকলেও নকশি শিল্প বিশেষত নকশিকাঁথার বিবরণ দিতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি
অঞ্চলকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলোÑ যশোর-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর অঞ্চল, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ
অঞ্চল এবং জামালপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চল। তাদের মতে, তিনটি অঞ্চলের নকশিকাঁথারই নিজস্ব
বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে যশোর-কুষ্টিয়ার কাঁথা ও সূচিকর্ম নকশার নিরিখে সর্বোৎকৃষ্ট।
কিন্তু যশোরের এ শিল্প খাতকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাব প্রকটভাবে
দৃশ্যমান।
যেকোনো প্রাপ্তি বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের
জন্য যেখানে ক্ষমতার বলয়ে থাকা একজন ব্যক্তি বা নেতার প্রয়োজন হয়, সেখানে আজীবন
সংগ্রামরত দেশের প্রথম স্বাধীন জেলা, প্রথম নিরক্ষরমুক্ত জেলা, প্রথম
ডিজিটাল জেলা যশোর এমন একজন প্রভাবশালী নেতাকে খুঁজে পায়নি যার কারণে আমাদের প্রত্যাশিত
উন্নয়ন চাহিদা পূরণ হবে। যশোরের সম্ভাবনাময় সকল শিল্প বাণিজ্য খাতের ক্ষেত্রেই এমন
হয়েছে। আর সূচিশিল্পে যেহেতু নারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য, সেখানে এ শিল্প খাতকে
সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করার, আমলে নেওয়ার বা পরিকল্পিত উপায়ে এগোনোর
ক্ষেত্রে আমাদের পশ্চাৎপদ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা রয়েই গেছে। জেলার অধিবাসীদের
ধারণা, একজন প্রভাবশালী নেতার অভাবেই সূচিশিল্পের মানের নিরিখে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার
পরও ‘শেখ হাসিনা নকশিপল্লী’
যশোরে না হয়ে জামালপুরে প্রতিষ্ঠার জন্য একনেকে অনুমোদন পায়। জামালপুরে
বাস্তবায়নরত এ প্রকল্পে দেশের নকশি শিল্পী ও শিল্প পুনর্বাসনে ৩০০ একর জমির ওপর
নির্মাণ করা হচ্ছে নকশিপল্লী। প্রকল্পের ব্যয় ৭২২ কোটি টাকা। আর যশোর পড়ে আছে একটি
বিশেষায়িত ছোট ক্লাস্টার হিসেবে। এ অবস্থার উত্তরণ প্রয়োজন। তাহলেই আগামী
সময়গুলোতে সূচিশিল্প হতে পারে যশোরের সম্ভাবনাময় অন্যতম অর্থনৈতিক খাত। সে হাতে
হাত রেখে পথ চলবে ঐতিহ্যের যশোর, সংগ্রামের যশোর, শিল্পময়
যশোর, সম্ভাবনার যশোর।