দীপ চৌধুরী
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৩ ১৩:৫৩ পিএম
প্রচ্ছদ : জয়ন্ত সরকার
বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রে আমরা তার সরব উপস্থিতি পাই। বাঙালির জীবনের প্রতিটি চিন্তায় প্রভাব রেখেছেন তিনি।
এখনও গানের আড্ডায় বারবার রবীন্দ্রসংগীতই আসে। কলকাতার বিখ্যাত জমিদার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কনিষ্ট পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন প্রভাবিত হয়েছিল সমসাময়িক সমাজব্যবস্থা এবং তৎকালীন সময়ের নানা ব্যক্তির সংস্পর্শে। তাই পৌত্তলিকতা, জাতপাত, বাল্যবিবাহ, বিধবাবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা, পণপ্রথা ইত্যাদি তার উপন্যাস, ছোটগল্প আর নাটকে বারবার ফুটে উঠেছে। তার সাহিত্যকর্মে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বাংলার অন্যতম লোকসংগীত বাউল গান। মানবমনকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আন্দোলিত করেছেন বাউলের সহজ সুর আর গভীর জীবনদর্শন দিয়ে। ধর্ম-বর্ণ, জাতপ্রথা ইত্যাদির ঊর্ধ্বে গিয়ে মানবধর্মকেই জীবনের সার এবং গুরুরূপ মুর্শিদের দেখা পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই বাউলের সাধন জীবন। রবীন্দ্রনাথ এই সহজ-সুন্দর বাউল গানের কথা এবং অনন্য জীবনাচরণ থেকে নিলেন তার সাহিত্য রচনার অনুপ্রেরণা।
শান্তিনিকেতনে তাকে গান শোনাতে আসতেন অনেক বাউল। রবীন্দ্রনাথ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাদের গান শুনতেন এবং কিছু লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। তবে বলাইবাহুল্য গুরু পরম্পরায় বাউল সমাজে বেশিরভাগ গান তারা শুনে এবং গুরুর কাছে শিখে তারপর গাইতেন। বাউল গানে ছিল উদার মানবতাবাদ ও মনের মুক্তি। একতারা আর মন্দিরার তালে সহজ ভাষায় জীবনের সারমর্ম বাউলরা রবীন্দ্রনাথকে শোনাতেন, তিনি যেন বিভোর হয়ে শুনতেন। বাউলদের গানে বারবার ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বটা ঘুরে-ফিরে আসে। আর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, দেহতত্ত্বের এই গূঢ় বিষয়গুলো গভীরভাবে কবিগুরুর কাছে ধরা পড়ে।
অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়ার শিলাইদহে ছিল জোঁড়াসাকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারি। শিয়ালদহে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়িতে বাউলরা এসে গাইতেন ‘মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষেরও সনে’, আর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে, প্রাণ তাই হেরি তাই সকলখানে’। বাউলের মনের মানুষ আর রবীন্দ্রনাথের প্রাণের মানুষ যেন এক ও অভিন্ন।
বাউলের মনের মানুষ খোঁজার পথ বাউলের গান ও আত্মোপলব্ধি। তাদের ঘুরতে হয় নানা জায়গায়। কিছু সময় সঙ্গী হয় অনেকেই, কখনও আবার কেউ থাকে না। কখনও কখনও আপসহীনভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে লড়তে হয়। তাই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে’। বাউল তার আদর্শ প্রচারে দোতারার সুরে নতুন নতুন গান বাঁধে। ফকির লালন সাঁইয়ের কথা উঠে আসতে থাকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত নানা পত্রিকায়। প্রায় দুইশ বছরের পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খলিত জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি লিখলেনÑ ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’। দেশমাতৃকার প্রতি কবির এই প্রেম আজও উদ্বুদ্ধ করে আমাদের।
জীবনের তত্ত্ব নিয়ে লালনের সরল ভাষা আর মেঠো সুরের গানগুলো দারুণভাবে নাড়া দেয় তরুণ রবীন্দ্রনাথের মনকে। তাই তার লেখা কবিতায় ছিল মানবপ্রেমের কথা। সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে অদ্বিতীয় স্রষ্টার বন্দনা আর প্রার্থনার সর্বজনীনতা ছিল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের অনন্য বৈশিষ্ট্য। বাউল যেমন গানের মাধ্যমে মনের ভাব প্রচার করেন, ঠিক তেমনি কবি খুঁজতেন মানবপ্রেমের মাধ্যমে সমাজের সব অসংলগ্নতা থেকে মুক্তির পথ। তাই এই বঙ্গভূমি থেকেও সুদূর জার্মানির নুরেমবার্গ বসে কবি লিখছিলেন-
‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে
আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে।
দেহমনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে,
গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্ধ্বে ভাসে’।