× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ১

তারুণ্যের অগ্রযাত্রা

সেলিনা হোসেন

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪ ১৫:৫২ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:১৪ এএম

সেলিনা হোসেন

সেলিনা হোসেন

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনেপ্রাণে তরুণ ছিলেন বিধায়ই তারুণ্যের শক্তির ব্যাপারে তিনি প্রচণ্ড আশাবাদী ছিলেন। এক কথায় তরুণদের ‍ওপর রবীন্দ্রনাথের ভরসা কতটা অন্তহীন ছিল তা রবীন্দ্র সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ স্বদেশি সমাজ ও এর অন্তর্নিহিত শক্তি সম্পর্কেও অত্যন্ত দৃঢ় মনোভাবাসম্পন্ন ছিলেন এবং এই শক্তিকে বিকশিত করার জন্যও তার আস্থার কেন্দ্রে ছিল তরুণ প্রজন্ম। রবীন্দ্রনাথ তরুণদের চোখ দিয়েই বিশ্বকে দেখেছেন এবং তারুণ্যের জাগরণের বহুমাত্রিক ভাবনাও তিনি এ থেকেই নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ চির তারুণ্যের কবি এবং বাংলা সাহিত্যের বিচিত্র আঙিনা তার প্রতিভার আলোকে আলোকিত হয়েছে এবং এর নানা পর্বে তারুণ্যের জয়গান উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ যখন ‘পরিচয় কবিতাটি লেখেন, তখন তার বয়স পঁচাত্তর। ওই কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘এত দিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে,/ বসন্তের নতুন হাওয়ার বেগে।/ তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি/ পরিচয় কোনো আছে নাকি,/ যাবে কোন খানে।/ আমি শুধু বলেছি, কে জানে।/ কুসমিত তরুতলে তরুণ-তরুণী/ তুলিলো অশোক,/ মোর হাতে দিয়ে তারা কহিল, এ আমাদেরই লোক।/ আর কিছু নয়,/ সে মোর প্রথম পরিচয়।/’ শুধু ‘পরিচয় কবিতায়ই নয়, চির নতুনের চিরকালের সুন্দর রবীন্দ্রনাথ তারুণ্যকে চিত্রিত করেছেন নানাভাবে।

স্মরণ করি, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সব সময়ই আমাদের তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিতে পারব না। তবে আমরা তাদের তারুণ্যকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করে দিতে পারি। আর পাবলো পিকাসো বলেছেন, ‘তারুণ্যের কোনো বয়স নেই। দার্শনিক এরিস্টোটল তারুণ্যের শক্তি অভিব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ভালো অভ্যাস যা তারুণ্যে সৃষ্টি হয়, তাই কেবল পার্থক্য আনতে পারে। বর্ণবাদবিরোধী বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘আজকের তরুণরা আগামীকালের নেতৃত্বগোষ্ঠী। তরুণদের সম্পর্কে চে গুয়েভারার মন্তব্য, ‘তরুণদের চিন্তা করতে শেখা উচিত এবং একটা দল হিসেবে কাজ করা উচিত। একা একা চিন্তা করতে শেখা হলো একটা অপরাধ।

রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে অন্য যে কজন মনীষী তারুণ্য সম্পর্কে তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো তাতে স্পষ্টতই বোঝা যায়, একটি রাষ্ট্র কিংবা সমাজের জন্য তারুণ্যের শক্তি কতটা সহায়ক ও জরুরি। আমাদের এই ভূখণ্ডেও গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক নানা অধ্যায়ে আন্দোলন-সংগ্রামে তারুণ্যের বদলে দেওয়া শক্তি আমরা দেখেছি। শুধু আমাদের সমাজ কিংবা রাষ্ট্রেই নয়, তারুণ্য যে মানবজীবনের নিয়ামক শক্তি, এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। জীবনের অনুকূল কিংবা প্রতিকূল পরিবেশে তারুণ্যই কার্যত নির্দেশক কিংবা মুখ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে বিপদসংকুল-বন্ধুর পথ অতিক্রম করে লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে কিংবা উন্মোচন করেছে নতুন দিগন্তের এমন দৃষ্টান্তও তো আমাদের সমাজেই আছে। বিদ্রোহী কবি বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলাম তারুণ্যের মধ্যে অবলোকন করেছেন, অপার সম্ভাবনা এবং পাহাড়সম শক্তির সঞ্চার। বিশ্বসাহিত্য তো বটেই বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়েও কবি-সাহিত্যিকরা তারুণ্যের সংশয়-শঙ্কাহীন দুঃসাহসের প্রতিচিত্র তুলে ধরেছেন। স্বল্পায়ু কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘এদেশের বুকে আঠারো নেমে আসুক কাব্য পঙক্তির মাঝেও সমষ্টির প্রাণশক্তির প্রত্যাশার পাশাপাশি দৃঢ় অভিব্যক্তির প্রতিধ্বনিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এই অভিব্যক্তি অকাল প্রয়াত কবি সুকান্তর প্রত্যাশার সমান্তরালে, আমাদের সবারই যেন। 

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জনের পূর্বাপর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, ন্যায়ের পক্ষে জাগরণ, অন্যায়ের প্রতিবাদে তারুণ্যের শক্তি আমাদের কাছে শুধু পরীক্ষিতই হয়নি, মুক্তির পথও বাতলে দিয়েছে। জীবনের প্রাণপ্রবাহ কিংবা মানবসভ্যতার উৎকর্ষের মুখ্য নিয়ামক হিসেবেও তারুণ্যের শক্তির অনেক নজির আমাদের সামনে রয়েছে। তারুণ্যই নতুন করে সৃষ্টি করেছে, বাধার দেয়াল ভেঙেছে, প্রতিরোধ গড়েছে, স্বপ্নের সৌধ নির্মাণ করেছে, গন্তব্যের ঠিকানা নির্ধারণ করেছে ইত্যাদি আরও কত কিছু। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত, তারুণ্য বাধা মানে না। এই সত্য যেমন অতীতের, এই সত্য বর্তমানের এবং ভবিষ্যতেও এই সত্যই অনেক কিছুর নির্ণায়ক হয়ে থাকবে। প্রত্যয় আর চেতনার উৎস, অনুপ্রেরণার অজেয় শক্তি তারুণ্যকে নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা একবার নয়, বারবার করতে হবে।

সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখি তারুণ্যের ক্ষয় নিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেন। হ্যা, তা হতাশার বিষয়ও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে তারুণ্য এত গড়েছে, গড়ছে এবং গড়বে বলে আমরা চূড়ান্তভাবে সংগত কারণেই আশাবাদী সেই তারুণ্য ক্ষয়ের পথে পা বাড়ায় কী করে? এই প্রশ্নটির উত্তর জটিল কিছু নয়। অপরাজনীতির স্পর্শ, বলবানদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করণের অপপ্রয়াস, প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানোর হোতারাই তারুণ্যের একাংশকে ক্ষয়ের পথে ঠেলে দিয়েছেন, দিচ্ছেন। এই পথ রুদ্ধ করতে হবে। এর প্রতিরোধে আমাদের দাঁড়াতে হবে যূথবদ্ধভাবে। আমরা কোনোভাবেই তারুণ্যের শক্তির ক্ষয় দেখতে চাই না। তারুণ্যের শক্তি যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে, আমরা সেই জয় দেখতে চাই। আমাদের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলো ছড়াচ্ছেন। শুধু প্রয়োজন তাদের যথাযথ অনুপ্রেরণা জুগিয়ে শক্তি সঞ্চারক হিসেবে দায়িত্বশীল প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগীতা করে যাওয়া। বায়ান্ন বছরের বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের বিস্ময় জাগানিয়া রোল মডেল। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গণে তারুণ্যকে আরও নৈতিক শক্তিতে বলিষ্ঠ-বলীয়ান করে তুলতে সব রকম প্রয়াস জোরদার করতে হবে। তারুণ্যের শক্তিই আমাদের ভবিষ্যৎ। তরুণদের হাত ধরেই দেশ এগিয়েছে, এগিয়ে যাবেও।

বাংলাদেশ তারুণ্যে ভরপুর একটি দেশ। আমাদের জনগোষ্ঠীর বড় অংশই তরুণ ও যুবক। একই সঙ্গে শুধু সংখ্যাতেই নয়, সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আমরা জানি, প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই কালে সম্ভাবনার অনেক দরজা খুলে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো, প্রযুক্তির আশীর্বাদ গ্রহণ করা; অভিশাপের ছায়া যেন না পড়ে এ ব্যাপারে সজাগ থাকা। তরুণদের মধ্যে যে অদম্য প্রাণশক্তি রয়েছে সেই শক্তিকে যেন আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারি এজন্য দেশের নীতিনির্ধারকদের উপযুক্ত ক্ষেত্রগুলোও তৈরি করে দিতে হবে। তারুণ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ কথাও সত্য তরুণদের অমিত শক্তির বহিঃপ্রকাশই হলো তারুণ্য। সংগত কারণেই বিশ্বাস করি, তরুণ ও তারুণ্যের মিশেলে যদি কাজ করা যায়, তাহলে দেশ-জাতির কল্যাণের পথ মসৃণ হতে বাধ্য। সবচেয়ে বড় কথা হলো, চিন্তার প্রয়োগ বা ‍সৃজনশীলতার প্রকাশে-বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ। এর মধ্যে রাজনীতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হলে অনাচার-দূরাচার-কদাচারের পথ যেমন রুদ্ধ হবে, তেমনি তরুণদের ক্ষয়ের রাস্তা সংকুচিত হতে হতে একপর্যায়ে নিশ্চিয়ই বন্ধ হবে এবং প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর হবে বিকাশের পথ। পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রে তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগাতে শুধু পরিকল্পনাই নয়, বাস্তবায়নের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

তরুণদের শুভশক্তির দ্যুতি ছড়িয়ে মহত্ব ও এক জগতের জন্ম ঘটাতে তাদের চালিত করতে হবে আলো-মুক্তির পথে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বহুদর্শিতার সাক্ষ্য মিলতে শুরু করে সেই তরুণ বয়স থেকেই। বাঙালি জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু অক্ষয় অধ্যায় এবং তার আদর্শ আমাদের পাথেয়। সমাজ ও রাষ্ট্র অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তরুণদের হতাশা দূর করতে এসব ক্ষেত্রে যারা দায়িত্বশীল তাদের ব্যাপকভাবে তরুণদের নিয়ে গঠনমূলক চিন্তার পাশাপাশি যেভাবে যুগে যুগে জগতে গীত হয়েছে তরুণ ও তারুণ্যের জয়গান তা অব্যাহত রাখার নিরন্তর প্রয়াস আরও গভীর করতে হবে। প্রবীণের প্রজ্ঞা ও পরামর্শ, নবীনের বল-সাহস ও উদ্দীপনায় আসে পরিবর্তন। বিশ্ব প্রেক্ষাপট তো বটেই আমাদের প্রেক্ষাপটেও এর নজির কম নেই। অসম্ভবকে সম্ভব করতে ঝুঁকি নিতে পারে শুধু তারুণ্য। প্রথা ভাঙার দুঃসাহসও দেখাতে পারে তারুণ্যই। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তরুণ বা নওজোয়ানদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘অসম্ভবের অভিধানে এর চলে,/ না চলেই ভীরু ভয়ে লুকায় অঞ্চলে!/ এর অকারণ দুর্নিবার প্রাণের ঢেউ,/ তবুও ছুটে চলে যদিও দেখেনি সাগর কেউ।/চড়িয়া সিংহে ধরে কেশর-নওজোয়ান!/ বাহন তাহার তুফানঝড়-নওজোয়ান!/ শির পেতে বলে-‘বজ্রআয়!/ দ্বৈত-চর্ম-পাদুকা পায়,/ অগ্নিগিরিরে ধরে নাড়ায়-নওজোয়ান!’কবির তরুণদের নিয়ে এই আশাবাদ শুধু আবেগ নয়, আমাদের জাতির ইতিহাসের অধ্যায় জুড়ে এর সাফল্য স্মারক।

আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের কাছ থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিগুলো তখনই নিশ্চিত হবে, যদি তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সর্বত সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হয়। কিছু পেতে হলে কিছু তো দিতে হবেই। রাষ্ট্রের কাছে তরুণ ও যুব সমাজের যে দাবি, সেই দাবি পূরণে সাংবিধানিক সমর্থন রয়েছে এবং আমাদের প্রত্যাশা, দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে তারুণ্যের শক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কথার কথা নয়, কাজের কাজটিই করতে হবে।

  • কথাসাহিত্যিক ও সভাপতি, বাংলা একাডেমি
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা