× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ১

নারীর অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা

খুশী কবির

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪ ১৬:৪০ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:১৩ এএম

খুশী কবির

খুশী কবির

স্বাধীনতার ৫২ বছর অতিক্রান্তে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন দুটোই হয়েছে। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন কিংবা ক্ষমতায়নের কথা বললে বলতে হবে এর দুটো দিক আছে। এক. সামাজিক সূচকে আমরা অনেক এগিয়েছি। গড় আয়ু বেড়েছে। একাত্তর সালে নারীর গড় আয়ু ছিল ৫০-এর কোঠায়, সেটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১-এ। তখন নারীর অবস্থা কতটা নাজুক ছিল তা এ পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে, যা আগে অনেক কম ছিল কিংবা সীমিত ছিল। কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে এই পরিবর্তনটা ইতিবাচক। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অভিগম্যতা বেড়েছে। নারী অনেক জায়গায় যেতে পারছে, যে সুযোগ আগে কম ছিল। ১৯৭২ সালের কথা যদি বলি, তখনও নারীদের রাস্তাঘাটে ততটা দেখা যেত না, যতটা এখন দেখা যায়। কিন্তু তাতে তুষ্ট হয়ে বসে থাকলে চলবে না।

ভাস্কর্য : নভেরা আহমেদ

নারীশিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে অতীতে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল, যা কমে এসেছে। চাকরি, ব্যবসাসহ অর্থনীতিতে নারীর অবদান ও সাফল্য ঈর্ষণীয়। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাক্ষেত্রে সুযোগসুবিধার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হয় সর্বাগ্রে। শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর জন্য নানা সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা ভালো ফলাফল করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে সুযোগসুবিধা পাচ্ছে বলেই নারীশিক্ষার প্রসার ঘটছে। শিক্ষার প্রসারের ফলে নারীর কর্মসংস্থানও বেড়েছে। আজ থেকে দুই দশক আগেও নারীর কর্মসংস্থান ছিল সীমিত। বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিমান, সামরিক বাহিনী, সরকারি চাকরিসহ নানা পেশায় নারীদের অভিগম্যতা অনেক বেড়েছে। স্মরণে আছে, নিকট অতীতে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে পুরুষ শ্রমিক ছিল বেশি। শ্রম খাতে পুরুষের সংখ্যা বেশি থাকলেও এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নারী যুক্ত হয়েছেন। শুধু কর্মক্ষেত্রই নয়, ক্রীড়াক্ষেত্রেও নারীর সাফল্য দৃশ্যমান। স্বাধীনতার ৫২ বছর অতিক্রান্তে নারীর ক্ষমতায়ন সর্বোচ্চ পর্যায়ে হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে বেশি। বিশেষত নারী-পুরুষ বৈষম্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত কমানো গেছে।

নারীর আত্মোন্নয়নের যাত্রা বহুমাত্রিক হলেও কিছু সমস্যা এখনও জিইয়ে আছে। নারীর আত্মোন্নয়নের পথে এখনও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও নিরাপত্তাহীনতা প্রকট। বিশেষত নারীর নিরাপত্তাহীনতা এখনও অনেক বেশি। নারীর নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক ভাবনার একটি বড় প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘ সময়ে আমাদের ভাবনার পরিবর্তন ঘটলেও কিছু সনাতনী ভাবনা এখনও টিকে আছে। নারী কাজের সুযোগ পাচ্ছে, বাইরের জগতের সঙ্গে মিশছেÑএ নিয়ে এখনও সমাজে একধরনের নেতিবাচক ভাবনা রয়েছে। নারী যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেদিকে কড়া দৃষ্টি রাখছে সমাজ। এর নেতিবাচক প্রভাব নানাভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিকতা এখনও নারীর জন্য বড় প্রতিবন্ধক। বিশেষত সামাজিক পরিসরে নারী নির্যাতন বাড়ছে। নারীর এত অর্জনের মাঝেও তার নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। একই সঙ্গে এ-ও সত্য, দেশে নির্যাতনের মাত্রাও কমছে না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে নারী নির্যাতনের ধরন এবং তীব্রতা অনেক বেড়েছে।

সংবাদমাধ্যমে ও বেশ কয়েকটি সংস্থার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে। বেড়েছে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নারীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার অপকৌশলের মাত্রা। ধর্ষণের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন হলেও ধর্ষণ থামেনি। সামাজিক মূল্যবোধ এতই নিচে নেমেছে যে, প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষিত হয়েছে। এমনকি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ নারীরা নিপীড়ন আর সহিংসতার অভিযোগ জানাতে বা সাহায্য চেয়ে ফোনকলের সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের থেকে অনেক বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাইবার ক্রাইম বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু অসঙ্গতির কারণে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই নারীকে হেয় করছে। নারী নির্যাতন এখন আর ঘরে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি, প্রতারণা এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মর্মস্পর্শী অনেক ঘটনার নজির আমাদের সামনে রয়েছে। নারীর নিরাপত্তা সংকট নিরসনে আমাদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক বৈষম্য ও নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধক ভাবনাগুলো দূর করার বিষয়ে ভাবতে হবে। নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের মতো ভয়াবহ প্রথা বন্ধ করা গেছে। নারী নির্যাতনের হার কমানোর ক্ষেত্রেও তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দূরদর্শী পরিকল্পনা থাকা জরুরি। নারীর সমতা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, তা আনতে হবে সামাজিক চিন্তার ক্ষেত্রেও।

প্রতিনিয়ত সামাজিক অবক্ষয়ের নানা চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে যখন বেশ আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, তখনও দেশে নারীর শ্রমের মজুরি কম দেওয়া হচ্ছে। যদিও আইএলও কনভেনশনে আছে সম-অধিকারের কথা, সমমজুরির কথা। শুধু আইএলও কনভেনশন কেন, বাংলাদেশের আইনেও কিন্তু মজুরি সমান এবং ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে ছয় মাসের ছুটি তো মেলেই না, উল্টো ছাঁটাইয়ের হুমকি আসে। অনেক ক্ষেত্রেই বিবাহিত হলে কোনো কর্মীকে নিতে চায় না। অবশ্য এ সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়, অন্য অনেক দেশেও এ সমস্যা আছে। সামাজিক পরিসরে নারীর প্রতি প্রত্যেকের মনোভাব ও অন্য বিভিন্ন সামাজিক সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে নারীর মর্যাদা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এখনও প্রতিষ্ঠা হয়নি। এ জন্য নারীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আমাদের আইন যা-ই থাকুক না কেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সবার মানসিকতার পরিবর্তন সমভাবে না হলে এ সমস্যার সমাধান হবে না, আমরা অনেক পিছিয়েই থাকব।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর আইন আছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই সন্তোষজনক নয়। ভুক্তভোগী নারীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেভাবে তাদের অশোভন একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বিশেষ করে ধর্ষণ মামলায়, তা প্রত্যাশিত নয়। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, সমাজের অন্য অনেকেই কি নারীকে যথাযথ মর্যাদা দেয়? সমাজপতিরা কোর্টের বাইরে যেভাবে সালিশ করেন তাতেও নারীর মর্যাদার হানি ঘটছে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নারীর মর্যাদাও সামাজিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমাজে নারীকে নানাভাবে অসম্মানিত হতে হচ্ছে। তা ছাড়া আইন প্রণয়নের পর সেই আইন সময়োপযোগী করার পদ্ধতি নিয়েও ভাবতে হয়। কারণ অনেক সময় অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর বের করার অভিনব পদ্ধতি খুঁজে বের করে নেয়। তাই কঠোর আইন থাকার পরও অনেকে পার পেয়ে যায় ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে। দেখা যাচ্ছে ধর্ষক ধরা পড়ছে কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকর বেয়ে তারা বেরও হয়ে যাচ্ছে; যে কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধ কমছে না। এ ব্যাপারে আরও গভীর নজর দেওয়া জরুরি।

নারী নির্যাতন রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিকতার ঘাটতি তা-ও সর্বাংশে সঠিক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে তা দেখা যায় না, এ-ও নয়। অর্থাৎ এ ব্যাপারে ঢালাও অভিযোগ জানানো ঠিক নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আইন পেশায় নিযুক্ত দায়িত্বশীল, নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাও আছেন এবং তাদের সংখ্যাই বেশি। তারপরও কিন্তু নারীর আতঙ্ক কমেনি। শহরে কিছুটা হলেও চলাচলে নারী স্বাধীনতা পায়। এই পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হতে শুরু করেছে। গ্রামের মেয়েদের কথা ভেবে দেখা যাক। তারা ভয় পায়। তাদের অভিভাবকরা ভয় পায়। মেয়েটা কি স্কুল-কলেজ শেষ করে বাসায় নিরাপদে ফিরতে পারবেএ প্রশ্নটা তাদের সর্বক্ষণ তাড়া করে। এ জায়গাটিতে পরিবর্তন আসা জরুরি সামগ্রিক কল্যাণের প্রয়োজনে।

নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় সব সূচকেই নেপাল, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কার মেয়েরা বেশ ভালো অবস্থানে আছে। অথচ আর্থিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে পাকিস্তান, ভারত কিংবা আফগানিস্তানের মেয়েরা বাংলাদেশের মেয়েদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। নেপালে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাম রাজনৈতিক দল ক্ষমতা নেওয়ার পর সেখানকার আইনে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে সেখানে নারীর মর্যাদা বেড়েছে, সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বেড়েছে। আমাদের উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই সম-অধিকার দেওয়া আছে। পারিবারিক আইনে আছে উত্তরাধিকার, অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ আর আছে তালাকের বিষয়গুলো। যে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে আইনী ব্যবস্থার পথ যত সুগম হবে অধিকারও ততই নিশ্চিত হবে। একজন নারী অধিকারকর্মী হিসেবেই নয়, মানুষ হিসেবেও পরিবর্তন প্রত্যাশা করি। বাংলাদেশে নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এমনকি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেশিক্ষার্থীর চেয়ে মেয়েশিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু সে তুলনায় কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখনও অনেক কম। এ ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধাগুলো দূর করতে হবে। ঘরের বাইরে নারীর কাজ করা নিয়ে সমাজে যেসব অপপ্রচার আছে, তা বন্ধ করতে হবে। বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে কর্মস্থল ও গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

  • সমন্বয়ক, নিজেরা করি
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা