পল্লী মজুমদার
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৩ ১৩:৫৬ পিএম
প্রচ্ছদ : জয়ন্ত সরকার
বিচিত্রতা, বহুমুখিতা যেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপর নাম। বলা হয় মহাকাব্য ছাড়া সাহিত্যের এমন কোনো অংশ নেই যেখানে তিনি দ্যুতি ছড়াননি। কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, সংগীতসহ যেখানেই কবিগুরুর স্পর্শ পড়েছে সেখানেই সোনা ফলেছে। চিত্রশিল্পী হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। তবে তার রচিত কবিতা ও গান নিয়েই আলোচনা বেশি হয়। সেদিক থেকে তার চিত্রশিল্প গুণটি থেকে যায় আলোচনার বাইরে।
কবি বলেছিলেন-
টুকরো যত রূপের রেখা সঞ্চিত রয় মনের চিত্রশালে
কখন ছবির আকার নিয়ে জোড়া লাগায় শিল্পকলার জালে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সারাজীবনে হৃদয়ে যত রূপ-রঙ সঞ্চিত করেছিলেন, প্রৌঢ়াবস্থায় তা ঢেলে দিলেন রঙ-তুলি ও কালিতে। জীবনের শেষভাগে এসে এঁকে ফেললেন প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি ছবি। কবি যেন তার ভেতরের ‘চিত্রকর’ সত্তার দেখা পেলেন জীবনের শেষলগ্নে। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে শুরু হয় তার ছবি আঁকায় হাতেখড়ি। তবে ছবি আঁকার শুরু কোনো সাধারণ নিয়মে হয়নি। ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপিতে সংস্কারের প্রয়োজনে তিনি কাটাকুটি করতেন। সেই কাটাকুটি ঢেকে দিয়ে সৌন্দর্য বজায় রাখতে রুচিশীল কবি নিজের খেয়ালখুশি মতো বিভিন্ন রেখা ও বিন্দু আঁকতেন। পরবর্তী সময়ে সেই খেয়ালিপনার আঁকাআকি ছবির আকার ধারণ করে; যা দেখে কবিগুরু নিজেই বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। তার সেই কাটাকুটি খেলা থেকে বেরিয়ে এলো চিত্রের নানা রকম রূপ ও ধারণা। কখনও জ্যামিতিক আকার, কখনও গাছপালা নিসর্গের ছবি, আবার কখনও অদ্ভুত মুখ ও অবয়ব।
কবির ছবি আঁকার শুরু হয় ১৯২৪ সাল থেকে, তবে ১৯২৮ সাল থেকে তিনি পুরোদস্তুর চিত্রশীল্পী হয়ে ওঠেন। মৃত্যু অবধি চলমান থাকে তার এই শিল্পচর্চা। তার চিত্রকর্মগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো ছকে ফেলা যায় না। আধুনিক ভারতীয় শিল্পকর্মের প্রভাব কিছুটা দেখা যায় তার চিত্রকর্মে, তবে পশ্চিমা শিল্পকলার প্রভাবই বেশি পরিলক্ষিত। বিশেষত, এক্সপ্রেশনিজম ও প্রিমিটিভিজমের ভূমিকা তার শিল্পকর্মে অধিক বলেই বেশির ভাগ সমালোচকরা মনে করেন। জানা যায়, জার্মান ভ্রমণকালে এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের কাজে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি এর যথাযথ উপলব্ধি ও প্রশংসা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার বিভিন্ন চিত্রকর্মে।
কবিগুরুর অনেক ছবিতেই বিষাদের ছাপ ফুটে উঠে। চিত্র সমালোচকরা বলেন, তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি যেসব বিয়োগান্তক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা তার হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে আর সেই বিষাদের ছায়া তার চিত্রকর্মেও প্রকাশ পায়। কখন কী আঁকবেন তা স্থির করে আঁকতে বসতেন না কবি। ছবি আঁকা তার কাছে ছিল এক ধরনের খেলা, যা পরে নেশায় রূপ নেয়। তিনি কাগজ, কালি ও রঙ নিয়ে বসতেন, কখনও তুলির আঁচড় কখনও কলমের খোঁচায় তৈরি রেখা দিয়ে শুরু হতো তার আঁকা। তারপর নানা বিন্দু, তুলির ছোপে একে একে তৈরি হতো নানান আকৃতি, অচেনা অবয়ব, অচেনা মুখ। তার তৈরি চিত্রের দৃশ্যমান ভিন্ন আঙ্গিকের অস্তিত্ব নিয়েই তৈরি রবীন্দ্র চিত্রকলা। রবীন্দ্রনাথ শুধু রেখাকে নানাভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এর মাঝে প্রাণ সঞ্চার করতে চেয়েছেন। ফলে তার চিত্র যে ভিন্ন ধরনের রূপ লাভ করত তাকেই কবিগুরু সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বকবি তার নিজের আঁকা ছবি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমার আঁকা ছবির অর্থ কী লোকে প্রায়ই আমায় জিজ্ঞাসা করে। আমার ছবি যেমন নীরব, আমিও তাই। ব্যক্ত করাই তো ওদের কাজ, ব্যাখ্যা করা নয়।’
রবীন্দ্রনাথের ছবিকে চিত্র বোদ্ধারা কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেন। সময়ানুক্রম অনুযায়ী তার ছবিকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। ১. রেখামূলক অলংকরণ ২. গড়নযুক্ত অলংকরণ ৩. বস্তু ও সাদৃশ্যের আবির্ভাব ৪. সাদৃশ্য প্রাধান্য।
১৯২৪-১৯৩২ এই সময়ে তার আঁকা ছবিগুলো ছিল ছন্দোময় রেখার সমাহার। ১৯৩০ থেকে তার আঁকা ছবির ধরনে রঙের ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন আসে। তার ছবিতে দেখা যায় পরিশীলিত রুচি, নানা ধরনের নকশা ও স্পেসের ব্যবহার এবং রঙ ব্যবহারের মিতব্যয়িতা। তিনি বিশুদ্ধ রঙ তেমন ব্যবহার করতেন না। লাল ও নীলের ব্যবহার খুব কম করতেন। তবে আলো-ছায়ার খেলা ও বিষাদ ফুটিয়ে তুলতে তিনি হলুদ ও কমলার অনন্য সাধারণ ব্যবহার করেছেন। তার প্রবল ঝোঁক ছিল কালো, খয়েরি ও স্বচ্ছ রঙের ব্যবহারের প্রতি। উজ্জ্বল রঙের সঙ্গে বেশির ভাগ সময় খয়েরির মিশ্রণ ঘটাতেন বলে অনেকেই বলতেন, ‘গুরুদেবের ছবিতে লালের প্রাচুর্য।’
তার ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নানা রকম টোন ও টেক্সচারের ব্যবহার। কখনও তুলি চালিয়ে কখনও কোটের হাতায় রঙ লাগিয়ে তা দিয়ে ঘষামাজা করতেন ছবির জমিতে। কখনও বা নরম তুলো ও ন্যাকড়া দিয়ে এমন ঘষামাজা করতেন, যা দিয়ে তৈরি হতো ন্যাচারাল টেক্সচার ও টোন, যা তার ছবিকে বিশেষ রূপ দান করত।
ভিক্টোরিয়া ওকেম্পোর অনুপ্রেরণায় বিশ্বকবি তার আঁকা ছবিগুলোকে বিশ্ববাসীর সম্মুখে উন্মোচন করেন। ১৯৩০ সালের মে মাসে প্যারিসের গ্যালারি পিগেল এ তার ছবির সর্বপ্রথম ও একক প্রদর্শনী হয়। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রদর্শনী সমসাময়িক চিত্র সমালোকদের আকৃষ্ট করেছে। রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে অঁরি বিদুঁ বলেছিলেন, ‘একটি গোপন প্রতিভা নিদ্রিত ছিল।’ শেষবার জার্মান ভ্রমণকালে তিনি তার আঁকা বেশ কয়েকটি ছবি জার্মানিকে উপহার দেন। সেই ছবিগুলোকে ‘অপজাত’ আখ্যা দিয়ে ব্যর্থ আঁকিয়ে হিটলার বাতিল ঘোষণা করেন ও ধ্বংসের নির্দেশ দেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার চিত্রকর্ম নিয়ে পুত্রবধূকে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘জীবনগ্রন্থের সব অধ্যায় যখন শেষ হয়ে এলো তখন অভূতপূর্ব উপায়ে আমার জীবনদেবতা এর পরিশিষ্ট রচনার উপকরণ জুগিয়ে দিলেন।’ যদিও বিশ্বকবির বিশাল কর্মযজ্ঞের এক ক্ষুদ্র অংশজুড়ে রয়েছে চিত্রকলা। এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ। বিশ্বকবির শিল্পচর্চা নিয়ে শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের শেষ কুড়ি বছরের সাহিত্য ও তার মনের গতি বোঝার জন্য এই ছবিগুলোর বিশেষ মূল্য আছে।’ বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথের ছবি তার সমগ্র সৃষ্টি ও মনন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনের অন্তীমলগ্নে তার মনের সব ভাব যেন তার চিত্রকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন কবি।