× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ২

সুশাসনেই গণতন্ত্রের ঔজ্জ্বল্য

ড. বদিউল আলম মজুমদার

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৪ ১২:২০ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:০৬ এএম

ড. বদিউল আলম মজুমদার

ড. বদিউল আলম মজুমদার

গণতন্ত্র ও সুশাসন আমাদের আরাধ্য। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান কিংবা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করতে সর্বাগ্রে দায় বর্তায় রাজনীতিকদের ওপর। সচেতন মানুষ মাত্রই জানা আছে, এ দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ গণতন্ত্রের জন্য বারবার নিঃস্বার্থভাবে রাস্তায় নেমেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান কিংবা বিকাশে আত্মোৎসর্গের বেদনাকাতর নজিরও আমাদের সামনে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যে গণতন্ত্রের প্রত্যাশা করি; যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সর্বাগ্রে অধিকারের সমতল মাঠ, ন্যায়বিচারসহ সুস্থ জীবনযাপনের সব অনুষঙ্গ নিশ্চিত হবে, তা কতটা পূর্ণ হয়েছে?

শিল্পকর্ম : কালিদাস কর্মকার

নির্বাচিত সরকার মানেই গণতান্ত্রিক সরকার নয়, এই নজিরও আমাদের দেশেই আছে। নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কিংবা সরকারব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য সুষ্ঠু, অবাধ, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন কতটা অপরিহার্য এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। একই সঙ্গে এও সত্য, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হওয়া নির্ভর করে নির্বাচিত সরকারের কার্যক্রমের ওপর। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উত্তর আমরা কেমন সংসদ পেলাম, এ নিয়ে কিছু দিন আগে একটি দৈনিকে লিখেছি। ওই নির্বাচনে ভোটার ছিলেন প্রায় ১১ কোটি ৯৬ লাখ ১৬ হাজার ৬৩৩ জন। ভোটকেন্দ্র ছিল ৪২ হাজার ২৪টি। নির্বাচনে ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে বিএনপিসহ সমমনা ১৬টি রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। সুজনের পর্যবেক্ষণে নির্বাচনের কার্যক্রম সম্পর্কে ইতঃপূর্বে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা অভিমত ব্যক্ত করেছি। নতুন প্রেক্ষাপটে আবারও বলি, ওই নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ না হওয়ায় নির্বাচনটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলার অবকাশ ক্ষীণ। নির্বাচন উত্তর জাতীয় সংসদের যে চিত্র আমরা দেখছি তাতে প্রতীয়মান হয়, সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দল না থাকায় সরকারের ‘সমান্তরাল’ দায়বদ্ধতার কাঠামো ভেঙে পড়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কিংবা সরকারব্যবস্থায় এমন বার্তা সুখকর নয়। 

নির্বাচন কমিশনের দাবি মোতাবেক ওই নির্বাচনে ৪১.৮ শতাংশ ভোট পড়ার কথা বলা হলেও, অনেক বিশ্লেষকের মতেই প্রকৃতপক্ষে এর হার আরও অনেক কম। তবে ক্ষমতাসীনদের তরফে ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ভোটার উপস্থিতি ও হারের ওপরই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে এবং আমরা বলতে চাই, তাদের বক্তব্যের সারত্ব-অসারত্ব তারাই বিশ্লেষণ করুক।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় কারও কারও সম্পদের যে চিত্র উঠে এসেছে এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। খবরের আড়ালেও যেমন খবর থাকে তেমনি হলফনামায় উপস্থাপিত তথ্যের আড়ালেও অনেক তথ্য থাকে, তাও আমাদের অজানা নয়। কারও কারও সম্পদের যে অস্বাভাবিক স্ফীতির চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে এর পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রশ্নও জাগে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্ণতা এবং সুশাসনের আলো ব্যাপৃত হওয়ার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত হলে অস্বাভাবিকভাবে সম্পদচিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসত না। সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বর্তমান-ভবিষ্যতের সুচারু রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজনে বিষয়গুলোর পর্যালোচনা জরুরি। গঠনমূলক সমালোচনা মেনে নেওয়ার মতো মানসিকতা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ঔদার্য প্রদর্শনে অপরিহার্য অনুষঙ্গ, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত বলা যায়। সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অকার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অধিকতর কার্যকরের ব্যবস্থা করা, সুশাসন নিশ্চিত করা, অনিয়ম-দুর্বত্তায়ন-ক্ষমতার অপব্যবহার-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা-অংশগ্রহণমূলক স্থিতিশীল রাজনীতি নিশ্চিতকরণসহ আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ মসৃণ করা। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট এসবের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা কী করবেন কিংবা কার্যত তাদের নীতি কিংবা কার্যক্রম কী হবে এসব কিছুর ওপরই যে ভবিষ্যতের রাজনীতি ও সুশাসন নির্ভর করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

শুরুতেই বলেছি, সুশাসন গণতন্ত্রের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়। এখানেই শেষ নয়। নাগরিক অধিকারের পূর্ণতাও সুশাসন ভিন্ন সম্ভব নয়। অনাচার-কদাচার-দুরাচারের পথ রুদ্ধ করতে সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যেমন নির্বাচন তেমনি সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচনের কিছু পূর্বশর্তও রয়েছে। যেহেতু সুশাসন এবং গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেহেতু নির্বাচনের প্রসঙ্গ সংগত কারণেই অন্যতম মুখ্য বিষয় হিসেবে সামনে আসে। যুগোপযোগী আইনি কাঠামো তো বটেই, একই সঙ্গে স্বাধীন নিরপেক্ষ ও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন কমিশনও এই পূর্বশর্তের অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচনকালীন নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশন, সরকার তার সহযোগী শক্তি মাত্র; কিন্তু তাই বলে সরকারের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সরকার যদি প্রশ্নমুক্ত ভূমিকা পালন না করে এবং নির্বাচন কমিশন যদি নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্র নিয়ে আশা ভঙ্গের কারণগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং এই নজির আমাদের সামনে কম নেই। জনগণকে সচেতন করা এবং একইসঙ্গে উচ্চকণ্ঠ করার ব্যাপারে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অসীম এবং প্রতিযোগিতার-স্বচ্ছতার স্মারক হিসেবে গণমাধ্যম নাগরিক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যূথবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে এবং এরও ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান হতে বাধ্য। উন্নত তো বটেই অনেক উন্নয়নশীল দেশেও এর নজির আছে। সুজনের তরফেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং জন-অধিকারের পথ মসৃণ করার লক্ষ্যে অনেক কার্যক্রমই ইতোমধ্যে গ্রহণ করা এবং তা কার্যকরে পরিকল্পিত পদক্ষেপও নেওয়া হয়। 

আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট অসাধুরা নানাভাবে ফায়দা লোটার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন এমন নজিরেরও অভাব নেই। দুর্নীতিবাজ-দুর্বৃত্ত, কালো টাকার মালিক, দখলদার, ঋণখেলাপিসহ দেশ-জাতির স্বার্থের পরিপন্থি অবস্থান নিয়ে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ যারা করেন তাদের আস্ফালনও আমরা কম দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে এমনটি তো কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। চলছে স্বাধীনতার মাস। একাত্তরে এই মার্চেই জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। যে প্রত্যয়-অঙ্গীকার সামনে রেখে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে সেই লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বৈষম্য-সাম্প্রদায়িকতার নিরসনসহ নেতিবাচক সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে সাম্যের বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার কেন পূর্ণ মাত্রায় আমরা বায়ান্ন বছরেও বাস্তবায়ন করতে পারলাম না এজন্য আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন। বায়ান্ন বছরে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে বটে কিন্তু এই উন্নয়নের সুফল সর্বসাধারণের জন্য উপভোগ্য হয়েছে কি না তাও বড় প্রশ্ন। 

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার পথ এমনভাবে মসৃণ করা উচিত যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিকল্প থেকে বেছে নেওয়া যায়। যেখানে ভিন্ন দল, ভিন্ন মত, ভিন্ন আদর্শ থেকে ভোটার তার প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অবারিতভাবে সুযোগ পান, সেই ব্যবস্থাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। গণতন্ত্র মানে বহু দল ও মতের অংশগ্রহণ। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনোভাবেই যাতে এই মতভিন্নতা বৈরিতার পথ প্রশস্ত না করে সেদিকে মনোনিবেশ করা রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের গুরুদায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে রাজনীতি পরিশীলিত করার কাঙ্ক্ষিত চেষ্টা-আন্তরিকতা-সদিচ্ছা-দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান আমাদের দেশে দৃশ্যমান নয় হয় না। 

সংবিধান মোতাবেক জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু রাজনীতিক কিংবা জনপ্রতিনিধিরা জনগণকে কতটা যথাযথ মূল্যায়ন করেন কিংবা নির্বাচনকালীন সময় ছাড়া তাদের সেভাবে হিসাবে রাখেন, সেটাও বিবেচ্য বিষয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‍জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা হলেও এক্ষেত্রেও জনপ্রত্যাশা বারবার হোঁচট খায়। মূলত সুশাসনব্যবস্থা হলো সেই শাসন যেখানে রাষ্ট্রের জনসম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত নাগরিক সেবাদান সম্ভব হয়। সুশাসন বা গুড গভর্নেন্সের উপাদান হিসেবে যেগুলো বিবেচনা করা হয়, সেগুলো হলোÑ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, বিকেন্দ্রীকরণ, আইনের শাসন মানবাধিকার সংরক্ষণ ইত্যাদি। এক কথায় সুশাসন একটি বড় প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে পরিচালনার মাধ্যমে রাষ্ট্র-সমাজ-নাগরিকের স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

যে শাসনব্যবস্থায় আইনের শাসন, দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি এবং জনগণের অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক উপায়ে সুনিশ্চিত হয়, এক কথায় তাই হলো সুশাসন। বাংলাদেশের সর্বজনগ্রাহ্য স্লোগানÑ সুশাসন, কিন্তু এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারক বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনতা ও সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে জনগণের মতামতের প্রাধ্যান্য একটি বড় বিষয় এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, গণতন্ত্র না থাকলে জনগণের মতামত কিংবা প্রত্যাশা নানাভাবে দমনের অপচেষ্টা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে আমরা অবশ্যই সুশাসন এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান চাই।

  • সুশাসনের জন্য নাগরিক, সুজন-এর সম্পাদক। সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা