× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ২

সাহিত্যের অভিলক্ষ্য

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৪ ১২:১৫ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:১৭ এএম

ইমতিয়ার শামীম

ইমতিয়ার শামীম

নতুন একটি শতাব্দীর বলতে গেলে প্রায় আড়াই দশকের শেষপ্রান্তে এসে, এ রকম চিন্তা আসাটা অস্বাভাবিক নয় যে, একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য কোন পথে হাঁটছে? আমাদের এই বাংলাদেশের সাহিত্যের ভবিষ্যৎই বা কেমন দাঁড়াচ্ছে? প্রতি বছর যত বইপত্র প্রকাশিত হচ্ছে, এমনকি লিটল ম্যাগও যত বেরোচ্ছে, সে সংখ্যা দিয়ে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন। এমনকি প্রকাশনা শিল্পের সঠিক চালচিত্রও বইপত্র প্রকাশের পরিসংখ্যান দিয়ে বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন করা কঠিন। যদিও এ-ও ঠিক, সংখ্যারও গুরুত্ব রয়েছে- প্রয়োজন পূরণ করতে পারুক বা না পারুক, প্রয়োজন পূরণের সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক, এত বইয়ের প্রকাশনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলেই হয়তো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছেÑবইয়ের প্রকাশনা যখন অনেক অনেক কম ছিল, তখন বাংলা সাহিত্যের যে গুরুত্ব ছিল, অসংখ্য বই প্রকাশের এবং হাতের কাছে চলে আসার এই সময়ে তার গুরুত্ব কি এখনও আদৌ আগের মতোই আছে? নাকি সাহিত্যকে গুরুত্বপূর্ণ থাকতে হলে আগামীতে তাকে দাঁড়াতে হবে নতুন এক চেহারা নিয়ে?

এমন সব প্রশ্নের অন্বেষণের আগে বোধকরি কিছু প্রত্যয়গত, ইতিহাসগত দিকের মীমাংসাও খুব বেশি প্রয়োজন। অবশ্য এ মীমাংসার অর্থ এই নয় যে, একটি সিদ্ধান্তকে সর্বজনীন করে তোলা। বরং এর অর্থ হলো একটি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নিজের ধারণা ও গতিপ্রবাহটি সুস্পষ্ট করা। এ বিষয়ে অবশ্য খুব একটা দ্বিমত হওয়ার কথা নয় যে, সাহিত্য হলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোরই অভিজ্ঞতার আধার। ব্যক্তির অভিজ্ঞতার পটভূমি থেকে তা যাত্রা করে, কিন্তু তার গন্তব্য বোধকরি সুনির্দিষ্ট নয়। কেননা সাহিত্য যেমন সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি প্রভাবিত করে, তেমন সেগুলোও প্রভাবিত করে সাহিত্য। কখনও কখনও সাহিত্য আমাদের কাছে ফিরে আসে সামাজিক স্মৃতি হিসেবে। এ স্মৃতি আমাদের জাগ্রত করে, সংঘবদ্ধ করে, শানিত করে এবং নতুন কোনো যাত্রাপথের দিকে ধাবিত করে। এ কারণেই কালে কালে, বিশেষত ক্রান্তিকালে এ প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়Ñসাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী? ভবিষ্যতের সাহিত্যই বা কেমন হবে? এসব প্রশ্নের আড়ালে যে নির্মম প্রশ্ন থাকে, তা আসলে এই যে, সাহিত্যের কি আদৌ আর কোনো প্রয়োজন আছে? সাহিত্য কি আগামী দিনগুলোয় টিকে থাকবে?

শিল্পকর্ম : আমিনুল ইসলাম

দুই.

প্রত্যয়গত, ইতিহাসগত কিছু দিকের, কিছু বিষয়ের মীমাংসার দিকে যদি ফিরে চাই, প্রথমেই যে বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তা হলো, সাহিত্যকে আমরা কোন পটভূমিতে মুখ্য বিবেচ্য ভাবব? দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নাকি ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে? উত্তরাধিকারের একটি ধারাবাহিকতা থাকে, যাকে চাইলেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু দিন দিন বিষয়টি এমন হয়ে উঠছে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ন্যায্যতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা প্রকল্পের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা গাঁটছড়া বেঁধে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অব্যাহত রাখার বয়ান দিয়ে সেই ধারাবাহিকতাকেও অস্বীকার করার পথে এগোচ্ছে। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, পাঠ্যপুস্তক থেকে বিশেষত প্রাথমিক-মাধ্যমিক পর্যায়ে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের অনেক বাঙালি সাহিত্যিকের গল্প-কবিতা বাদ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও যে এ ধারা অব্যাহত থাকবে, তা নির্দ্বিধায় বলা চলে। পাঠ্যবইয়ে, পাঠক্রমে নানা পরিবর্তন আসবে, প্রতিনিয়ত তা সমকালীন হবে এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এ স্বাভাবিকতার বিষয়টি যখন আর বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও একাডেমিশিয়ানদের হাতে থাকে না; বরং সংঘবদ্ধ কোনো রাজনৈতিক ধারা সেই স্বাভাবিকতা নির্ধারণ করে দিতে শুরু করে; তখন মূলত সাহিত্যের গতিপথই পাল্টানো হতে থাকে। সেই সপ্তম শতাব্দীতে বিকাশের শুরু বাংলা ভাষার। বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যরা তাদের ধর্মীয় সাধন সংগীত রচনা করতে থাকেন এ ভাষায়। কিন্তু তা তো এক ধর্মে আটকে থাকেনি, আটকে থাকেনি সুনির্দিষ্ট ভূগোলেও। মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, মসিয়া সাহিত্য, দোভাষী পুঁথি রচনার মধ্য দিয়ে বিশেষ একটি আদল পেয়েছে বাংলা সাহিত্য। আসলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে যে আলোচনাই করি না কেন, আমাদের প্রত্যেকেরই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। তা হলো, বাংলা ভাষা না ছিল উচ্চবর্ণ হিন্দুর ভাষা, না ছিল উচ্চবর্ণ মুসলমানের ভাষা। এটি আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ছিল অন্ত্যজ বাঙালির ভাষা। যুগের পর যুগ এ জনপদের শাসকদের ও তাদের রাজ্য পরিচালনার ভাষা ছিল ফারসি, ইংরেজি; কিন্তু কোনো রাজানুগ্রহ না পাওয়ার পরও এ ভাষা টিকে থেকে বিকশিত হয়েছে। আর এ টিকিয়ে রাখার ও বিকশিত করার মূল কাজটি করেছে অন্ত্যজ বাঙালিই। ‘বাঙালি মুসলমান’ বলে যে প্রত্যয় বা প্রপঞ্চ, যেটাই বলি না কেন, সেই বাঙালি মুসলমানের কেউই কখনও সুলতান ছিল না, এমনকি এদের মধ্যে কোনো সেনাপতি-সিপাহসালার, জায়গিরদার, মসনবদারও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অবাঙালি মুসলমানরা মনে করতেন, স্থানীয় মুসলমানরা আসলে ‘শুনে শুনে মুসলমান’, ‘অধঃপতিত’ এবং ‘হিন্দুয়ানি’ সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত ‘মুসলমান’; যাদের প্রকৃত মুসলমানে পরিণত করা তাদের ‘ইমানি’ দায়িত্ব। অবাঙালি মুসলমানদের এ ধারণা ক্রমে সঞ্চারিত হয়েছে ‘বাঙালি মুসলমানের’ একাংশের মধ্যেও। এ কথাগুলো মনে রাখলে আলোচনায় যেমন সুবিধা হয়, কোনো উপসংহারে পৌঁছাতেও সুবিধা হয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতের কারণেই ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন নতুন এক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতই তৈরি করে দেয়। বাঙালির বিকাশের সঙ্গে যেমন, তেমনই পূর্ববঙ্গের অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষের বিকাশের পথও তৈরি করে দেয় এ পরিপ্রেক্ষিত। ফলে বাংলা সাহিত্যের উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায়ও দেখা দেয় নতুন স্রোতÑমূল স্রোতই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সাহিত্য। বিংশ শতাব্দীর বিশ থেকে চল্লিশ দশক জুড়ে ‘সওগাত’ ও ‘মোহাম্মদী’ নামে দুটি পত্রিকা ঘিরে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার তরঙ্গ দেখা দিয়েছিল, সে তরঙ্গ আর ভাষা আন্দোলন মিলেমিশেই যে এমন একটি স্রোতধারা তৈরি করেছে, তা বোধকরি লেখার অপেক্ষা রাখে না।

তিন.

বাংলাদেশের সাহিত্যের মূল সংকট নিহিত রয়েছে দেশেই, বিশেষত আমাদের কাঠামোর মধ্যেই। এখনও আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা একমুখী করতে পারিনি। এ বৈভিন্নতা যদি আমাদের সাহিত্যের বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত ও অভ্যস্ত করিয়ে দিতে পারত, তাহলে চিন্তার কারণ ছিল না। কিন্তু একদিকে ইংরেজি শিক্ষার ধারা, আরেকদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার ধারা; এর মধ্যে দাঁড়ানো সরকারি সাধারণ শিক্ষার ধারা থেকে আমরা যে দর্শনগত ধারায় দাঁড়াচ্ছি তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন, তেমন বাংলা সাহিত্যেও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি নির্মাণ করেছে। এ বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি একটি শক্ত ভিত খুঁজে পেয়েছে বলে এখন ‘প্রগতিশীল সাহিত্য’ জাতীয় প্রত্যয় বেশ ক্লিশে মনে হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত আমরা এমন কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি যে ‘প্রগতিশীল সাহিত্য’ ক্লিশে হয়ে উঠবে। প্রায়ই আমাদের অনেককে বলতে শোনা যায়, বিশ্বসাহিত্যে কি আমরা পারছি নতুন কোনো জায়গা করে নিতে? এ প্রশ্নের মেদহীন উত্তর অনেকের কাছে শ্রুতিমধুর হবে না। ‘লিটারেচার রেসিডেন্সি’ নিয়ে বছর বছর কয়েক মাস ধরে দেশের বাইরে বসবাস করার মানে বিশ্বসাহিত্যের অংশীদার হওয়া নয়। কিংবা বাংলাদেশি বা বাঙালি বংশোদ্ভূত কেউ কেউ ইংরেজি ভাষায় লেখার কল্যাণে আলোচিত হওয়ার মানেও বিশ্বসাহিত্যে জায়গা করে নেওয়া নয়। একটি ভাষার সাহিত্য সে ভাষার জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞানের কথকতা, সামাজিক অভিজ্ঞতার কথকতা, সাংস্কৃতিক নির্মাণ-বিনির্মাণের কথকতা। ওই জনগোষ্ঠী এ কথকতা কতটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে, শৈল্পিকতার সঙ্গে, বোধগম্যতার সঙ্গে বলবার, লিপিবদ্ধ করবার প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে পারছে, সেটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যেমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এ কথকতা বিশ্বের অন্য ভাষাভাষীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কি না।

এখন, অনেক সংকট থাকার পরও অনুবাদের কল্যাণে বিশ্বসাহিত্য আমাদের হাতের নাগালে চলে এসেছে। অথবা এও বলা যায়, ইংরেজি ও বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার কল্যাণে বা বদৌলতে আমাদের অনেকেই এখন স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করছেন বিশ্বসাহিত্যের বাগানে। আমাদের এ আহাজারি এখন বিশেষ দ্রষ্টব্য হয়ে উঠেছে যে, ভালো অনুবাদ হচ্ছে না বলে বিশ্বসাহিত্যে বাংলাদেশের সাহিত্য তেমন আলোচিত হচ্ছে না। এ আক্ষেপ স্বীকার করে নেওয়ার পরও বলা যায়, বিশ্বের অন্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো যত বাঙালি সাহিত্যিকের নাম গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে সত্তরের দশক অবধি আমাদের সঞ্চয়ে রয়েছে, তার পর থেকে তেমনটি ঘটেনি বললেই চলে। সাহিত্য বিকাশের বিষয়টি তো শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবেই শক্তিশালী হয়ে ওঠার ব্যাপার। বাংলা ভাষার বাজার আন্তর্জাতিকভাবে কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, বাংলা ভাষায় শ্রমবাজার কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ তার ওপরও এখন অংশত নির্ভর করছে। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের একটি কথা মনে পড়ছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি সাহিত্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হাঁটছি, কোথাও পৌঁছব বলে।’

বাংলাদেশের মানুষকেও তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহিত্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হবে; তা না হলে কি বাংলাদেশ, কি সাহিত্য কেউই পারবে না অভিলক্ষ্যে পৌঁছাতে।

  • কথাসাহিত্যিক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা