× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ১

আমদানি-নির্ভর বিদ্যুতের বাজার

এম শামসুল আলম

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪ ১৬:১৮ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:১১ এএম

এম শামসুল আলম

এম শামসুল আলম

নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক বিদ্যুতের মূল্যহার আরও এক দফা বৃদ্ধি করা হলো। শোনা যাচ্ছে, গ্রিড ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যহারও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক বৃদ্ধি করা হচ্ছে। মার্চ থেকে জ্বালানি তেলের মূল্যহারও বৃদ্ধি করা হবে। এ বৃদ্ধিকে কর্তৃপক্ষ আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় বলে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার ছিল ১১.৫২ টাকা। প্রবৃদ্ধি ২৮.৫৭ শতাংশ। গড় মূল্যহার ছিল ৫.৯৪ টাকা। ফলে আর্থিক ঘাটতি ছিল ৪৭ হাজার ১২৩ কোটি টাকা। বলা হচ্ছে, ক্রমাগত টাকার অব্যাহত মূল্যহ্রাস এ আর্থিক ঘাটতি বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় ভর্তুকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার ভর্তুকি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যহার পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে তিন বছরের মধ্যে এ আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের এ মূল্যহার বৃদ্ধি। তবে বাস্তবে দেখা যায়, শুধু মূল্যহার বৃদ্ধিই নয়, নেপথ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েও আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

২.

তথ্যাদিতে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাইকারি বিদ্যুৎ বিক্রি হয় ৮ হাজার ৪৫০ কোটি ইউনিট। প্রবৃদ্ধি ৩.৪৮ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ২০২২ সালের মার্চে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার নির্ধারণ করে। জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি ৩.৫১ শতাংশ। সুতরাং মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে।

শিল্পকর্ম : সফিউদ্দীন আহমেদ

৩.

২০২৩ সালের জুন নাগাদ গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২৪ হাজার ৯১১ মেগাওয়াট। প্রবৃদ্ধি ১০.৮০ শতাংশ। ওই অর্থবছরে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট। পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বর, ২০২৭ অবধি অতিরিক্ত ২০ হাজার ৪১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা উন্নয়ন হবে এবং গ্রিডে আসবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি পরিকল্পনাধীন রয়েছে। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বিদ্যুৎ বাজার উন্নয়নে সহযোগিতা দিচ্ছে। বর্তমানে আমদানি হয় ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট। ধারণা করা যায়, এ পরিকল্পনামাফিক বিদ্যুৎ আমদানি বৃদ্ধি করা হলে অচিরেই অফপিক পিরিয়ডে চাহিদা পূরণে আমাদের আর বিদ্যুৎ উৎপাদন করার প্রয়োজন হবে না। আমাদের সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আর ব্যবহার হবে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি হবে নিয়ন্ত্রণহীন এবং মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন কমিয়ে আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলা করা হবে।

৪.

গ্রিডে সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ওই অর্থবছরে ৪৭৪ মেগাওয়াট এবং মোট উৎপাদনক্ষমতার ১.৭৯ শতাংশ। মোট গ্রিড বিদ্যুতের ০.৭৩ শতাংশ। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০০৮ অনুযায়ী ২০২১ সালে তা হতে হতো ১০ শতাংশ। তথ্যাদিতে দেখা যায়, নির্মাণাধীন, প্রক্রিয়াধীন ও পরিকল্পনাধীন সৌরবিদ্যুৎ প্লান্ট মিলিয়ে মোট উৎপাদনক্ষমতা ৪ হাজার ২১৯ মেগাওয়াট। পরিকল্পনামাফিক এ বিদ্যুৎ উন্নয়ন হলে দিনে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক গ্রিড বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয় হ্রাসে এ বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সে ক্ষেত্রে অব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয় বাড়বে।

৫.

২০২২-২৩ অর্থবছরে গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৬ হাজার ৩৩৯ মেগাওয়াট হলেও সে ক্ষমতা ব্যবহার হয় গড়ে ৩৭.৭২ শতাংশ। প্লান্টভেদে প্লান্ট-ফ্যাক্টর পর্যালোচনায় দেখা যায় পিডিবির মালিকানাধীন বিবিয়ানায় স্থাপিত দুটি বিদ্যুৎ প্লান্ট। উৎপাদনক্ষমতা ৭৮৩ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে গড়ে ৮৪ শতাংশ প্লান্ট-ফ্যাক্টরে। তা ছাড়া ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হয় গড়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ প্লান্ট-ফ্যাক্টরে। এ ছাড়া আর সব প্লান্ট মিলে উৎপাদনক্ষমতা ২২ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট গড়ে ৩৫.২৭ শতাংশ প্লান্ট-ফ্যাক্টরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এ তথ্যাদিতে প্রমাণ পাওয়া যায়, সিংহভাগ উৎপাদনক্ষমতা স্বল্প ব্যবহার হয়। এ প্রবণতা আগামীতে বাড়বে।

৬.

প্লান্টভেদে ওই অর্থবছরের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার যথাক্রমেক. বিবিয়ানায় অবস্থিত পিডিবির ওই দুটি প্লান্টে যথাক্রমে ২.৯০ ও ২.৭০ টাকা খ. ব্যক্তি খাত বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহের ক্ষেত্রে সে ব্যয়হার গড়ে ৪.৯৩ টাকা এবং গ. রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহে গড়ে ৫.৬০ টাকা। পিডিবির মালিকানায় সরকারি খাতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ভোক্তাদের অর্থে বিইআরসি বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল গঠন করে। এই তহবিলের অর্থে বিবিয়ানায় ওই দুই বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করা হয়। তথ্যাদিতে দেখা যায়, সেখানে ন্যূনতম কত ব্যয়হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তাহলে ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে অধিকতর ব্যয়হারে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং নিজস্ব গ্যাসের মজুদ ও সরবরাহ বৃদ্ধিতে গ্যাস উন্নয়ন তহবিলকে কেন কার্যকর করা হয়নি? এমন সব প্রশ্ন ও সন্দেহ এখন জনগণের মধ্যে ঘনীভূত হচ্ছে।

৭.

ভোলায় গ্যাস সারপ্লাস। শোনা যায়, ছাতক (পূর্ব) গ্যাস ক্ষেত্রে কমবেশি এক টিসিএফ গ্যাস মজুদ আছে। সে গ্যাস তোলার কোনো উদ্যোগ নেই। বিয়িানার অনুরূপ বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলের অর্থে পিডিবিকে দিয়ে ওই সব এলাকায় গ্যাসভিত্তিক একাধিক বড় বড় বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করে পিডিবিকে গ্যাস দিয়ে অনায়াসে ন্যূনতম ব্যয়হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট ঘনীভূত হয়েছে এবং সে সংকট নিরসনের অজুহাতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন-২০১০ প্রণয়ন করে প্রতিযোগিতাহীন ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উন্নয়ন শুরু হলো।

৮.

বিনিয়োগ প্রতিযোগিতাহীন হওয়ায় বিনিয়োগকারী অবাধে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধির সুযোগ নেয় এবং পায়। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে ওই বৃদ্ধিজনিত ব্যয় সমন্বয় হয় ও আর্থিক ঘাটতি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। সে ঘাটতি সমন্বয়ে ভর্তুকি ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। বৃদ্ধিজনিত ভর্তুকি ও মূল্যহার লুণ্ঠনমূলক মুনাফা হয়ে বিনিয়োগকারীর পকেটে যায়। নেপথ্যে সে অর্থ বিলিবণ্টন হয়ে নানাভাবে নানাজনের হাতে যায়। নাইকো চুক্তির দুর্নীতির অর্থ বিলিবণ্টনের তথ্যে সে প্রমাণ পাওয়া যায়।

৯.

ওই অর্থবছরে বড়পুকুরিয়ায় পিডিবির মালিকানায় ২ ইউনিট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-প্লান্টে যথাক্রমে ২২০ ও ২৭৪ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতায় ১৪ ও ৬৫ শতাংশ প্লান্ট-ফ্যাক্টরে গড়ে ১৭.৬৬ ও ১০.৩৭ টাকা ব্যয়হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। শুরুতে প্রথম ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২৫০ মেগাওয়াট। পরে ২৭৪ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন আরও একটি ইউনিট স্থাপন করা হয়। শুরু থেকে আজ অবধি কখনই উৎপাদনক্ষমতা অনুয়ায়ী এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ করা যায়নি। ফলে সব সময়ই উৎপাদনক্ষমতার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে। জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় ইউনিট বসানো হয়। তাতে উৎপাদনক্ষমতা আরও বেশি অনুপাতে অব্যবহৃত থাকে। ফলে যৌক্তিক ব্যয় অপেক্ষা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বেশি বাড়ে।

১০.

অন্যদিকে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে পিডিবিকে কয়লা কিনতে হয় যৌক্তিক মূল্যহার অপেক্ষা অধিক মূল্যহারে। যখন পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লা আমদানি করে টনপ্রতি ১০০ ডলার মূল্যহারে, তখন পিডিবিকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা কিনতে হয় প্রায় ১৫০ ডলার মূল্যহারে। তাতে একদিকে বড়পুকুরিয়া খনির প্রচুর লুণ্ঠনমূলক মুনাফা হয় এবং প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী জনপ্রতি আট বছরে মুনাফা বোনাস পেয়েছেন ৮৯ লাখ কোটি টাকা এবং মাসে নানা রকম আর্থিক সুবিধাদি পান মাসিক বেতনের অধিক। সরকারের লভ্যাংশ তো আছেই। এ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যক্তি ও সরকারি মালিকানাধীন সব কোম্পানি অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় বাড়িয়ে লুণ্ঠনমূলক মুনাফা করে। সে মুনাফার অংশবিশেষ করপোরেট ট্যাক্স বা লভ্যাংশ নামে সরকারের ঘরে আসে। সেই সঙ্গে ট্যাক্স, ভ্যাট, শুল্ক ইত্যাদি বাবদ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে যায়। সরকার এভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বাণিজ্যিকভাবে তার রাজস্ব আহরণের অন্যতম উৎসে পরিণত করেছে।

১১.

অন্যদিকে পাইকারি বাজারে এ বিদ্যুৎ বিক্রয় মূল্যহার উৎপাদন ব্যয়হার অপেক্ষা অনেক কম। ফলে পিডিবি ভয়ানকভাবে আর্থিক ঘাটতির শিকার। এই ঘাটতি সমন্বয়ে ভর্তুকি ও মূল্যহার বৃদ্ধি হয়। সরকার ভর্তুকি দেবে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে রাজস্ব আহরণ কমাবে না। লুণ্ঠনমূলক ব্যয়বৃদ্ধি প্রতিরোধ করবে না। তাহলে দ্রত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন-২০১০ বলবৎ রেখে এবং নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ অব্যাহত রেখে সরকার প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয় তথা মুনাফা বৃদ্ধি সুরক্ষা দেবে কেন, কার স্বার্থে?

১২.

ওই অর্থবছরে বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয়হার ছিল গড়ে ৭.৮৩ টাকা এবং আদানির বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয়হার ১৪.০২ টাকা। ১৯৯৬ সালের দিকে সরকার বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করে। অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার অপেক্ষা বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয়হার অধিক হওয়ায় তখন সে উদ্যোগ থেমে যায়। পরবর্তীতে সাশ্রয়ী ব্যয়হারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কয়লাভিত্তিক উৎপাদনক্ষমতা উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ পরিকল্পনা অনুয়ায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিজস্ব কয়লা উৎপাদন বৃদ্ধি করা না হলেও কয়লা আমদানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়হার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূল্যহার বৃদ্ধি ছাড়াই বিদ্যুৎ আমদানি বৃদ্ধি দ্বারা আর্থিক ঘাটতি বা ভর্তুকি অনেকটাই সমন্বয় করা সম্ভব।

১৩.

ওই অর্থবছরে নবায়নযোগ্য ৪৭৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ১৫ শতাংশ প্লান্ট-ফ্যাক্টরে ১৫.৭৭ টাকা ব্যয়হারে উৎপাদন করে। পিডিবির মালিকানায় ৭ শতাংশ প্লান্ট-ফ্যাক্টরে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার ১৯.১১ টাকা (১ ডলার = ১০৭ টাকা)। বাংলাদেশে বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা উন্নয়ন জমিস্বল্পতার কারণে সীমাবদ্ধতার শিকার হলেও সে ধরনের উৎপাদনক্ষমতাই উন্নয়ন হচ্ছে। সাশ্রয়ী ব্যয়হারে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়নের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সে বিদ্যুৎ উন্নয়ন গুরুত্ব পাচ্ছে না। প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হারও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হারের অনুরূপ অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি তথা লুণ্ঠনমূলক মুনাফার শিকার। ফলে বাজার প্রতিযোগিতায় এ বিদ্যুতের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আবার সৌরবিদ্যুৎ প্লান্টের মান সংরক্ষণ না হওয়ায় টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহও নিশ্চিত নয়। উল্লেখ্য, ভারতের পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল নাগাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার হবে ১.৯-২.৬ রুপি এবং বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার হবে ২.৩-২.৬ রুপি (১ ডলার = ৮৫ রুপি)। লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফামুক্ত হলে ভারতের অনুরূপ উৎপাদন ব্যয়হারে আমাদের দেশেও সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল।

১৪.

ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উন্নয়নের লক্ষ্যে এ খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়। বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে আইন দ্বারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান বিইআরসি প্রতিষ্ঠিত হয়। উন্নয়নে বিনিয়োগ স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক হলে ন্যূনতম ব্যয়ে ভোক্তাকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করা যায়। মূল্যহার নির্ধারণে ভোক্তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক হতে পারে। বিইআরসি আইন অনুযাযী বিনিয়োগে প্রতিযোগিতা ও মূল্যহার নির্ধারণে গণশুনানির ভিত্তিতে ভোক্তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বিইআরসির দায়িত্ব। অথচ দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন-২০১০ দ্বারা বিনিয়োগ প্রতিযোগিতাবিহীন করা হলো। বিইআরসি আইন-২০০৩ পরিবর্তন দ্বারা মূল্যহার নির্ধারণ ক্ষমতা বিদ্যুৎ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগের হাতে দেওয়া হলো এবং গণশুনানি রহিত হলো। তাতে বিনিয়োগকারী উন্নয়নে অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি দ্বারা লুণ্ঠনমূলক মুনাফা বৃদ্ধি করায় ভর্তুকি ও মূল্যহার বৃদ্ধি করেও আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। বর্ণিত তথ্যপ্রমাণাদিতে এই প্রমাণই পাওয়া যায়। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়হার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তা এখন বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয়হারের অধিক। কেবল মূল্যহার বৃদ্ধি দ্বারা ভর্তুকি সমন্বয় বা কমানো অসম্ভব। ফলে বিদ্যুৎ আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। ইতোমধ্যে আমরা আমাদের বিদ্যুৎ বাজার উন্নয়ন করে আমদানি বাজারে পরিণত করেছি।

  • জ্বালানি-বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা