× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ১

যেমন দেখতে চাই আগামীর রাজনীতি

আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪ ১৬:৪৪ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:১৪ এএম

আবদুল মান্নান

আবদুল মান্নান

একটি দেশ স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর পার করতে পারলে তার রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থা সঠিক পথে চলার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তেমনটি হতে দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হয় ১৭৭৬ সালে। সেই থেকেই দেশটি বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি। কিন্তু দেশটির রাজনীতি এখনও নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও সে দেশের সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ যৌথ জরিপ চালিয়ে বলেছে, দেশটির ৪৯ শতাংশ মানুষ মনে করে তাদের দেশে গণতন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করছে না। শুধু ১০ শতাংশ মনে করে সব ঠিকমতো চলছে। বাকি ৪০ শতাংশের মতে কোনোরকমে তাদের দেশে গণতন্ত্র টিকে আছে। অন্যদিকে সেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দেশে দেশে সুযোগ পেলেই গণতন্ত্রের সবক দেয়। ভারতকে বলা হয় বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটি ঔপনিবেশিক ইংরেজের থেকে স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে। সে দেশেও বিভিন্ন সময় সুষ্ঠু রাজনীতি হোঁচট খেয়েছে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। এখনও সেখানে জাতিগত দাঙ্গা হয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। একই সময় পাকিস্তান নামক একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পাকিস্তান হবে ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি নিরাপদ অভয়ারণ্য। অথচ সেই অভয়ারণ্যে সবচেয়ে বেশি  মুসলমানের প্রাণ হারাতে হয়েছিল ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলায়, বর্তমান বাংলাদেশে। যারা এ প্রাণহরণে জড়িত ছিল তারা সবাই মুসলমান। জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ নামক বাঙালির একটি স্বাধীন আবাসভূমি। অন্যদিকে ৭৭ বছর পরও পাকিস্তান এখনও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিয়োজিত।

১৯৭১ সালে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ চলার পথে নানা সময়ে হোঁচট খেয়েছে। জন্মের সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশটির জন্মদাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘাতকরা সপরিবার হত্যা করেছে। সেই ঘাতকদের পৃষ্ঠপোষকরা জোরপূর্বক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে স্বাধীন বাংলাদেশকে আবার মিনি পাকিস্তান বানানোর পরিকল্পানা অনেকটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। দেশটি দুজন সেনাশাসক শাসন করেছেন। তাদের শাসনকালে যে মন্ত্র ও মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য দেশটি স্বাধীন হয়েছিল তার কবর রচিত হয়েছে। যে দলের নেতৃত্বে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল সেই আওয়ামী লীগকে ধ্বংসের চেষ্টা করেছেন এ দুই সেনাশাসক ও তাদের উত্তরসূরিরা। প্রায় তিনটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে নিজ দেশের জন্মের ইতিহাস না জেনে অনেকটা পরগাছার মতো। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার পর বাংলা নামক দেশটি আবার নতুন করে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কাজটা কখনও সহজ ছিল না। এ দীর্ঘ সময়ে দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দুর্বৃত্তদের হাতে। আদর্শের পরিবর্তে রাজনীতিতে জেঁকে বসেছে কালো টাকা আর পেশিশক্তি। সর্বনাশা সর্বগ্রাসী আমলাতন্ত্র দেশের শাসনব্যবস্থা গিলে খেয়েছে। পরিস্থিতি এতই নাজুক হয়েছে যে, জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একজন পোড়খাওয়া সদস্যকে বলতে শোনা যায় তার নির্বাচনী এলাকায় কী হয় বা হবে তা নির্ধারণ করেন জেলা প্রশাসক বা বিভাগীয় কমিশনার; তিনি নন। সেই পরিস্থিতি উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেন কিন্তু তার সে চেষ্টায় বাদ সাধে আমলাতন্ত্র।

বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন একটি আধুনিক, উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও জ্ঞাননির্ভর সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার। তাঁর মৃত্যুর পর সেসব নির্বাসনে গিয়েছিল। কন্যার নেতৃত্বে পিতার স্বপ্নের কিছুটা বাস্তবায়ন হলেও অধরা রয়ে গেছে বিস্তর।

বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে রাজনীতি কালো টাকা ও পেশিশক্তি মুক্ত করতে হবে। মূল্যায়ন করতে হবে তৃণমূলের সৎ-যোগ্য রাজনীতিবিদদের। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় গুণ ছিল তিনি কাকে দিয়ে কী কাজ হবে তা বুঝতে পারতেন এবং যোগ্য মানুষকে উপযুক্ত জায়গায় কাজে লাগাতে সব সময় সচেষ্ট থাকতেন। তা করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সাড়ে তিন বছরের মাথায় হাঁটতে শিখিয়েছিলেন। তেমনটা এখন খুব বেশি ঘটতে দেখা যায় না। এখন অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য মানুষের স্থলে জায়গা করে নিয়েছেন অযোগ্যরা। দেশের একশ্রেণির সবজান্তা আমলা যাদের অনেকের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানের বর্তমান দুরবস্থার প্রধান কারণ দেশটির আমলারা যখন নীতিনির্ধারকদের চেয়ে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তখনই সমস্যার শুরু। তৃণমূলকে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারলে রাজনীতিতে সৎ-যোগ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়বে যা এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। এমনটা করতে পারলে রাজনীতিতে জেঁকে বসা অপশক্তিও পিছু হটবে।

স্বল্পোন্নত থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছেন। ২০২৬ সাল নাগাদ এ যাত্রা শেষ হওয়ার কথা। এর পেছনে কাজ করছে তার দূরদৃষ্টি, সাহস আর চারিত্রিক দৃঢ়তা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের পর দেশের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দ্রুত কমে আসবে। বাংলাদেশে যে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে তাদের জনসম্পদে রূপান্তর করা এ মুহূর্তে খুবই জরুরি। তা করতে হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। বর্তমানে সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা আর শিক্ষাপ্রশাসন নানা সমস্যায় জর্জরিত। তা সমাধান করা না গেলে এ বিরাট তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কোনো কাজে লাগবে না। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের প্রশাসক ও আমলা হতে উদ্বুদ্ধ করে। তেমনটি ঘটতে থাকলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত যাত্রাটা খুব বেশি সহজ হবে না। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা পরীক্ষাকেন্দ্রিক। তা থেকে বেরিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে দেশে শুধু প্রশাসক বা আমলা নয়, তৈরি হবে গবেষক, উদ্যোক্তা, চিন্তক, দক্ষ কারিগর আর প্রযুক্তিবিদ। তবে এ যাত্রা শেষ করতে মোকাবিলা করতে হবে আরও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। প্রথমে রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। যে গোষ্ঠীটি একাত্তরের বাংলাদেশের চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাস করে না তাদের রাজনীতি থেকে বিদায় করতে হবে। এ দেশে যারাই রাজনীতি করবেন তাদের বিশ্বাস করতে হবে ১৯৭২-এ সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রের চার মূলনীতিকে। বিশ্বাস করতে হবে এ দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিল। মানতে হবে বাংলা নামের দেশটা স্বাধীন হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। মানতে হবে এ দেশে একটি ১৫ ও ২১ আগস্ট সংঘটিত হয়েছিল।

দেশে সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে অনেক আগেই। এ লুটপাট সাধারণ মানুষ করে না। করে সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণি, যারা সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করে। সরকার বদলালেও এদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয় না। রাজনীতি এদের হাতেই বন্দি। এরাই সকল প্রকারের দুর্নীতির মূল কুশীলব। আর তাদের দ্বারা ও তাদের স্বার্থেই দুর্নীতি সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রের এমন কোনো কার্যালয় নেই যেখানে দুর্নীতি বাসা বাঁধেনি। দেশের মানুষ এখনও বিশ্বাস করে এ পরিস্থিতি উত্তরণ সম্ভব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহসের সংমিশ্রণ ও প্রয়োগে। বাংলাদেশ পেছনে ফেলে এসেছে বায়ান্ন বছর। যে দেশটির টিকে থাকা নিয়ে বিশ্বের বাঘা বাঘা পণ্ডিত সন্দেহ করতেন, সেই দেশ বর্তমানে ৩৩তম অর্থনীতির দেশ। বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে ২০৩৬ সাল নাগাদ হয়ে উঠতে পারে ২৪তম অর্থনীতির দেশ। এ অর্জনের পেছনে অবদান আছে দেশর কৃষক, মেহনতি মানুষ, গবেষক ও শিল্পোদ্যোক্তাদের। অবদান আছে একদা চরমভাবে অবহেলিত নারীসমাজের। তবে এসব সম্ভব হতো না যদি পারিবারিক ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা একজন শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার কাঁধে না নিতেন। শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন, তার বয়স হয়েছে, তিনি এখন অবসর নিতে চান। তাকে যারা ভালোবাসেন তারা আবেগের বশে বলেন, ‘আপনার বিকল্প তো আপনি, কোথায় যাবেন?’ কিন্তু আবেগের বাইরে এসে দেশের স্বার্থে অনেক বাস্তবমুখী চিন্তা করতে হয়। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রেসিডেন্ট লি কুয়ান হুয়াকে বলা হয় আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক। তিনি তার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি একটি জেলেপল্লী থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ শাসন করেছেন ৩১ বছর (১৯৫৯-১৯৯০)। বলা হয়, দেশ পরিচালনায় তিনি জাদুকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মন্ত্রিসভায় তিনি সব সময় মেধাকে সবকিছুর ওপর স্থান দিয়েছেন। তার সভা-পরিষদের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অযোগ্যতার অভিযোগ উঠলে তাকে বিদায় জানাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি; যা বাংলাদেশে তেমন একটা দেখা যায় না। বরং অনেক সময় উল্টোটাই দেখা যায়।

শেখ হাসিনা হয়তো পিতা বঙ্গবন্ধু হতে পারবেন না; কারণ তাকে যারা সব সময় ঘিরে থাকেন তারা অনেকেই নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে পারেন না। তবে একটু চেষ্টা করলেই শেখ হাসিনার পক্ষে লি কুয়ান হুয়া হয়ে ওঠা সম্ভব। পিতার মতো তিনিও ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারাতে পারতেন অনেকবার। আল্লাহ হয়তো তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন যাতে তার কর্মের কারণে পরবর্তী প্রজন্ম বলতে পারে, ‘আমাদের লি কুয়ান না থাকুক কিন্তু একজন শেখ হাসিনা ছিলেন’। আগামী দিনের বাংলাদেশে ৩০ লাখ শহীদ যে স্বপ্ন নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিল, ঠিক তেমনটিই হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

  • শিক্ষাবিদ, বিশ্লেষক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা