× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ২

দেশের পর্যটনশিল্প ও রিসোর্টসংস্কৃতি

আরিফুর রহমান

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৪ ১২:২৮ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:০৬ এএম

আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান

ভারতবর্ষের ভ্রামণিক হিসেবে সেরার মুকুটটি রবীন্দ্রনাথের ভাগেই যাবে। যখন ঘরকুনো হিসেবে বাঙালির দুর্নাম শতভাগ, তখন রবীন্দ্রনাথ সে স্রোতের বিপরীতে একের পর এক দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্য- সবখানে তার পদচারণ পড়ছে। ঘুরছেন জাহাজে, বিমানে, ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে। যেখানে যা পাচ্ছেন, তাতে চড়েই দেখে নিচ্ছেন পৃথিবীর রূপ-রস। তবে একুশ শতকে এসে বাঙালির ঘরকুনো ব্যাপারটা আর ধোপে টিকবে না। ঘুরে বেড়ানোর ব্যাপারটা এখন প্রাত্যহিকতায় ঢুকে গেছে। ছুটি কাটাতে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় দেশ বা বিদেশে ঘুরছে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মানুষ।

শিল্পকর্ম : আবদুর রাজ্জাক

এ ক্ষেত্রে প্রধান দুটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ দেশের ভেতর ঘুরছেন, কেউ যাচ্ছেন দেশের বাইরে। এ দুই রকম প্রবণতার ভেতর বাজেটের বিষয়টিও যুক্ত বটে। যারা দেশের ভেতর ঘুরছেন, একটা সময় পর্যন্ত দেশের ভেতর ঘুরে বেড়ানোটা ছিল জায়গানির্ভর, সমুদ্র বা পাহাড়। কিন্তু সে ধারণারও পরিবর্তন ঘটছে। এখন শুধু সমুদ্রই শেষ কথা নয়। এর সঙ্গে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তারাও দেশের ভেতর তাদের পছন্দের জায়গা খুঁজে নিচ্ছেন। যে জায়গাটা তৈরি হয়েছে পর্যটকদের নানা কিছু চিন্তা করে। সেখানে হয়তো দু-তিন দিন কাটিয়ে ফিরে আসছে। সমুদ্রে যে আনন্দের সঙ্গে ক্লান্তি, এখানে গিয়ে সেটা হচ্ছে না। রিসোর্টে যাওয়ার এ প্রবণতাটাও খুবই সাম্প্রতিক সময়ের। আগে আমাদের দেশে ছিল না।

এখানে রিসোর্টের ধারণা মাত্র দেড়-দুই দশকের পুরোনো। যেখানে রোমান সাম্রাজ্যে রিসোর্টের সূত্রপাত ঘটে ক্রিস্টীয় শতাব্দী গণনার শুরুর দিকে অর্থাৎ ২ হাজার বছর আগে। কাজ থেকে স্বস্তি পেতে, একটু আরাম পেতে রোমান সাম্রাজ্যে গণগোসলখানা থেকে রিসোর্টের জন্ম হয়। রোমান সাম্রাজ্য থেকে গ্রিস, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি হয়ে ইংল্যান্ডে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে রিসোর্ট। আর রিসোর্ট নিয়ে এ কথাটি মোক্ষম, The sole purpose of a resort, in the classic sense, is to afford its users a place for escape or restoration from the world of work and daily care.

-CHUCK Y. GEE (Resort Development and Management)

রিসোর্ট নিয়ে আমার নিজের একটা জার্নি আছে। আমার পড়াশোনা সিলেট ক্যাডেট কলেজে, ভর্তি সাল ১৯৮৩। সিলেট মানেই তো চা-বাগান। ক্যাডেট জীবনের পুরোটা সময় কেটেছে চা-বাগানের পাশেই। ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে সেনা কর্মকর্তা হওয়ার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিলেও ১২ মাস পর আর থাকা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে সময়টায় কিছুদিন ছিলাম ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রদায়ক। এরপর আবার সেই চা-বাগানেই চাকরি। এবার শ্রীমঙ্গলের সিন্দুরখান আর রাজঘাটে জেমস ফিনলের চা-বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজের শুরু। তখনই চা-বাগানকেন্দ্রিক পর্যটনের স্বপ্ন দেখা শুরু করি। তার আগে অবশ্য আরেক জীবন। চা-বাগানের চাকরি ছেড়ে বস্ত্র ও রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা শুরু করি। এ খাতে বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির পরিমাণ বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।

বস্ত্র-রপ্তানি খাতে ব্যবসার এ যাত্রা আমাকে আরও বেশি স্পৃহা দেয় চা-বাগানের পাশে কিছু একটা করার। সেই স্বপ্নপূরণে কয়েকজন ব্যবসায়িক অংশীদার সঙ্গে নিয়ে একটি পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট করার প্রত্যয়ে উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে থাকি। শেষ পর্যন্ত পেয়েই যাই। জায়গাটির খোঁজ দেন ক্যাডেট কলেজেরই সাবেক রুমমেট এবং সহপাঠী তাপস। জায়গাটির অবস্থান হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায়, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা সীমান্তে। পুরোটা ছনখোলা আর অল্প কিছু লেবু-আনারস ও রাবারবাগান, সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বাঁশঝাড়। অনেক ঘুরে যেতে হতো হাঁটাপথে। গাড়ির রাস্তা ছিল না। এমনকি বিদ্যুৎ, পানিরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পুরো জায়গার মধ্যে ৭৬ দশমিক ৭৪ একর জমি ছিল একই পরিবারের। তবে পছন্দ হওয়া জমির সবটুকু তাদের নয়। ফাঁকে ফাঁকে আছে প্রায় ২৪ দশমিক ১১ একর জমি। সব জমি কেনা হলো কোম্পানির নামে। সেই ১০০ দশমিক ৮৫ একর জায়গার ওপরই আজকের দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট, যার মূল কোম্পানি গ্রিন প্ল্যানেট রিসোর্ট লি.।

প্রথম থেকেই পরিকল্পনা ছিল প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা গাছগাছালি অক্ষুণ্ন রেখে প্রকল্পটি তৈরি হবে। কোনো গাছ তো কাটা হবেই না, বরং নতুন করে আরও লাগানো হবে। সেভাবেই এগোল পুরো পরিকল্পনা। সব পুরোনো গাছ থাকল, তার সঙ্গে আরও প্রায় ৩৫ হাজার ঔষধি, ফলদ ও বনজ গাছ রোপণ করা হলো। শুধু গাছের জন্য একজন কৃষিবিদকে প্রকল্পের শুরুতেই যুক্ত করা হয়। যার সুফল আজ প্রায় ১৩ বছর পর এসে সবাই স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। তখনকার বনায়নকৃত গাছ আজ পরিণত হয়ে রিসোর্ট জুড়ে অনাবিল স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। যেটি যেকোনো বয়সের পর্যটকের দেহ-মন ছুঁয়ে যাবেই। পুরো রিসোর্ট এলাকায় এখন ৪২-৪৩ হাজার গাছ।

রিসোর্টের নকশা তৈরি ও নির্মাণকাজের জন্য দেশের কয়েকজন প্রথিতযশা স্থপতি তো ছিলেনই, এর সঙ্গে সহায়তা নেওয়া হয় দেশের বাইরের স্থপতিদেরও। শুরুতেই রিসোর্টে যেতে ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করতে হয়েছে। রাস্তাটা আঁকাবাঁকা এবং চা-বাগানের ভেতর দিয়ে গেছে। রিসোর্টটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে পরিবেশ নষ্ট না হয়। পাহাড়ের সঙ্গে পাহাড়ের সংযোগ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ দিয়ে। বিদ্যুতায়ন করা হয়েছে মাটির নিচ দিয়ে, যাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। অসাধারণ সৌন্দর্য আর পরিবেশ সচেতনতার সরকারি স্বীকৃতিও মিলেছে। রিসোর্টের মূল কোম্পানি ২০১৪ সালে বৃক্ষরোপণে ‘প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার’ অর্জন করেছে। এটির এখন পাঁচতারকা মানের রিসোর্ট হিসেবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স রয়েছে।

আমরা এমন কিছু করতে চাচ্ছিলাম যেন কারও রিসোর্টের ভেতরে ঢুকে কয়েক দিন আর বের হওয়ার প্রয়োজন না হয়। অতিথিরা সিনেমা দেখবেন, সাঁতার কাটবেন, মাছ ধরবেন, সবুজে হাঁটবেন, সাইক্লিং করবেন, নিভৃতে প্রকৃতির মায়ায় জড়াবেন- এ রকম নানা আনন্দযজ্ঞ রেখেছি আমরা। বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ একটি ম্যুরাল প্যালেসের মূল ফটকে স্থাপন করা হয়েছে। এ রিসোর্টে রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের আর্থিক সহযোগিতায় ২০১৯ সালের দিকে একটি দৃষ্টিনন্দন ওয়াটার পার্ক স্থাপন করা হয়েছে; যেটি পর্যটকদের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এবং তাদের মায়েদের জন্য এটি একটি বিশেষ কিছু হিসেবে বিবেচনা করা যাবে। আবাসনের জন্য এখানে রয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় পাঁচতারকা সুবিধাসমেত পাখিডাকা ছায়াঘেরা ২২টি ভিলা। যার মধ্যে দুটি প্রেসিডেন্সিয়াল ভিলাও আছে। এগুলোয় পাঁচতারকা মানের সব ধরনের সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ভিলাগুলোর দূরত্ব এ রকম যে, তাতে চমৎকার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে অবকাশ যাপন করা সম্ভব। এ ছাড়া প্রধান টাওয়ারের বহুতল ভবনে থাকার জন্য আছে ১০৭টি রুম। ওখানকার রুমগুলো সাজানো হয়েছে প্রাসাদ বলতে যা বোঝায় তার সার্থকতা নিশ্চিত করতে; যা প্রয়োজন তার সব দিয়ে।

প্যালেসে রয়েছে চারটি বড় সভাকক্ষ, ৪৫০ জন ক্যাপাসিটির ব্যাংকোয়েট হল, ছোটদের তিনটি খেলার জায়গা, বিলিয়ার্ড, ফুটবল, বাস্কেটবল, দুটি টেনিস কোর্ট, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, ক্রিকেট নেট প্র্যাকটিসের সুবিধা, দুটি জিম। চোখ জুড়ানো দুটি সুইমিং পুল আছে। একদিক থেকে জলধারা এসে পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে, এটাকে বলা হয় ইনফিনিটি পুল। এর চারদিকে সবুজ ছন গাছগুলোও সিলেটের ঐতিহ্য। দুটি সিনেপ্লেক্সও রয়েছে। রয়েছে তিনটি হেলিপ্যাড। সঙ্গে রয়েছে পাঁচটি রেস্টুরেন্টÑঅলিভ রেস্টুরেন্ট, রেভ্যুলেশন ক্যাফে, নস্টালজিয়া, সাইগন ও সিসা লাউঞ্জ।

দি প্যালেসে যারা কর্মরত তাদের প্রায় সবাই দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক হোটেলে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাংলাদেশি। তাদের কাছ থেকে সব সময় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত হয়।

একটা সময় পর্যন্ত এ দেশের পর্যটন ছিল কক্সবাজারনির্ভর। কক্সবাজার না হলে রাঙামাটি-বান্দরবান। এর বাইরে খুব বেশি জায়গা ছিল না। সিলেটের অপার সৌন্দর্যের ক্ষেত্রভূমি চা-বাগানগুলোর প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকলেও বাধা ছিল নানাবিধ। দুর্বল অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পর্যটকবান্ধব পরিবেশ ইত্যাদির অভাব ছিল। যে কারণে খুব বেশি মানুষ যেতে পারত না। সিলেট-মৌলভীবাজারে চা বাগানকেন্দ্রিক পর্যটনের বিরাট সম্ভাবনা থাকলেও তা নিয়ে তেমন কাজ হয়নি। বলা চলে, ‘দেশের চা-বাগানের সৌন্দর্যের কিছুই এখনও উন্মোচিত হয়নি। সবুজ ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। এগুলোই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। যেখানে দার্জিলিংয়ে চা-বাগান ঘিরে অগণিত লাক্সারি রিসোর্ট রয়েছে, সেখানে আমাদেরও এ রকম সেবা দিয়ে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। ফলে আমি চাইব বাংলাদেশের পর্যটন খাতে এ রকম বিনিয়োগ আরও বেশি ঘটুক। দেশের ভ্রামণিকরা বাইরে টাকা খরচ না করে দেশেই করুক।

  • ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দ্য প্যালেস। চেয়ারম্যান, ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা